মাঘের শেষ বিকেল। শীতের রুক্ষতা তখনো পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। মাঠের ঘাসে ধুলা, খাল-বিলের পানি কমে এসেছে, গাছের ডালে ক্লান্তির ছাপ। এমন সময়ই হঠাৎ চোখে পড়ে আগুনরঙা এক বিস্ময় শিমুল ফুল। যেন দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম আহ্বানে জেগে ওঠে সে। সারা বছর নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছ ফাগুনের শুরুতেই লাল শিখায় জ্বলে উঠে জানিয়ে দেয় বসন্ত এসেছে।
যশোরের গ্রামে গ্রামে এখন সেই রঙের উচ্ছ্বাস। শার্শা উপজেলার কাশিপুর থেকে চৌগাছা উপজেলার কাবিলপুর, ধুলিয়ানি পেরিয়ে ফতেপুর হয়ে বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের পূর্ব পাশের সড়কে গেলে দেখা মেলে সারি সারি শিমুলগাছ। দু’পাশ লাল হয়ে আছে। দূর থেকে মনে হয়, কেউ যেন রাস্তার ধার জুড়ে আগুনের মালা টাঙিয়ে দিয়েছে। ঝলমলে রৌদ্রের আলোয় সেই লাল আরও দীপ্ত, আরও গভীর।
শিমুলের এই রং এক আবেগ। কবি-সাহিত্যিকদের কলমে বহুবার ফিরে এসেছে এই রক্তিম ফুল। কোকিলের ডাক, আম-লিচুর মুকুল, বাতাসে মৃদু উষ্ণতার স্পর্শ সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রেমের ডাক শোনায়। শিমুলের লাল পাপড়ি নীল আকাশের পটভূমিতে এমনভাবে ফুটে ওঠে, মনে হয় প্রকৃতি নিজেই রাঙা আলপনা এঁকেছে।
শিমুলগাছের একটি আলাদা স্বভাব আছে। অন্য গাছ যখন নতুন পাতা মেলে, শিমুল তখন প্রায় নিরাবরণ। পাতা ঝরিয়ে খালি ডালে ফুল ফোটায় সে। এই নগ্ন ডালের ওপর রক্তলাল ফুলের বিস্ফোরণ দৃশ্যটি একই সঙ্গে সাহসী ও সৌন্দর্যময়। কিছুদিন পর সেই লাল রঙ ম্লান হয়ে আসে, ফুল শুকিয়ে সাদা-ধূসর তুলায় রূপ নেয়। বাতাসে ভেসে যায় শিমুলের তুলা গ্রামের আকাশে ভেসে বেড়ায় ছোট ছোট মেঘের মতো।
একসময় এই তুলা ছিল গ্রামের অর্থনীতির অংশ। শিশুরা কুড়িয়ে আনত, বড়রা বিক্রি করত। অনেক পরিবার নিজের গাছের তুলা দিয়ে বানাত লেপ, তাষক, বালিশ। শীতের
রাতে সেই লেপের উষ্ণতায় থাকত শিমুলেরই স্পর্শ। শিমুল শুধু বসন্তের রূপসী নয়, সে ছিল উপকারি, ঔষধি গুণসম্পন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান একটি গাছ।
কিন্তু কালের বিবর্তনে এই চিরচেনা দৃশ্য ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। এখন আর খুব একটা শিমুলগাছ রোপণ করতে দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি যেন কেবল স্মৃতির গাছ। জমির চাহিদা, দ্রুত ফলনশীল গাছের প্রতি আগ্রহ, নগরায়ণের চাপ সব মিলিয়ে শিমুল ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে গ্রামবাংলার বুক থেকে। যে গাছ এক সময় ফাগুনের আগমনী বার্তা দিত, আজ সে নিজেই বিলুপ্তির পথে।
তবু যেখানে আছে, সেখানে সে আজও সমান উজ্জ্বল। বসন্তের সকালে রক্তলাল শিমুলের দিকে তাকালে মনে হয় প্রকৃতি এখনো বেঁচে আছে, এখনো জেগে ওঠার শক্তি রাখে। এই ফুল দীর্ঘ নীরবতার পরেও জ্বলে ওঠা যায়, শূন্য ডালেও রং ছড়ানো যায়।
যশোরের মেঠোপথ, বাওড়ের ধারে কিংবা গ্রামের নির্জন প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সময়ের সাক্ষী, স্মৃতির বাহক, গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক। ফাগুনের আগুনরঙা এই দূত আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে তার সঙ্গে সম্পর্কও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। না হলে একদিন হয়তো বসন্ত আসবে, কিন্তু শিমুলের লাল আগুন আর দেখা যাবে না।
প্যানেল / জোবায়ের








