ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৯ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মাছ ধরার ফাঁদ

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম- বাংলার ঐতিহ্য ‘চাঁই’

মো. খলিলুর রহমান

প্রকাশিত: ২৩:৪২, ২৮ মে ২০২৩

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-  বাংলার ঐতিহ্য  ‘চাঁই’

নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মীনগর গ্রামে মাছ ধরার চাঁই তৈরি করছেন এক কারিগর

এক সময়ের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাছ ধরার ফাঁদচাঁই বাঁশ দিয়ে নিপুণ হাতে তৈরি করা চাঁই এদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর হাওড়-বাঁওড়ে বিশেষ কায়দায় মাছ ধরার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখন ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদচাঁইবিলুপ্ত হওয়ার পথে। দিন দিন চাঁইয়ের চাহিদা কমতে শুরু করায় চাঁই তৈরির কারিগরদের জীবনে নেমে এসেছে দুর্দিন-দুর্দশা। চাঁই তৈরির নিপুণ হাতের কারিগররা এখন পেশা পাল্টিয়ে অন্য পেশায় ঢুকে পড়ছেন। এখন চাঁই হাটে-বাজারে তেমন আর বিক্রি করতেও দেখা যায় না।

এখনো নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের লক্ষ্মীনগর গ্রামের মাত্র তিনটি পরিবার চাঁই তৈরির পেশায় ডুবে আছেন। তারা আতঙ্কে আছেন হয়তো বছরই হতে পারে চাঁই তৈরি বিক্রির শেষ বছর। সম্প্রতি ফতুল্লার বক্তাবলী ইউনিয়নের লক্ষ্মীনগর গ্রামে সরেজমিন গেলে কথা হয় চাঁই তৈরির কারিগর মনির হোসেন, শাহ পরান তাওলাত হোসেনের সঙ্গে। এখানকার চাঁই তৈরির কারিগররা প্রতিবেদককে জানান তাদের বর্তমান অতীতের সুখ-দুঃখের নানা কাহিনী।

বক্তাবলীর লক্ষ্মীনগর এলাকার চাঁই তৈরির কারিগর মো. মনির হোসেন। বয়স বায়ান্নোর কোঠায়। মনির হোসেন আফতাব উদ্দিনের ছেলে। চাঁই বানানো তার বাপ-দাদার পেশা। এটি প্রায় দুইশবছরের ঐতিহ্য। ছোট বয়স থেকেই বাবার হাত ধরে চাঁই বানানোর প্রশিক্ষণ নেন মনির হোসেন। এরপর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। কয়েক বছরের মধ্যেই বনে যান একজন দক্ষ চাঁই তৈরির নিখুঁত কারিগর হিসেবে। মনির হোসেন বলেন, এক সময়ে লক্ষ্মীনগর এলাকায় ৮০টি চাঁই তৈরির কারখানা ছিল। কালের বিবর্তনে দিন-দিন হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য মাছ ধরার চাঁই। এখন মাত্র গ্রামের ৩টি চাঁই তৈরির কারখানা এখনো টিকে আছে।

মনির হোসেন বলেন, দিন-দিন দেশীয় চাঁইয়ের চাহিদা কমে গেছে। মাত্র তিনটি কারখানার তৈরি করা চাঁই এখনো বিক্রি করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। এক সময়ে বছরে একটি কারখানায় পাঁচ হাজার চাঁই তৈরি করা হতো। এখন এক হাজার তৈরি করা চাঁই বিক্রি করতে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। গ্রামে এক হাজার পরিবার চাঁই তৈরির পেশায় জড়িত ছিলেন। এখন মাত্র তিনটি পরিবার চাঁই তৈরির পেশাটি কোনোমতে আঁকড়ে ধরে আছেন। মাছ ধরার চাঁইয়ের এক সময়ে বেশ ঐতিহ্য ছিল। এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, চায়না চাঁইয়ের কারণে দেশীয় নিপুণ হাতের তৈরি করা চাঁই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। চাঁই তৈরি করা একটি হস্তশিল্প। একটি চাঁই সাড়ে ৩শটাকায় বিক্রি করা হয়। একটি চাঁই তৈরি করতে প্রায় দশজনের হাতের ছোঁয়া লাগানো হতো। বাঁশ, মুলি নাইলনের সূতা দিয়ে তৈরি করা হয় পূর্ণাঙ্গ একটি চাঁই। সাধারণত বর্ষার দিনে চাঁইয়ের চাহিদা আরও বেড়ে যেত। এখন বর্ষাকালেও চাঁইয়ের চাহিদা নেই বললেই চলে। আনোয়ার হোসেনের আশঙ্কা বছরই হয়তো পুঁজি হারাতে হতে পারে। আগামী বছর পেশাটি টিকবে কি না তাও জানেন না আনোয়ার।

আনোয়ার হোসেনের তিন ছেলে এক মেয়ে। আগে আনোয়ার হোসেনের সন্তানরাও চাঁই তৈরির পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন চাঁই বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ায় তার সন্তানরা অন্য পেশায় চলে গেছে। আনোয়ার হোসেনের কারখানায় তাওলাদ হোসেন ইসমাইল হোসেন নামে আরও দুজন কারিগর চাঁই তৈরির পেশায় এখনো ডুবে আছেন। চাঁইয়ের চাহিদা ম্লান হয়ে যাওয়ায় আনোয়ার হোসেনের কারিগরদের ঠিকমতো বেতন-ভাতাও দিতে পারছেন না। তিনি বলেন, পাশের গ্রাম রামনগরেও চাঁই তৈরির কারখানা ছিল। ওই গ্রামে এখন আর চাঁই তৈরির কোনো কারখানা নেই। সরকারি অনুদান কিংবা সহায়তা থাকলে হয়তো পেশাটি এমনভাবে বিলুপ্ত হতে পারত না।

একই গ্রামের চাঁই তৈরির আরেক কারিগর আসাদুল্লাহ। তার বয়স বিশ-বাইশের কোঠায়। পাঁচ-ছয় বছর ধরে আসাদুল্লাহ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। আসাদুল্লাহ বলেন, বলতে গেলে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চাঁই এখন হারিয়েই গেছে। হয়তো আর দুই-এক বছর পেশাটি টিকে থাকতে পারে। এরপর পুরোপুরি বিলীন হবে এখানকার চাঁই তৈরি বিক্রির পেশা। আসাদুল্লাহ আরও বলেন, বরিশাল, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে গ্রাম থেকে তৈরি করা চাঁই কিনে নিয়ে যেতেন। শুনেছি গ্রামের হাজারো লোক পেশায় জড়িত ছিলেন। এখন হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার পেশায় এখনো টিকে আছেন। জানি না তারা আর কতদিন টিকে থাকতে পারবেন।

আরেক চাঁই তৈরির কারিগর তাওলাদ হোসেন। বয়স চল্লিশের কোঠায়। তার বাবা আনছার আলী। এক সময়ে তার নিজের চাঁই তৈরির কারখানা ছিল। তার চাঁই তৈরির কারখানাটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। তার কারখানায় ৫শ’-৬শচাঁই তৈরি হতো। এখন তিনি অন্য একটি চাঁই তৈরির কারখানায় চাঁই তৈরি করছেন। তিনি বলেন, হয়তো বছরই তার চাঁই তৈরির পেশার ইতি টানতে হতে পারে। পরে হয়তো তিনি ঢুকে পড়বেন অন্য পেশায়। এভাবেই এখানকার চাঁই তৈরির কারিগরদের চলছে দিনকাল।

চাঁই তৈরির কারিগররা বলেন, বর্ষার সময় খাল-বিল, নদী-নালা, পুকুর, হাওড়-বাঁওড়ে পানিতে ভরে যায়। তখন চাঁইয়ের ব্যবহার বেশি হয়। বাংলাদেশ খাল-বিল, নদী-নালার দেশ। তাই খাল-বিল নদী-নালার পানিতে নিপুণ হাতে বুনানো চাঁই নামের যন্ত্রটি রেখে দেওয়া হয়। চলাচলের সময় মাছ বাঁশের তৈরি এই ফাঁদের ভেতরে আটকা পড়ে। এটি গ্রামাঞ্চলের মাছ ধরার খুব জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এক সময়ে জেলার সব জায়গায় চাঁই দিয়েই মাছ ধরা হতো। চাঁই জমির আইলে বিশেষ কাদায় পুঁতে রাখা হলে চাঁইয়ের ফাঁদে মাছ আটকা পড়ত সবচেয়ে বেশি। এভাবেই চাঁইয়ের সাহায্যে এক সময়ে প্রচুর মাছ ধরা হতো। একই গ্রামের বাসিন্দা আলাউদ্দিন বলেন, এখনো লক্ষ্মীনগর গ্রামের কয়েকটি পরিবার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প চাঁই তৈরির পেশায় এখনো ডুবে আছেন। তারা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছেন যদি আবারও পেশাটি ঘুরে দাঁড়ায়!

×