যশোর জেলার সদর উপজেলার ১ নং হৈবতপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামে আছে ইতিহাসের এক বিস্মৃত সাক্ষী ‘নিশ্চিন্তপুর গড়’। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি বহুদিন ধরেই একটি ঐতিহাসিক গড় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু সময়ের স্রোত, অবহেলা আর দখল-দূষণের চাপে আজ সেই গড় প্রায় বিলুপ্তির পথে।
যশোর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে এবং উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত এই প্রত্নস্থানটি সদর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় এটি একসময় গুরুত্বপূর্ণ জনপদ বা প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ছিল এমন ধারণাই করেন স্থানীয়রা।
নিশ্চিন্তপুর গড় মূলত আদি ঐতিহাসিক যুগের মৃত্তিকা নির্মিত একটি দুর্গ বা প্রতিরক্ষা কাঠামো বলে ধারণা করা হয়। বহু আগে নির্মিত এই গড় মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যদিও এর নির্মাণকাল বা ঐতিহাসিক পটভূমি নিয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট গবেষণা বা সরকারি সংরক্ষণ উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়, তবু স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে এটি ইতিহাসের অংশ হয়ে বেঁচে আছে।
একসময় উঁচু মাটির প্রাচীর ও প্রশস্ত পরিখায় বেষ্টিত ছিল গড়টি। বর্তমানে গড়ের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মৃত্তিকা নির্মিত দেওয়ালের কিছু অংশ টিকে থাকলেও সেগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত। গড়সংলগ্ন তিন পাশে প্রায় ৫০ ফুট প্রশস্ত পরিখার অস্তিত্ব ছিল, যা এখন ভরাট হয়ে চাষাবাদের জমিতে পরিণত হয়েছে। দূর থেকে দেখলে বোঝাই কঠিন যে এখানে কোনোদিন একটি সুগঠিত প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা ছিল।
গড়ের অভ্যন্তরভাগ এখন প্রায় সমতল ভূমি। সেখানে তেমন কোনো সাংস্কৃতিক জঞ্জাল বা প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। উঁচু ভূমির অংশে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, খনন করা হয়েছে পুকুর। উত্তর পাশের জমি নিয়মিত চাষাবাদের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ১০৪ বিঘা আয়তনের এই প্রতœস্থলের জমির বর্তমান মালিক আফসার আলী।
সময় আর মানবিক হস্তক্ষেপ মিলিয়ে গড়টির অবস্থা আজ বিপন্ন। চারপাশের পরিখা ভরাট হয়ে গেছে, উঁচু মাটির প্রাচীর কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে চাষের সুবিধার্থে। কোথাও তৈরি হয়েছে রাস্তা, কোথাও ঘরবাড়ি। ফলে গড়ের প্রাচীন কাঠামো আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
নিশ্চিন্তপুর গড় আমাদের অতীতের দলিল। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও সংরক্ষণের অভাবে এমন বহু নিদর্শন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যথাযথ জরিপ, গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে অচিরেই নিশ্চিন্তপুর গড় কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে ভূমির বুকে তার অস্তিত্বের কোনো চিহ্নই হয়তো আর থাকবে না।
ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা, উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধ। নিশ্চিন্তপুর গড় যেন সেই দায়বদ্ধতার পরীক্ষায় আরেকটি ব্যর্থতার গল্প হয়ে না ওঠে এটাই স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।
প্যানেল জোবায়ের








