ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৯ মে ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

হারানো শহরে একদিন

শিউলী আহমেদ

প্রকাশিত: ০১:০১, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩

হারানো শহরে একদিন

.

শীত ঋতুকে ঘিরে থাকে বিভিন্ন উৎসব-পার্বন। যেমন শীতের পিঠা, পৌষমেলা, পিকনিক, বেড়ানো- উৎসব আর উৎসব। একটা সময় মধ্যবিত্তের কাছে বেড়ানো ছিল বিলাসিতা। কিন্তু ইদানীং তা নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদায় রূপান্তরিত হয়েছে। সারা বছরের ব্যস্ততা, ক্লান্তি, মানসিক চাপ- সব মিলিয়ে মনকে চাঙ্গা করতে একটু বেড়ানো উচিত।

বছর ধরে একটু একটু সঞ্চয় করে ঢাকার কাছেই ঘুরে আসতে পারেন নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ে, ইশা খাঁ আর বার ভূঁইয়াদের স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গনে। যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে নিজেদের জন্য নিরিবিলিতে একটুখানি সময় কাটাতে পারবেন। শিশুরাও জানতে পারবে যুগের ইতিহাস। ছুটির দিনে সকাল ৮টার মধ্যে যদি বের হতে পারেন, এক ঢিলে ৩ পাখি মারতে পারবেন। হারানো শহর পানাম নগরী, সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর আর তাজমহল দর্শন। তাজমহল থেকে যাত্রা শুরু করতে পারেন। আমার মতে দূর থেকে যাত্রা করলে ধীরে ধীরে কাছে চলে আসা ভালো। তাতে ফেরার পথে দেরি হলেও টেনশন থাকে না।
বাংলার তাজমহল
চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসানুল্লাহ মনি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ২০০৮ সালে তৈরি করেছেন দিল্লীর তাজমহলের এই রেপ্লিকা ‘বাংলার তাজমহল’। যা পানাম নগরী থেকে ১৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই তাজমহল। প্রবেশ মূল্য ১৫০ টাকা। এক টিকিটেই দেখতে পারবেন তাজমহল, পিরামিড, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর। তবে তাজমহলে ঢুকে প্রথমে থমকে যাবেন- এত ছোট! পরে ভালো লাগবে। হঠাৎ ক্ষুদ্র কিছু বড় দেখলে যেমন অদ্ভুত লাগে, অনেকটা তাই।
হারানো শহর পানাম নগরীতে
ঢাকার এই যান্ত্রিকতা ছেড়ে কোলাহলমুক্ত একটি শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ এই পানাম নগরী। একটি সভ্যতা, একটি রাজধানী- যা কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে আজ থেকে ৪০০ বছর আগে। দাঁড়িয়ে আছে শুধু পূরাকীর্তিগুলো। ভাবতে ভাবতে আপনিও হারিয়ে যেতে পারেন হারানো একটা পুরনো শহরে! যা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ জনপদ ছিল! এখানেও এক সময় আলো জ্বলত, টুংটাং শব্দে চলত ঘোড়ার গাড়ি। এই যে ধ্বংসপ্রায় লাল রঙের অপূর্ব ডিজাইনের দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে, এক সময় সেখানেও প্রাণ ছিল। ঝকঝকে বাড়িগুলোতে কোনো কিশোরী নূপুর পায়ে ছুটে বেড়াত! একটি পুকুরঘাটে শান বাঁধানো ভগ্ন সিঁড়িও আছে! আহা, এখানে নিশ্চয়ই এই লাল ইটের তৈরি বাড়িগুলোর মেয়েরা বসে গল্প করত, আর খিলখিল করে হাসত! সবই এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এই স্থাপত্যগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসে দেখতে পায় এই হারানো নগরীকে। না হয় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। নগরীর ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া দীর্ঘ সড়কের দুই পাশে রয়েছে দৃষ্টি নন্দন ৫২টি লাল ইটের নির্মিত দালান। রোজই আসছে পর্যটক। বিদেশীদের আগ্রহ অনেক, বিশেষ করে যারা প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। মসলিনসহ তাঁত শিল্প নিয়ে তাঁত ব্যবসায়ীদের ব্যবসার মূল কেন্দ্রস্থল ও আবাসস্থল ছিল এই হারানো নগরী। পরিবেশটাই এমন, যেন বলছে- হারিয়ে যেতে নেই মানা। সকাল থেকে সন্ধ্যা যে কোন সময় জনপ্রতি ১৫ টাকা টিকিট কেটে দেখে আসুন এই প্রাগৈতিহাসিক নগরীকে।
সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর : এখানে প্রবেশমূল্য ৫০ টাকা। এই জায়গাটি তুলনামূলকভাবে মুখরিত। ঢুকেই দৃষ্টিনন্দন বড় সর্দারবাড়ি ভবন। অপূর্ব কারুকাজ খচিত এই দালান আপনার নজর কাড়বে। শুধু তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করবে। সামনেই রয়েছে ছোট্ট এক দীঘি, শান বাঁধানো ঘাটে অশ্বারোহী- কি মনোরম দৃশ্য। ১০০ টাকায় টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হবে এখানে। বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে দেখতে ছোট্ট, এই ২৭ হাজার ৪০০ বর্গফুটের দালানটির নিচতলায় ৪৭টি আর দোতলায় ৩৮টি কক্ষ রয়েছে। বাড়ির মধ্যখানে রয়েছে কালো রঙের বিশাল এক পালঙ্ক। এখান থেকে বের হয়ে সামনেই রয়েছে বাগান, শিল্পচার্য জয়নুল আবেদীনের শিল্পকর্ম। পাশেই রয়েছে আরেকটি দীঘি। বাঁধানো ঘাট। সোজা গিয়ে জয়নুল আবেদীন স্মৃতি জাদুঘর। এর ভেতরে রয়েছে পুরনো দিনের বিশালাকার সিন্দুক, গ্রাম-বাংলার জীবনধারা, নকশীকাঁথা, মসলিন-জামদানি শাড়িসহ অনেক কিছু। প্রতি বছরই এখানে মেলা হয়। এবার ১৮ জানুয়ারি উদ্বোধন হয়েছে এই মেলা। চলবে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
যেভাবে যাবেন বাংলার তাজমহল : কুমিল্লা, দাউদকান্দি, সোনারগাঁগামী বাসে চড়ে মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে এসে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিক্সায় ২৫ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া।
কীভাবে যাবেন সোনারগাঁ : গুলিস্তান, মতিঝিল ও যাত্রাবাড়ী থেকে বাসে মুগড়াপাড়া নেমে সেখান থেকে টেম্পোতে ২৫-৩০ টাকা ভাড়া  নেবে। অথবা ভৈরব, নরসিংদী বা কিশোরগঞ্জগামী বাসে চড়ে বরপা বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে চলে যেতে পারেন।

 

×