হবে কী হবে না- চলছিল এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব। চার দফার তারিখ পরিবর্তনের পর বইনির্ভর আনন্দযজ্ঞের সূচনাটা হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। এক মাসের পরিবর্তে এবার অমর একুশে বইমেলার ব্যাপ্তি নির্ধারিত হয় ১৮ দিনে। রবিবার ছিল দেশের সবচেয়ে বড় সেই সাংস্কৃতিক উৎসবের শেষ দিন। সেই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, কেমন হলো এবারের বইমেলা? উত্তরে বলতে হয় রোজার মাসে মেলা হওয়ায় কাক্সিক্ষত পাঠকের সাড়া মেলেনি। তাই বইয়ের বিকিকিনিও কম হয়েছে। শুরু থেকেই এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন মেলায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ প্রকাশক। গড় হিসাবে এবার ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বই বিক্রির পরিমাণ আনুমানিক ১৭ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি। যদিও একাডেমির দেওয়া বই বিক্রির এই হিসাবকে অসত্য তথ্য উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে সৃজনশীল প্রকাশকদের মোর্চা প্রকাশক ঐক্য। অন্যদিকে মেলার সময় সংক্ষিপ্ত হওয়ায় এবার কমেছে নতুন বই প্রকাশের সংখ্যা। সব মিলিয়ে ২০০৭টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ। তাই বলে কী বলা যায় এবারের মেলা মলিন হয়েছে? তেমনটাও বলা যায় না। কারণ, দুই হাজার নতুন বইয়ের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে বেশ কিছু মানসম্পন্ন উপন্যাস, গল্প, কবিতা, রাজনীতি ও গবেষণাধর্মী সৃজনশীল ও মননশীল বই। সমঝদার পাঠকেরা মেলা প্রাঙ্গণ চষে বেড়িয়ে সংগ্রহ করেছেন সাহিত্যের গুণমানসম্পন্ন গ্রন্থসমূহ। অন্যদিকে পাঠক খরার মাঝেও বেঙ্গল বুকস, মাওলা ব্রাদার্স, ঐতিহ্য, পাঠক সমাবেশ, প্রথমা, বাতিঘরসহ হাতেগোনা কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বই বিক্রির পরিমাণ প্রত্যাশিত হলেও সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেছে। এমন বাস্তবতায় প্রকাশকরা বলছেন, আগামী কয়েক বছর ফেব্রুয়ারি মাসে রোজা শুরু হবে। এবারের অভিজ্ঞতা হবে তাদের আগামীর পাথেয়। এই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে সাজাবেন আগামীর বইমেলার পরিকল্পনা।
এ প্রসঙ্গে প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা আশঙ্কা করেছিলাম এবারের বইমেলায় লোকসান হবে। তেমনটাই হয়েছে। নিশ্চিত ক্ষতি জেনেও নির্বাচিত একটি সরকারের প্রতি আস্থা জানাতেই অধিকাংশ প্রকাশনী অংশ নিয়েছে এবারের মেলায়। তাই আগামী বছর প্রকাশকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিলে রোজার আগেই মেলা শুরু করতে হবে। সেক্ষেত্রে জানুয়ারির ৭ তারিখ থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখে মেলা শেষ হতে পারে। তাহলে একই সঙ্গে ভাষার মাসকেও ছুঁয়ে যাবে বইমেলা। এছাড়া জানুয়ারিতে শীতের আমেজ এবং স্কুল-কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার চাপ না থাকায় উৎসমুখর একটা আবহ থাকবে। অন্যথায় ফেব্রুয়ারিতে রোজার মধ্যে মেলা চালু রাখলে পুনরায় প্রকাশকদের লোকসান গুনতে হবে। আবার ঈদের পর অর্থাৎ মার্চ মাসে গরমের মধ্যে মেলা জমবে না। এজন্য আমরা সৃজনশীল প্রকাশকরা আগামী বছরের মেলার পরিকল্পনা সাজাতে কিছুদিনের মধ্যেই বৈঠকে বসব। সবাই মিলে মেলার জন্য একটি উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করব।
আদর্শ প্রকাশনীর মাহবুবুর রহমান বলেন, লোকসানের বোঝা নিয়েই এবারের মেলা শেষ হয়েছে। স্টল ভাড়া পুরো মওকুফ করা হলেও স্টল নির্মাণের কাঠামোসহ বিক্রয় কর্মীদের ভাতা মিলিয়ে মুনাফা তো দূরের কথা বিপুল সংখ্যক প্রকাশনীর খরচ ওঠেনি। তাই এখন থেকেই আমাদের ভাবতে হবে আগামী বছরের মেলা কিভাবে আরও কার্যকরভাবে আয়োজন করা যায়।
প্রকাশকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ভবিষ্যতের বইমেলার ধরন ও সময় নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা থাকবে তাদেরই। প্রকৃত অর্থে আমরা কেবল আয়োজক। মেলার মূল অংশীদার হচ্ছেন প্রকাশকরা। তাই আগামী মেলা কেমন হবে এবং কবে হবে সেই সিদ্ধান্ত তাদেরকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য সরকারের সদিচ্ছাও গুরুত্ববহ ভূমিকা রাখবে।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কম হয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশক স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও তুলতে পারেননি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের স্টলে পাঁচ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।
আবার বই বিক্রি কম এবং লোকসান হয়েছে এমন দাবির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারী প্রকাশনীও রয়েছে। তেমন কথাই বললেন বেঙ্গল বুকসের প্রকল্প পরিচালক আজহার ফরহাদ। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, মূলত মেলা হওয়া না হওয়ার দোদুল্যমানতায় অধিকাংশ প্রকাশনী পরিকল্পনামাফিক মানসম্পন্ন নতুন বই প্রকাশ করতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে এসব প্রকাশনীতে মানসম্পন্ন নতুন বই না থাকায় তাদের বিক্রি ভালো হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রকাশনী মেলার খরচ তুলে বরং লাভের মুখ দেখেছে।
এবার সমাপনী দিনের মেলার কথা। এদিনও পাঠকের পদচারণা কম থাকায় বিক্রির গতি ছিল মন্থর। দুপুর বেলায় স্টলগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল সামান্য। তারপরও কিছু মানুষ বিকেল থেকে মেলায় এসেছেন। বই সংগ্রহের পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে বসেই ইফতার করেছেন। এরপর রাত অবধি আড্ডা-গল্পে সুন্দরতম সময় কাটিয়েছেন। তেমন এক পাঠক ফারহানা আফরিন বলেন, বই আমার বিনোদনের প্রধানতম অনুষঙ্গ। তাই আগে দু’দিন এলেও শেষদিনও চলে এসেছি। স্টল ঘুরে ঘুরে গল্প, কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি রাজনীতি, গবেষণাসহ বিবিধ বিষয়ের বই সংগ্রহ করেছি।
শেষদিনে মেলার প্রান্তর ঘুরে জানা যায়, এ বছর বিক্রির শীর্ষে ছিল মননশীল সাহিত্য। উপন্যাস পড়ুয়া পাঠক এবার চিন্তাশীল প্রবন্ধ ও বিষয়ভিত্তিক রচনাবলীর দিকে ঝুঁকেছে। এ প্রসঙ্গে কথাপ্রকাশের ব্যবস্থাপক মো. ইউনুস বলেন, তরুণ পাঠকরা তাদের পাঠ্যসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বই কিনেছেন। নতুন বিষয়ে জানতে আগ্রহী তরুণরা বিষয়ভিত্তিক বই খুঁজেছেন। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আঞ্চলিক ইতিহাস পড়ার প্রবণতা বেড়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সমসাময়িক প্রযুক্তি নিয়ে লেখা বইগুলোর কাটতি ছিল ভালো। বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী অনুবাদের বইগুলোও কাছে টেনেছে অনেক পাঠককে।
বই বিক্রির হিসাব : সমাপনী দিনে বাংলা একাডেমির দেওয়া প্রতিবেদনে জানানো হয়, মেলায় অংশ নেওয়া ২৬৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী ১৭ দিনে তাদের বিক্রি হয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা। মেলায় মোট অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫৮৪টি। এর মধ্যে ১৪টি ছিল মিডিয়া ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ছিল ৫৭০টি। এই তথ্যের ভিত্তিতে মেলা পরিচালনা কমিটি ধারণা করছে গড়ে সব মিলিয়ে ৫৭০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রির পরিমাণ ১৭ কোটি টাকার মতো হতে পারে। মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব সেলিম রেজা তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রে কম ইউনিট বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি বেশি হয়েছে, তুলনামূলকভাবে বেশি ইউনিট পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায়।
সমাপনী অনুষ্ঠান : বিকেলে মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বইমেলার সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘গুণীজন স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, যে বই পাঠককে মনের ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে, ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগ্রত করে এবং রাষ্ট্র গঠনে ও উন্নত চিন্তা-চেতনা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে সেটিই মানসম্পন্ন বই। একটি জাতির কল্যাণ ও ভবিষ্যৎ পাঠাভ্যাস দ্বারা নির্ণিত হয়। কাজেই পাঠকদের হাতে ভালো ও মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়ার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে নতুন প্রজন্মকে পুনরায় বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, কেবল জ্ঞানই পারে একটি সমাজকে সঠিকভাবে শাসন করতে এবং বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য বজায় রাখতে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় পাঠাগার সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করে মন্ত্রী বলেন, আমরা লাইব্রেরিগুলোকে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাব এবং সেখানে সরকারিভাবে বই সরবরাহের ব্যবস্থা করব। প্রকাশকদের প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা মানসম্মত বই প্রকাশ করুন, যাতে আমাদের সন্তানরা আবার বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়।
প্যানেল / জোবায়ের








