ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

‘হাসান আরিফ অন্তরে মম’ শীর্ষক অনুষ্ঠান শিল্পকলায়

সংস্কৃতি প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০১:৫৯, ২ ডিসেম্বর ২০২৩

‘হাসান আরিফ অন্তরে মম’ শীর্ষক অনুষ্ঠান শিল্পকলায়

শিল্পকলায় হাসান আরিফ অন্তরে মম শীর্ষক অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনা

কবিতার সঙ্গে তার ছিল বিশেষ সখ্য। তার শিল্পিত উচ্চারণে বইয়ের পাতায় থাকা কবিতাগুলো হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। অন্যদিকে ছিলেন তিনি দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সামনের সারির অন্যতম সংগঠক। পালন করেছেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। জীবনের একটি লম্বা সময় দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দীর্ঘ সময় পালন করেছেন বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। শুক্রবার উদ্যাপিত হলো সেই কীর্তিমান আবৃত্তিশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হাসান আরিফের জন্মদিন। গানের সুরে, নাচের নান্দনিকতা ও কবিতার দোলায়িত ছন্দে নিবেদিত হলো হাসান আরিফের প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ। সঙ্গে ছিল হাসান আরিফের ঘনিষ্ঠজনদের বয়ানে তার কর্মের মূল্যায়নধর্মী আলোচনা ও স্মৃতিচারণ। আলোচনায় বক্তারা বলেন, একই সঙ্গে দ্রোহ ও প্রেমের শিল্পী ছিলেন হাসান আরিফ। হেমন্ত সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে হাসান আরিফ অন্তরে মম শীর্ষক অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে হাসান আরিফ স্মৃতি সংসদ।  
রবি ঠাকুরের গীতবাণীকে সঙ্গী করে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বহু কণ্ঠ মিলে যায় এক স্বরে। গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের শিল্পীরা গেয়ে শোনায়Ñ এদিন আজি কোন্্ ঘরে গো/খুলে দিল দ্বার/আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হলো কার ...। সেই সুরের সহযোগে নাচ করে স্পন্দনের একঝাঁক নৃত্যশিল্পী। সূচনা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনার পর প্রজ্বালন করেন বিশিষ্টজনরা। এর পর কথন ও স্মৃতিচারণের সঙ্গে বহুমাত্রিক পরিবেশনার আশ্রয়ে এগিয়ে যায় আয়োজন। 
নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, কোনো মানুষ ও শিল্পীর মৃত্যু নেই যতদিন তাকে অন্যরা স্মরণ করে। এই স্মরণ আনুষ্ঠানিক নয়; প্রাত্যহিক। হাসান আরিফ তেমনই শিল্পী ও মানুষ। এদেশের সংস্কৃতিকর্মীদের অনুভব ও উপলব্ধি তাকে ভুলতে দেয়নি। এতে প্রমাণ হয়, হাসান আরিফ এক মৃত্যুহীন শিল্পী। 
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, বেঁচে থাকা অবস্থায় হাসান আরিফ আমাদের জীবনের প্রাণ হিসেবে কাজ করেছেন। তাই তার চলে যাওয়ায় এক ধরনের অবসাদ কাজ করে। স্মৃতির খ- টুকরো মেলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে হাসান আরিফকে প্রথম রাজপথে দেখা। যে আরিফ মঞ্চে আবৃত্তি করত সেই আরিফ প্রয়োজনে দুরন্ত প্রতিবাদী মানুষ হয়ে উঠত। সেই সুবাদে দ্রোহ ও প্রেমের শিল্পী ছিলেন হাসান আরিফ। সর্বদাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ, অনুভূতি ও ভালোবাসা হাসান আরিফের দেহ-মনে জাগরূক ছিল। 
স্বাগত বক্তব্যে আবৃত্তিশিল্পী আহ্্কাম উল্লাহ্্ বলেন, যে কোনো দুঃসময়ে সহযোদ্ধার পাশে দাঁড়ানো এক মানুষের নাম হাসান আরিফ। তাই মানুষটির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে হলে তার চেতনা, আদর্শ ও দর্শনকে ধারণ করতে হবে।   
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সামাদ বলেন, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এখন অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে। প্রতিবাদের জায়গা থাকলেও মানুষ প্রতিবাদ করছে না। আরিফ ছিল ঠিক এর বিপরীত। তাই এই সময়ে আরিফের অভাব বিশেষভাবে অনুভব হয়। কারণ, মনন ও কথায় সে একই রকম ছিল। দেশ, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি ও মানুষকে ভালোবেসে গেছে আরিফ। নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশে আবৃত্তিচর্চা ছড়িয়ে দিয়ে সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম পুরোধা হিসেবে কাজ করেছে। সব মিলিয়ে হাসান আরিফ ছিল সাধক ও শ্রুতিধর আবৃত্তিশিল্পী। 
বন্ধুত্বের স্মৃতি রোমন্থন করে আবৃত্তিশিল্পী শিমুল মুস্তাফা বলেন, আরিফ এমনভাবে হাসি দিত তা আগুনের হাসি নাকি বরফের হাসিÑ আমি বুঝতে পারতাম না। ভাবতে পারি না আরিফ নেই। এর পর তিনি আবৃত্তি করেন সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ‘দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ’। আরেক আবৃত্তিশিল্পী ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দেশের আবৃত্তি অঙ্গনে যখন সমন্বয়হীনতা ছিল তখন আরিফের চেষ্টায় আমরা সমন্বিত হয়েছি। মানুষকে দারুণভাবে উজ্জ্বীবিত করতে পারত আরিফ।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন  লেখক ও গবেষক গোলাম কুদ্দুছ, নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী ও হাসান আরিফের বোন রাবেয়া রওশন তুলি। পরিবেশনা পর্বে আবৃত্তি সংগঠন শ্রুতিঘর পরিবেশন করে হাসান আরিফের প্রন্থিত ও নির্দেশিত আবৃত্তি প্রযোজনা ‘তনু তোর জন্য’। শিল্পী মহাদেব গেয়ে শোনান হাসান আরিফের প্রিয় সংগীত ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা’। হাসান আরিফের আবৃত্তি করা ‘রাত বেড়েছে’ কবিতার সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে ধৃতি নর্তানালয়। শারমিন সাথী ইসলাম ময়না গেয়েছেন ‘আমি অকৃতি অধম বলেও তো কিছু কম করে মোরে দাওনি’। মামুন জাহিদ পরিবেশন করেন ‘আমি সুরে সুরে ওগো তোমায় ছুঁয়ে যাই’।
 

×