ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

বগুড়ার খামারের ফল যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে

এক সময়ের নিঃস্ব হাসান এখন স্ট্রবেরি চাষ করে কোটিপতি

মাহমুদুল আলম নয়ন

প্রকাশিত: ২৩:২৪, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এক সময়ের নিঃস্ব হাসান এখন স্ট্রবেরি চাষ করে কোটিপতি

এক সময়ে বিদেশে বন্দি স্বপ্ন এখন দেশের মাটিতে ডানা  মেলেছে তার। সোনার হরিণের পেছনে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার জালে জড়িয়ে ফেলেছিলেন তারুণ্যের স্বপ্ন। অচেনা বিদেশ বিভুঁইয়ের কারাগার প্রকোষ্ঠে চাপা আর্তনাদ কেউ শুনত না তার। বিদেশের রঙিন জীবনের নেশা আর ভালো উপার্জনের স্বপ্ন  কারাগারের নিকষ আঁধারে হারিয়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল সে সময়। তবে বিদেশে গিয়ে ভালো উপার্জনের স্বপ্নের ডানা এখন দেশের মাটিতেই খুলেছে বগুড়ার তরুণ কৃষি উদ্যেক্তা এম এ হাসানের। বিদেশে সব হারানো এই তরুণের গল্প এখন সাফল্যে ভরা। বিদেশের কারাগার তার স্বপ্ন যেমন কেড়ে নিতে পারেনি তেমনি বিদেশি ফল স্ট্রবেরিও তাকে হতাশ করেনি। স্ট্রবেরি চাষ করেই এক সময়ের নিঃস্ব তরুণ হাসান এখন কোটিপতি। নিজের দেশের সোনার মাটি তাকে নতুন উদ্যমে পথচলার পুঁজি ও নতুন দিনের সাফল্যের ছবি আঁকার পথ দেখিয়েছে। বিদেশের মাটিতে ভালো থাকার ঠিকানা খোঁজা হাসান এখন দেশেই পেয়েছেন স্বস্তির ঠিকানা। তাই তার চোখ ভরে এখন এই ফাগুনের আলোর দ্যুতির স্বপ্নরা ঝাঁপি খুলে বসে তার লাল-সবুজের ছোপ দেওয়া খেতে। সবুজের সঙ্গে লাল বর্র্ণের ফুটে ওঠা নিজের খেত শুধু চিত্তাকর্ষক বা মনোমগ্ধকর এক খামারই নয়, স্বপ্ন ভাঙা এক তরুণের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সফলতার প্রতিচ্ছবি। নিজগ্রামে বিশাল স্ট্রবেরি খামারের সাফল্যে তাকে এ অঞ্চলে অন্যতম কৃষি উদ্যোক্তার পরিচয় এনে দিয়েছে। এটি উত্তরের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ স্ট্রবেরি খামার।
বগুড়া সদরের শেষ সীমানা ঘেঁষে বগুড়ার শিবগঞ্জ ও গাবতলি উপজেলার সীমানার কাছেই সবুজে ছাওয়া হাসানের গ্রাম সদরের রায়মাঝিড়া। এখানকার উর্বর জমিই তাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখিয়েছে। বোরো জমিতে সেচ দেওয়ার স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির এঁকে বেঁকে জমির আইল ধরে চলে যাওয়ার পথে নীরবতা ছন্দপতন, শ্যালো মেশিন থেকে পানি ওঠানোর শব্দে ভাঙে এই নীরবতা। তবে এসব শব্দ যেন থেমে যায় হাসানের মনোলভা স্ট্রবেরি খামারের প্রান্তে। পরিচ্ছন্ন খামারে গুল্মজাতীয় স্ট্রবেরি গাছের ফাঁক দিয়ে লাল বর্ণের মোহনীয় উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে ফল। সকাল থেকে কর্মীদের ব্যস্ততা আর বিশাল খামারের চোখ জুড়ানো সবুজ আর লালের হাতছানি। একেবারে গ্রামীণ এলাকায় এ ধরনের বিশাল যজ্ঞের স্ট্রবেরি খামার অনেককে হতচকিত করে বিহ্বলতা এনে দেবে। তবে মোহনীয় এই স্ট্রবেরির খামার একই সঙ্গে মুগ্ধতাও এনে দেবে।
এক যুগ আগের কথা। হাসান তখন কেবল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ে পা দিতে ঢাকায়। তবে তার মনোজগত জুড়ে ছিল বিদেশের চাকচিক্যে চোখ ধাঁধানো জীবনের হাতছানি। গ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বিদেশে গিয়ে অনেক টাকা আয় আর উন্নত জীবনের টান তাকে অষ্ট্রেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। শেষমেশ পাড়ি জমান অচেনা দেশের উদ্দেশে। তবে বিধি বাম। ভ্রমণের নথি নিয়ে জটিলতায় ইউরোপোর দেশ জর্জিয়ায় কারাগারে গিয়ে স্থান হয়। তখন তার চোখে ঘোর অন্ধকার। ৬ মাস কারাগারে থাকার পর ফিরেন দেশে। তবে বিদেশে যাওয়া তার কাছে জেদে পরিণত হয়েছিল। ৩ বারের চেষ্টায় অবশেষে মালয়েশিয়ায় গিয়ে কিছু দিন থিতু হতেই অবার বিপদ। সেখান থেকে কোনোমতে রক্ষা পেয়ে ফিরেন দেশে। তবে ততদিন ঋণের ভার তার পুরো পরিবারকে গিলে খেতে বসেছে। বাড়ি ফিরে কি করবেন তা চিন্তা করতেই আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। কিছু যে করবেন তার মূলধন কই। এলাকার সমিতি থেকে ৪৬ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন কৃষি খামার গড়ার সংগ্রাম। প্রথমে পেঁপে চাষ। এর পরেই স্ট্রবেরি চাষ নিয়ে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন। দেখলেন কম সময়ের ফল চাষে তুলনামূলক কয়েগুণ বেশি লাভ। শুরু করলেন স্ট্রবেরি চাষ। তবে প্রথম কয়েক বছর এ জন্য করতে হয়েছে প্রচুর পরিশ্রম। একপর্যায়ে হালছাড়ার কথাও ভেবেছিলেন। তবে  লেগে থাকার কারণে আর পেছনে ফিরতে হয়নি। এখন মোট ৭ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। এর সঙ্গে রয়েছে ১ বিঘা জমির ওপর চারা তৈরি পলিনেট হাউস (কৃষি বিভাগ থেকে তৈরি করে দেওয়া)। তবে স্ট্রবেরিতেই থেমে নেই তিনি। আরও ৭ বিঘা জমিতে মাল্টা, ড্রাগন, উন্নত জাতের কলা ও পেয়ারা বাগান করেছেন। জানালেন স্ট্রবেরি চাষ ও ফলন ৫ মাসের। এর মধ্যে মধ্যে ফলন হয় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ এপ্রিল পর্যন্ত। ডিসেম্বর থেকে চারা লাগালে এই সময় পর্যন্ত ফলন হয়। এর আগেও চারা লাগানো যায়। হাসানের স্ট্রবেরি খামারে আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল, উইন্টার ডন, থাই-ইতালি জাত ও ফ্রিডম ২৪ জাতের স্ট্রবেরির প্রায় ৩৫ হাজার গাছ থেকে ফল হয়। গড়ে প্রায় ১ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায় প্রতি গাছ থেকে মৌসুমে।  সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে সাড়ে ৪শ’ টাকায় প্রতি কেজি স্ট্রবেরি বিক্রি হয়। অনলাইন মার্কেট থেকে শুরু করে পাইকারদের অর্ডার অনুযায়ী ফল তোলা হয় বাগান বা ফার্ম থেকে। হাসানের শালিন অ্যাগ্রো ফার্ম নামে এই স্ট্রবেরি খামার থেকে প্রতিদিন ২ থেকে আড়াইশ’ কেজি স্ট্রবেরি স্থানীয় বাজার ছাড়াও রংপুর, নীলফামারী, যশোর, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, কুষ্টিয়া ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় স্ট্রবেরি যায়। যার দাম লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। শুধু ফল নয় এখান থেকে চারা উৎপাদনও তার খামারের মূল আর্থিক উৎস হয়ে উঠেছে। বছরে প্রায় ২ লাখ চারা বিক্রি করেন ১৫ থেকে বিভিন্ন টাকা দরে। কৃষি বিভাগের স্থানীয় উপ-সহাকরী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল কিবরিয়া জানান, চারা উৎপাদন ও স্ট্রবেরি চাষে সবধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পলিনেট হাউস করে দেওয়া হয়েছে চারা উৎপাদনের জন্য। এ ছাড়া ট্রাইকোকম্পোস্ট সারের জন্য একটি ইউনিট করে দেওয়া ছাড়াও তরুণ উদ্যোক্তা হাসানকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। হাসান তার ফার্মে মালচিং পদ্ধতিতে স্ট্রবেরি উৎপাদন করছেন। হাসান জানালেন, স্ট্রবেরি চাষের সঙ্গে একই জমিতে তিনি সাথী ফসল হিসাবে তরমুজ চাষ শুরু করেছেন। স্ট্রবেরি ফলন শেষ হলে পুরোদমে তরমুুজ লাগাবেন। সাথী ফসল হিসাবে তরমুজ থেকেও ভালো লাভ করা যায়। এক সময়ে বিদেশের কারাগারে স্বপ্ন খুইয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথ থেকে সফল উদ্যেক্তা হওয়া হাসানের স্ট্রবেরি চাষের খামার এখন উত্তরের মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। তার স্ট্রবেরি খামারে প্রায় ১৮ জন শ্রমিক কাজ করেন। এরমধ্যে ১০ জন নিয়মিত। খামারের কাজে শ্রমকিদের আসা যাওয়ার জন্য ২টি মোটরসাইকেল কিনেছেন। নিজে চালান প্রাইভেটকার। বিদেশে যাওয়ার জন্য যে ঋণ পরিবার করেছিল তা আর নেই। পরিবারের মুখে হাসি এনে দেওয়ার সঙ্গে তার এগিয়ে যাওয়ার পথকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তার লক্ষ্য স্ট্রবেরি ফার্মকে সামনে আরও বড় করা। লিজ নেওয়া জমিতে তিনি চাষ করেন। আগামীতে ৭ বিঘার খামার ১৬ বিঘাতে পরিণত করে একটি আধুনিক খামার প্রতিষ্ঠা তার বড় স্বপ্ন। জানান অন্য যে সব ফল করছেন আগামীতে সেসব ফল না করে পুরো জমিতেই স্ট্রবেরি চাষের খামার গড়ে তোলার লক্ষ্য। এভাবেই এক অত্যাধুুনিক কৃষি ফার্ম গড়ে তোলার পথে এগিয়ে যেতে চান।
স্ট্রবেরির উদ্ভিদীয় নাম ফ্রাগারিয়া। প্রাচীন রোমান সাহিত্যে স্ট্রবেরির কথা রয়েছে। শুধু ফল হিসাবে নয়, নানা স্বাদের খাদ্য, পানীয় তৈরিতে এর প্রাসঙ্গিকতার জুড়ি মেলা ভার। এক সময় এটি  ছিল রাজকীয় খাবারের অংশ। সুদূর ফ্রান্সে এর চাষ ১৮ শতকের মাঝের সময়ে এর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হলেও এর চাষ ও গুণাবলির কথা ইতিহাসে মিলে অনেক আগে থেকে। ১৫ থেকে ১৬শ’ শতকে এর চাষ ও এর নানা বর্ণনা বর্ণিত হতে দেখা যায়। তবে ফ্রান্সের সঙ্গে এটি উত্তর আমেরিকার ও ইউরোপের অন্য অঞ্চলেও পুষ্টি, স্বাদ আকর্ষণীয়তায় এটির চাষ বাড়ে। প্রধানত শীত প্রধান দেশের ফল হলেও উষ্ণ শীত এলাকাতেও এর চাষ হয় বলে এটির চাষ দেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন উত্তরের জেলাগুলোতে এর সম্ভবনা বেশি। এ বিষয় বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক  সোহেল মো. সামসুদ্দিন ফিরোজ জানান,বগুড়া সদর ছাড়াও শাজাহানপুর, শেরপুর, নন্দীগ্রাম শিবগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। কৃষিবিভাগের হিসাবে মতে বগুড়ায় ১৬ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে সদরের শালিন অ্যাগ্রো সবচেয়ে বড় ও কমার্শিয়াল খামার। জেলায় স্ট্রবেরির সম্ভবনা থাকলেও এটি সংরক্ষণের সমস্যা দূর হলে এটি চাষে আগামীতে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠবে। বাজারও হবে বড়। বগুড়া থেকে উৎপাদিত স্ট্রবেরি খুলনা,পটুয়াখালী, শেরপুর, যশোর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে। এর সঙ্গে চারাও এখান থেকে বাইরে যাচ্ছে।

প্যানেল / জোবায়ের

×