একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট মানেই ছিল মানুষের কোলাহল, ঢোলের শব্দ আর বেহারাদের ছন্দময় হাঁক, ‘হুনহুনা হুনহুনা’এই ডাকের সঙ্গে সঙ্গে দুলে দুলে এগিয়ে যেত পালকি। পালকির ভেতরে বসে লাজুক নববধূ, আর চারপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড় ছিল বাঙালির সামাজিক জীবনের এক অনন্য চিত্র। আজ সেই পালকি আর নেই বললেই চলে।
সময়ের স্রোতে, প্রযুক্তির দাপটে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালি ঐতিহ্যের এই রাজকীয় বাহন।
গ্রামবাংলায় একসময় বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা দূরযাত্রা। সবখানেই পালকি ছিল অপরিহার্য। পালকি শুধু যাতায়াতের বাহন ছিল না; এটি ছিল মর্যাদা, সম্মান ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক। বিশেষ করে নারীদের জীবনে পালকির গুরুত্ব ছিল আলাদা। বিয়ের দিনে পালকিতে চড়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া ছিল প্রতিটি বধূর কল্পনার অংশ।
কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘পালকির গান’ এ এই ঐতিহ্যকে অমর করে রেখেছেন। কবিতার ছন্দে, শব্দের ঝংকারে আজও ভেসে ওঠে সেই হারানো সময়। পালকি সাধারণত তিন ধরনের হতো। যেমন, সাধারণ পালকি, আয়না পালকি ও ময়ূরপঙ্খী পালকি। কাঠের তৈরি এই বাহনগুলোতে থাকত বাহারি কারুকাজ। পাখি, লতাপাতা, ফুল আর নানা নকশায় সাজানো পালকি ছিল যেন চলমান শিল্পকর্ম।
ময়ূরপঙ্খী পালকির ভেতরে থাকত পালঙ্কের মতো আরামদায়ক আসন। আয়না পালকিতে বসানো থাকত চকচকে আয়না। এসব পালকি বহন করত চার থেকে ছয়জন শক্তপোক্ত বেয়ারা। তাদের কাঁধে ভর করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ চলত পালকি। মানুষের শক্তিই ছিল এর একমাত্র চালিকাশক্তি।
পালকি কেবল বাহন নয়, গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বেয়ারাদের হাঁক শুনে বাড়ির উঠানে জড়ো হতো নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সবাই। হাসি, গল্প, কৌতুক আর কৌতূহলে মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা।
মুসলিম সমাজে পালকি ছিল নারীদের পর্দা রক্ষার নিরাপদ বাহন। হিন্দু সমাজেও বউ-মেয়েদের যাতায়াতে পালকির প্রচলন ছিল ব্যাপক। বিত্তবান পরিবারগুলোর নিজস্ব পালকি ও বেয়ারা থাকলেও সাধারণ মানুষ ভাড়ায় পালকি ব্যবহার করত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল ও পাঠান আমলে রাজা-বাদশা, বেগম ও শাহজাদীদের প্রধান বাহন ছিল পালকি। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকালে পালকি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়।
তবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্টিমার ও রেলগাড়ির প্রচলন এবং পরবর্তীতে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে পালকির গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৯৩০-এর দশকে রিকশার আগমনে শহরাঞ্চলে পালকি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আজ রাজা নেই, বাদশা নেই, নেই সেই বেয়ারাদের হাঁক। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় পালকি এখন শুধুই স্মৃতি। যদিও কেউ কেউ বিয়েতে নতুনত্ব আনতে বা নাটক-সিনেমার প্রয়োজনে পালকির ব্যবহার করছেন, তবু সেই প্রাণ, সেই আবহ আর ফিরে আসে না।
সমাজসেবীরা মনে করেন, পালকি সংরক্ষণ করা না গেলে একদিন এটি শুধু জাদুঘরের প্রদর্শনী বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে। তখন নতুন প্রজন্মকে গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য দেখতে যেতে হবে লোকজ শিল্প জাদুঘরে। কৃত্রিম আলোয় সাজানো এক নিস্তব্ধ পালকির সামনে দাঁড়িয়ে।
পালকি হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি বাহনের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যাওয়া মানে একটি সময়, একটি সংস্কৃতি, একটি জীবনধারা। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে গিয়েও যদি আমরা আমাদের শিকড় ভুলে যাই, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। পালকি তাই শুধু অতীত নয়, এটি বাঙালির পরিচয়ের নীরব সাক্ষী।
প্যানেল / জোবায়ের








