ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০১ অক্টোবর ২০২৩, ১৬ আশ্বিন ১৪৩০

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ বাউবির কর্মমুখী শিক্ষা

ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন

প্রকাশিত: ০০:২৫, ২৮ মে ২০২৩

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ বাউবির কর্মমুখী শিক্ষা

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

জায়গার মানুষকে জায়গায় রেখে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাসেবা পৌঁছে দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের দেশের পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বাউবির মাধ্যমে লেখাপড়া করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। বাউবির শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পেরে তারা দারুণ খুশি।
চৈতালি চাকমার বয়স ৩৪ বছর। খাগড়াছড়ি পার্বত্য এলাকায় বসবাস করেন। পারিবারিক কারণে ছোট বেলায় তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় পরবর্তীতে তিনি বাউবি থেকে এসএসসি পাস করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের  একটি প্রজেক্টে কাজ জোগাড় করে নেন। কাজ করতে করতে নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে বাউবি থেকে এইচএসসি এবং বিএসএস সম্পন্ন করেন। 
বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে চাকরির পাশাপাশি তিনি একজন উদ্যোক্তা। অনলাইনে কাপড়ের ব্যবসা করেন। পাহাড়ি ভূমিতে ব্যবসায়িকভাবে  একটি ফলজ বাগানও  তৈরি করেছেন। তিনি জানান, চাকরি এবং সফল ব্যবসা দুটোর জন্যই লেখাপড়া প্রয়োজন। লেখাপড়া না জানলে কর্মস্থলে উন্নতি করা যায় না অফিসে বসের নানা কথা শুনতে হয়। ব্যবসায়ে সফলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য  প্রয়োজন শিক্ষা। যখন আমি লেখাপড়া জানতাম না তখন অনেকেই আমাকে ব্যবসায়ে ঠকিয়েছেন, কর্মস্থলে নানা বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে। বাউবি আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। বাউবি না থাকলে আজ আমি স্বনির্ভর হতে পারতাম না। কাজের পাশাপাশি বাউবি থেকে মাস্টার্স করে আরও সামনে এগিয়ে যেতে চাই। তিনি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে চান।                   
খাগড়াছড়িতে বাউবির বিভিন্ন প্রোগামের কর্মমুখী শিক্ষার্থী
রেখা ত্রিপুরা বয়স ২০ বছর। বাউবির খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ স্টাডি সেন্টারের এইচএসসি প্রোগ্রামের শিক্ষার্থী এবং পাশাপাশি একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। খাগড়াছড়ির ঠাকুরছড়া থেকে বাইশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত টিউটোরিয়াল ক্লাস করতে আসেন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ স্টাডি সেন্টারে। নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজেই চালান উপরন্তু বাবাকে সংসারে সাহায্য করেন। পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন সৎ মায়ের সঙ্গে খেতে খামারে কৃষি কাজ করেছেন। মাঠে কাজ করতে গিয়ে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় এক শিক্ষকের কাছে বাউবি সম্পর্কে জানতে পেরে ভর্তি হন বাউবির এসএসসি প্রোগ্রামে পাশাপাশি একটি কাপড়ের দোকানে কাজ যোগাড় করে লেখাপড়ার খরচ চালাতে থাকেন। বাউবি থেকে এসএসসি পাস করার পর প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যান। তিনি অনার্স, মাস্টার্স করে কলেজের শিক্ষক হতে চান। তিনি পাহাড়ি অঞ্চলের গরিব মানুষকে তার উপার্জিত অর্থ থেকে কর্মমুখী লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে আসতে চান।
পরেন জয় ত্রিপুরা বয়স ২৬ বছর। তিনিও বাউবির খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ স্টাডি সেন্টারের এইচএসসি প্রোগ্রামের শিক্ষাথী। তার স্ত্রী আনুমা মার্মাও এইচএসসির শিক্ষার্থী। বাউবি থেকে এসএসসি পাস করার পর খাগড়াছড়ি শহরে শিশু শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত দুজনে মিলে একটি কোচিং সেন্টার চালু করেন। কোচিং সেন্টারের আয় থেকে নিজের এবং স্ত্রীর লেখাপড়া খরচসহ পরিবারের খরচ চালান। তিনি তার কোচিং সেন্টারের গরিব ছাত্রছাত্রীদের বিনামূল্যে পড়ান। পাশাপাশি একটি বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রও পরিচালনা করেন।  বাউবির  থেকেই উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিজের কোচিং সেন্টারের কলেবর বৃদ্ধি করবেন। তার কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থী এবং বয়স্ক শিক্ষার্থীদের বাউবি’র মাধ্যমে শিক্ষিত ও দক্ষ করে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে অবদান রাখতে চান। তিনি বলেন, বাউবি না থাকলে নানা প্রতিকূল পরিবেশে লেখাপড়া করতে পারতাম না। বাউবি আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছে বাউবি আমাদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান।
নেইম্রা মারমা  বয়স ৩০ বছর। খাগড়াছড়ি শহরে বসবাস করেন। বাউবির  থেকে এইচএসসি ও বিএ/বিএসএস পাস করেছেন। ছোট বেলা থেকেই ভালো ছাত্রী ছিলেন তবে হঠাৎ মায়ের মৃত্যু ও পারিবারিক কারণে ২০১০ সালে  জেনারেল শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসির রেজাল্ট খারাপ হলে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। সাত ভাইবোনের মধ্যে নেইম্রা সবার ছোট। তার অন্য ভাইবোনেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। স্থানীয় একজনের কাছে বাউবি সম্পর্কে শুনে বাউবির খাগড়াছড়ি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রে যোগাযোগ করেন।

সেখান থেকে উৎসাহিত হয়ে ভর্তি হন খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ স্টাডি সেন্টারে এইচএসসি প্রোগ্রামে। নতুন করে জীবন শুরু করেন। অদম্য সাহসিকতা নিয়ে সামান্য টাকা লোন করে পাশাপাশি শুরু করেন ছোট্ট কলেবরে আধুনিক রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। নিজের লেখাপড়ার খরচ নিজেই যোগাড় করেন। বাউবি থেকে এইচএসসি পাস করার পর মনোবল আরও বেড়ে যায় ভর্তি হন বাউবির বিএ/বিএসএস প্রোগ্রামে। 
রাত দিন পরিশ্রম করে যখনই সময় পেতেন কাজের ফাঁকে ফাঁকে রেস্টুরেন্টেই বাউবির বই নিয়ে বসতেন। দৃঢ়চেতা মনোবলের কারণে বাউবি থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে বিএ/বিএসএস সম্পন্ন করেন। তিনি বাউবি থেকেই মাস্টার্স প্রোগ্রাম করতে চান। তিনি বলেন, বাউবি আমার জীবনের জন্য আশীর্বাদ। বাউবি না থাকলে কাজ করে লেখাপড়া করতে পারতাম না। নেইম্রা মারমা খাগড়াছড়িতে আধুনিক রেস্টুরেন্ট ব্যবসার একজন সফল উদ্যোক্তা। তার প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নচূড়া রেস্টুরেন্ট ও বিনোদন পার্ক খাগড়াছড়ি শহরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। বাউবির শিক্ষার্থীসহ খাগড়াছড়ির বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই এখানে কাজ করে লেখাপড়া করছেন। 
প্রতিদিন তার প্রতিষ্ঠানে টুরিস্ট, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণির মানুষ আসেন। নেইম্রা তাদের বাউবির গল্প শোনান। সমাজের অসহায় মানুষের প্রতিষ্ঠান বাউবি। কাজ করে বাউবিতে লেখাপড়া করা যায়।  বাউবির অনলাইন পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের লেখাপড়ার পথ সহজ করে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। দেশের জিডিপির উন্নয়নে কাজ করতে চান তিনি। তার মতে বাউবির শিক্ষার্থীদের শ্রম ও ঘামে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে সহায়ক হয়েছে। 
খাগড়াছড়ির শিক্ষার্থীরা বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ায় এবং বাউবিতে  কর্মমুখী, গণমুখী ও জীবনব্যাপী  শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানায়। তারা বাউবির মাধ্যমে লেখাপড়া করতে পারায় দারুণ খুশি।  তারা খাগড়াছড়িতে বাউবির মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর দাবি জানিয়েছে।