ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

দখলে অস্তিত্বহীন দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত

মামুন-অর-রশিদ, রাজশাহী

প্রকাশিত: ২০:৩১, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩

দখলে অস্তিত্বহীন দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত

রাজশাহী নগরীর ফুটপাতগুলো অবৈধ দখলদারদের কবলে

রাজশাহী নগরে নির্মিত সড়কের দুই পাশের দৃষ্টিনন্দন ফুটপাতের অস্তিত্ব এখন ম্লান হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যে পায়ে হেঁটে চলাচলের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব ফুটপাতের বেশিরভাগ অংশ বেদখল হয়ে গেছে। অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্যের কারণে পুরো দখল হয়ে গেছে এসব দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত। শুধু ফুটপাত নয়, ফুটপাতের সঙ্গে কোনো কোনো সড়কের অর্ধেক অংশও দখল হয়ে গেছে। আবার দৃষ্টিনন্দন ফুটপাতের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবনও।

পুরো নগরীর প্রশস্ত সড়কের দুই ধারে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা করছে হকাররা। ফলে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে পথচারীরা। রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সড়কে রাখা অবৈধ নির্মাণসামগ্রী অপসারণ জড়িতদের জেল-জরিমানা করলেও ফুটপাত সড়ক দখলকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান হয় না তেমন। কখনো কখনো অভিযান হলেও কিছুক্ষণ পরেই প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আবারও অবৈধ দখলে চলে যায় ফুটপাত। এখন রাজশাহী নগরীজুড়ে সব ফুটপাতই প্রায় দখল হয়ে গেছে।

রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর, সিঅ্যান্ডবি, ভদ্রা, তালাইমারী, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, ঘোষপাড়া, রেলগেট, নিউমার্কেট, অলকার মোড়, রাণীবাজার, উপশহর নিউমার্কেট, রেলস্টেশন, পুরাতন ঢাকা বাস টার্মিনাল, সেরিকালচার কারখানার বাউন্ডারিসংলগ্ন ফুটপাত, মণিচত্বর, সাহেববাজার, গণকপাড়া, কুমারপাড়া, সোনাদীঘির মোড়, রাজশাহী কলেজের সামনের এলাকা, এমনকি খোদ নগর ভবনের সামনের ফুটপাত অবৈধ দখলে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। শুধু দখল নয়, রীতিমতো অস্থায়ী স্থাপনা গড়ে ব্যবসা চলছে। ছাড়াও ফুটপাত সড়ক দখল করে গাড়ি পার্কিং বাড়তি দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এসব দোকানপাট যানবাহন ফুটপাত দখল করে রাখছে। আর এসব ফুটপাত দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের লাখো মানুষ চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। জনস্বার্থে নানা কথাবার্তা বলা হলেও এসব দেখার যেন কেউ নেই।

সকাল ৮টা থেকেই নগরীর সাহেববাজার, গণকপাড়া, অলকার মোড়, নিউমার্কেট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর সন্ধ্যার পর সিঅ্যান্ডবি মোড়ের সার্কিট হাউসের সড়কে হাজারো মানুষের ভিড় দেখা যায়। মনে হয়, যেন গ্রামীণ হাট-বাজার। মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত উল্লেখিত এলাকায় শুধু অবৈধ দখলই নয়, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার রিক্সা পার্কিংয়ের কারণে মূল সড়ক সংকীর্ণ হয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনেও অবস্থা আরও বেহাল।

এদিকে রাজশাহীতে দৃষ্টিনন্দন কয়েকটি সড়কের ফুটপাতও দখল হয়ে গেছে। রাজশাহী নগরীর কাশিয়াডঙ্গা-বহরমপুর প্রজাপতি সড়কের ফুটপাতেও এখন সাধারণ মানুষ হাঁটতে পারেন না। নগরীর তেরখাদিয়া এলাকা ফুটপাতের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। অথচ এসব দেখার কেউ নাই। রাজশাহী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ কিংবা সিটি করপোরেশন এসব বিষয়ে কারও দৃষ্টি নেই।

পথচারীরা বলেন, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের জন্য রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে হাঁটা যায় না। সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতে গেলে ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হয়। সিটি করপোরেশন প্রশাসনের কাছে ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি জানান নাগরিকরা।

নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন চাইলে একদিনেই ফুটপাত খালি করে দিতে পারবে। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, নগরীর তেরখাদিয়া-সিটিহাট সড়কের পাশের ফুটপাতের ওপর এখন বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে। ওই ফুটপাতে হাঁটা কারও সাধ্য নেই। 

নগরীর ব্যস্ততম সাহেব বাজারের ফুটপাতের ফুল ব্যবসায়ীরা বলেন, দোকান ভাড়া নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় ফুটপাতে ব্যবসা করি। ছাড়া আমাদের ব্যবসা ফুটপাতকেন্দ্রিক। ফুটপাতের দোকান বলে মানুষজন দেখছে আর ফুল গাছ কিনতে আগ্রহী হচ্ছে। তারা বলেন, এতে পথচারীদের সমস্যা হচ্ছে। তবুও পেটের তাগিদে ব্যবসা করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ফুটপাত সংলগ্ন সড়ক দখলমুক্ত রাখতে সচেতনতার বিকল্প নেই। সবাই সচেতন হলেই ফুটপাত দখলমুক্ত হবে। সিটি করপোরেশন আরএমপিকেও বিষয়টি দেখতে হবে।

জানা যায়, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মোট সড়ক ২৮১ কিলোমিটার। এর মধ্যে পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রায় সব সড়কে দৃষ্টিনন্দন ফুটপাত রয়েছে। কিন্তু এখন তা দখল করে রেখেছেন হকাররা।

রাজশাহী নগরীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, পুরো রাজশাহী শহর এখন দৃষ্টিনন্দন। নগরীর ড্রেনও ঝকঝকে থাকে। পারিপাটি ফুটপাত তৈরি করা হয়েছে রঙিন টাইলস দিয়ে। তবে এসব ফুটপাতে সাধারণ মানুষ চলাচল করতে পারেন না। কারণ দখল। প্রতিটি সড়কের ফুটপাত এখন বেদখল হয়ে গেছে। পাড়া-মহল্লার সড়কের ফুটপাতেরও এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি অবিলম্বে রাজশাহী নগরীর দৃষ্টিনন্দন এসব ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি জানান।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা . এবিএম শরিফ উদ্দিন বলেন, এত সুন্দর ফুটপাত দখল- এটি খুব কষ্টের কারণ। এটি নিয়ে সিটি করপোরেশন কর্র্তৃপক্ষও বিব্রত। তিনি বলেন, কিছুদিন রাসিকের ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন না। এখন যোগদান করেছেন। তা ছাড়া নির্বাচিত মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান আগামী মাসে (অক্টোবর) দায়িত্ব নেবেন। তিনি এসে হয়তো ব্যবস্থা নেবেন। তবে তিনি বিষয়টি মেয়রকে অবগত করবেন বলে জানান। তিনি বলেন, নগর সৌন্দর্য বজায় রাখতে ফুটপাত দখলমুক্ত করতেই হবে। জন্য নগরবাসীর সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।

×