ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৬ জুন ২০২৪, ১৩ আষাঢ় ১৪৩১

শিল্পসমৃদ্ধ ভ্রমণগল্প

সৈয়দ নূরুল আলম

প্রকাশিত: ২১:৫৭, ৯ মার্চ ২০২৩

শিল্পসমৃদ্ধ ভ্রমণগল্প

.

ভ্রমণ আমাদের জীবনের একটি অংশ। ভ্রমণ মানুষকে দৈনন্দিন রুটিন থেকে বের করে নতুন পরিবেশ এবং  নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘাটায়। ভ্রমণ শরীর মনকে উজ্জীবিত করে। জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। শুধু তাই নয়, ভ্রমণ হলো বাস্তবসম্মত জ্ঞান সঞ্চয়ের অন্যতম উৎস। ভ্রমণ মানুষের সীমিত জ্ঞানকে অসীম আকাশে  পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আর যারা সময় সঞ্চয়ের অভাবে ভ্রমণ করতে পারেন না, তাদের জন্য ভ্রমণগ্রন্থ একটি পরম বন্ধু। ঠিক সে ধরনের একটি গ্রন্থঅজানা অজন্তা গ্রন্থের লেখক ভ্রমণসাহিত্যিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক, সাংবাদিক প্রকৃতিপ্রিয় মানুষ গাজী মুনছুর আজিজ।

ইতিহাস বিখ্যাত, রহস্যঘেরা অজন্তা গুহা। সম্প্রতি লেখক অজন্তা গুহা ভ্রমণ করেন এবং মুগ্ধ হন, আর সেই মুগ্ধতার কথা, বিস্ময়ের কথা, মলাটবদ্ধ করেন গ্রন্থে। তেরোটি অধ্যায় রয়েছে এখানে। অধ্যায়গুলোর শিরোনাম থেকে পাঠক বই সমন্ধে একটা ধারণা পাবেন। অধ্যায়গুলো- অজন্তা অভিযান, অজানা অজন্তা, অজন্তার ঐশ্বর্যে, অজন্তা আবিষ্কারের অজানা কাহিনী, অজন্তার দ্বিতীয় গুহাবিহার, অর্ধসমাপ্ত তৃতীয় গুহা চতুর্থ গুহা বিহার, পঞ্চম থেকে অষ্টম গুহা, অজন্তার প্রাচীন কয়েক গুহা, অজন্তার শিল্পসমৃদ্ধ দুই গুহা, বিরল দৃশ্যের উনিশ নম্বর গুহা, বিশ নম্বর গুহায় রানীর চুল বাঁধার আকর্ষণীয় ধরন, একুশ থেকে পঁচিশ: স্তম্ভগুলোর নকশায় রয়েছে আলাদা বৈচিত্র্য, গুহা নয়, যেন শিল্পের গ্যালারি অজন্তার চিত্র।

একটা বিষয়কে জানতে বা গভীরভাবে বুঝতে, তাকে যতটা ক্ষুদ্রতিক্ষুদ্রভাবে ব্যবচ্ছেদ করা যায়, তত তাকে সঠিকভাবে, পরিপূর্ণভাবে জানা যায়, ধারণ করা যায়। গাজী মুনছুর আজিজও অজন্তা গুহাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে বিস্তৃত তথ্য তুলে এনেছেন গ্রন্থে। যেমন, ‘অজন্তার খোদাই করা গুহাগুলো কোনোটি চৈত্য বা উপাসনালয়। কোনোটি বিহার বা সংঘারাম। চৈত্য গুহাগুলো উপাসনার জন্য আর গুহাবিহারগুলো বৌদ্ধ ভিক্ষু বা সন্ন্যাসী বা শ্রমণদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সে হিসেবে অজন্তার প্রথম গুহাটি বিহার। প্রথম বলতে নির্মাণের সময় অনুযায়ী প্রথম নয়, পাহাড়ের শুরুর দিক থেকে প্রথম। গুহাবিহারটি ৬০০ থেকে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দের ভেতর মহাযান যুগে নির্মিত। গুহাটির সামনে বারান্দার মতো আছে। বারান্দার সামনে ৬টি স্তম্ভ আর পাশে ২টি স্তম্ভ। স্তম্ভগুলো আটকোনা গোলাকার। প্রতিটি স্তম্ভের ওপরের অংশে খোদাই করা বুদ্ধের ছোট ছোট মূর্তিসহ নানা মূর্তি, হাতি-ঘোড়া, ফুল, লতা-পাতা ইত্যাদি কারুকার্য। এসব কারুকার্য দেখে সত্যিই অবাক হই।

লেখকের বর্ণনা এত সহজ সরল যে, মনে হবে লেখক দৃশ্যপটের সামনে থেকে লিখছেন, তা না হলে এত নিঁখুতভাবে, কোনো কিছু দেখার পরে, মেমোরি থেকে লেখা খুবই কঠিন। এটাই গাজী মুনছুর আজিজের লেখার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এই বৈশিষ্ট্যের কারণে পাঠকের মাঝে মাঝে মনে হবে কবিতা পড়ছি, আবার কখনও মনে হবে গল্প পড়ছি, আর ভ্রমণ কাহিনীর স্বাদ তো আছেই।

লেখকট্রাভেল নোট’- বলেছেন, ‘অজন্তার গুহা চিত্রের কথা প্রথম জেনেছি ছোটবেলায় পড়া একটা বইয়ে। তখনই ইচ্ছে জাগে রহস্যঘেরা অজন্তার গুহায় প্রবেশ করার। অবশেষে একদিন হাজির হই অজন্তার গুহায়। রীতিমতো বিস্মিত হই গুহার দেয়ালে আঁকা রঙিন চিত্রকর্ম আর পাথর কেটে কেটে তৈরি শিল্পকর্ম দেখে।লেখকের একথায় ভ্রমণপ্রিয় মানুষের অজন্তার গুহা দেখার আগ্রহ অনেকগুণ বেড়ে যাবে, একই সঙ্গে ভ্রমণবিষয়ক উক্তি- ‘যারা বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে থাকেন, তাদের মন অনেক বড়। একজন ভ্রমণকারী অন্য কোনো ব্যক্তিকে উপকার করতে জানেন।এটা মনে পড়ে যাবে।

লেখক অজন্তার প্রতিটি গুহার নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন, ছোটখাটো কিছুই তার চোখ এড়িয়ে যায়নি, একজন শক্তিশালী পর্যবেক্ষক মননশীল গাজী মুনছুর আজিজের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে এমন জীবন্ত করে লেখা। একটা উদাহরণ দিই, ‘বাইশ নম্বর গুহা বিহারটি আয়তনে কিছুটা ছোট। এটিও ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত। এর দুপাশে দুটি অর্ধসমাপ্ত গর্ভগুহা। গুহার দরজার ফ্রেম বা তিন পাশে ফুল, লতাপাতার দারুণ অলংকার। এছাড়া দরজার দুপাশে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত আছে একাধিক জোড়ামূতি। আর দরজার ফ্রেম বলতে আলাদা কিছু নয়। দরজার সৌন্দর্য বাড়াতে পাহাড়টাকে কেটে কেটে ফ্রেমের রূপ দেয়া হয়েছে।

এভাবেই লেখক তার দেখাকে এতটা গভীরে নিয়ে গিয়েছেন। বইয়ের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছবি সংযোজন। বইয়ের শেষে প্রায় দেঢ়ফর্মা জুড়ে ৪৮টি ছবি দেয়া হয়েছে, এতে করে বইটি চিত্রাকর্ষকের সঙ্গে সঙ্গে অজন্তাকে জানার পরিধিও বেড়েছে। সবমিলেঅজানা অজন্তাঅসাধারণ একটি গ্রন্থ। ঘরে বসেই অজন্তাকে জানার জন্য, ধারণ করার জন্য যথেষ্ট। গ্রন্থটি ডিসেম্বর ২০২২ চমন প্রকাশ বের করেছে। প্রচ্ছদ করেছেন দেওয়ান আতিকুর রহমান।

×