মঙ্গলবার ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

ব্রিটিশদের বিভাজনের নীতিতে সাম্প্রদায়িকতার সূচনা

ব্রিটিশদের বিভাজনের নীতিতে সাম্প্রদায়িকতার সূচনা
  • নাজনীন বেগম

আবহমান বাংলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য লীলাভুমি। বিভেদ, বিভাজনকে দূরে ঠেলে যুগ যুগ ধরে বহু ধর্মের মিলনগ্রন্থিতে বাংলার সবুজ শ্যামল প্রান্তর নৈসর্গিক সম্ভারের মতোই চিরস্থায়ী। বহিরাগত আর্যরা এদেশে আধিপত্য বিস্তার করলেও ধর্মীয় বিভেদ সেভাবে জনজীবনকে অস্থির করে তুলতে পারেনি। বিভিন্ন রাজবংশের অভ্যন্তরীণ লড়াই, ক্ষমতার দ্ব›দ্ব, আভিজাত্যের গৌরব ছাড়াও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের গভীরেই প্রচ্ছন্ন থাকত রাষ্ট্রীয় সংঘাত-সংঘর্ষ। ধর্মের সঙ্গে ন্যূনতম যোগাযোগ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অভিঘাত আর সহিংসতার পরিবর্তে মিলনগ্রন্থিই ছিল এক অবধারিত গতিধারা। বস্তুবাদী সমাজ নির্দেশক কার্ল মার্কসের একটি উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে-‘সুদূর পুরাকাল থেকে উনিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার চেহারা অপরিবর্তিত ছিল।’ বিপ্লব, সংঘর্ষ, দ্ব›দ্ব, অভিযাত্রা তার উপরিভাগের নিচে নামেনি। অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের বহু ভাঙ্গা-গড়ার সে অবস্থা থেকে মূল সমাজ কাঠামোয় কোন আঁচ লাগেনি। ব্রিটিশরাই প্রথম এই সমাজবিন্যাসের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। তার আগ অবধি কঠোর ভারতীয় বর্ণাশ্রম প্রথায় নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই দুর্ভেদ্য ব্যবধান তৎকালীন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য পালাক্রম। প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশও চিরায়ত প্রথায় অন্যরকম বিভাজন চিত্র উঠে আসেনি। ভারতে মুসলমান শাসন ধারাবাহিকতায় চলতে থাকলেও ধর্মীয় বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি।

১৭৫৭ সালে ক্লাইভের হাতে বাংলার পতন শুধু যে ভৌগোলিক সীমানায় বহিরাগতদের ভিত্তি মজবুত হওয়া নয়, বরং ধর্মীয় বিভেদের সংঘাত বিভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ পাক-ভারত উপমহাদেশের এক সংস্কৃতিগত উন্মত্ততারও বীভৎস চিত্র। পশ্চিমা সমাজ বিজ্ঞানীরাও অভিমত ব্যক্ত করেন পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা বাংলা দখল করতে না পারলে ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব হতো কিনা সন্দেহ। কারণ শিল্প উদ্ভাবনের যে পুঁজির সঞ্চয়ন প্রয়োজন ছিল সেটা আসে মূলত সম্পদশালী বাংলার অর্থ দিয়ে। তা না হলে জেমস ওয়ার্ট কর্তৃক স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কারের আগেও নতুন অনেক উদ্ভাবনের সলিল সমাধি হয়েছে শুধু গচ্ছিত মূলধনের অভাবে। তাছাড়া শিল্প বিপ্লবের পরপরই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ পুরো বাংলাকে কাঁপিয়ে দেয়। অনুমান করা হয়েছিল সে অকাল দুর্ভিক্ষে অবিভক্ত বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীর জীবন শুধু বিপন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেটা ছিল ইংরেজী ১৭৬৯ সাল। এরপর আসে ১৭৯৩ সালের লর্ড কর্ণওয়ালিস প্রবর্তিত নতুন জমিদারি প্রথার নবকৌশল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এঙ্গেলসের ধারণা, ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল ভ‚মিতে ব্যক্তি মালিকানার অনুপস্থিতি। এ নিয়ে পণ্ডিত মহলে মতবিরোধ থাকলেও ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার যুগপরম্পরায় দেখা যায় আসলে মূল শাসক ছাড়া জমিতে কারও কোন অধিকার নেই। বংশপরম্পরায় খাজনা দেয়ার সুবাদে ভোগ-দখলের স্বাধীনতাটুকু থাকে মাত্র, অন্য কিছু নয়। লর্ড কর্ণওয়ালিস যে নতুন জমিদারি প্রথা উদ্ভাবন করলেন সেখানে অত্যন্ত ক‚টকৌশলে সাম্প্রদায়িক বীজ বপনও ছিল এক সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। সঙ্গত কারণে মুসলমান অধ্যুষিত সিংহভাগ জমিদারি অর্পণ করা হয় হিন্দু ভ‚-স্বামীদের হাতে। আর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে প্রভুত্ব অর্জন করে উঠতি মুসলমান বণিক সম্প্রদায়। বণিক পুঁজির সম্প্রসারণকালে অত্যন্ত সুচতুরভাবে তাকে কৃষি অর্থনীতির ফাঁদে ফেলা হয়। ফলে জগৎশেঠ এবং দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো কিছু বিত্তশালী মানুষের হাতে পুঁজি সঞ্চিত হলে তা কোনভাবেই শিল্প বিকাশের কাজে লাগাতে দেয়া হয়নি। সঙ্গতকারণে দ্বৈত উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাঠামো সংহত হওয়ার পরিবর্তে যেমন নড়বড়ে হয় পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান সঙ্কটও হরেক রকম টানাপোড়েনে দোদুল্যমান অবস্থায় ঠেকে। বিশেষ করে জমিদার যে প্রজা শোষণ করে তা দাঁড়ায় হিন্দু দ্বারা মুসলমান এবং মুসলমান দ্বারা হিন্দু নির্যাতন। ফলে শ্রেণী সংগ্রামের বিকশিত ধারাকে মোড় ঘোরানো হয় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে। সেই ঐতিহাসিক দাবানলের চরম খেসারত দিতে হচ্ছে অসহায় অতি সাধারণ মানুষকে।

তার আগে এদেশে রাজনীতির গোড়াপত্তন করাও ছিল ব্রিটিশ রাজন্যবর্গের এক অপকৌশল। এছাড়া ইংরেজী শিক্ষা প্রবর্তনে লর্ড মেকলে ১৮৩৫ সালে নতুন শিক্ষানীতিতে ঘোষণা দিলেন, ‘আমরা এমন এক শিক্ষিত সম্প্রদায় গড়ে তুলব যারা রক্তে-মাংসে ভারতীয় হলেও চিন্তা-চেতনায় ইংরেজ হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না।’ আসলে লাগেওনি। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত প্রথম স্নাতকই শুধু নন, সাহিত্য সম্রাট হিসেবে যিনি সমধিক সমাদৃত তার একটি উক্তি উল্লেখ করা যেতে পারে। এই উপমহাদেশের আধুনিক বঙ্গ সাহিত্যের পুরোধার মর্যাদা পাওয়া বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বাধীনতার মর্মব্যাখ্যা করতে গিয়ে অভিমত দেন, ‘স্বাধীনতা বাংলা শব্দ নয়, ইংরেজী লিবার্টির বাংলা রূপান্তর। এর অর্থ এই নয় যে, রাজাকে স্বদেশীয় হতে হবে।’ পরবর্তীতে সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগের অভ্যুদয় তারই বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় স্বদেশী আন্দোলনের সাংঘর্ষিক চিত্র।

ধর্মীয় উন্মত্ততায় আহত রবীন্দ্রনাথ মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেয়ার পক্ষে জোরালো সমর্থন জানান। ১৯৩৬ সালে ৭৫ বছর বয়সে কালান্তর প্রবন্ধ সঙ্কলনের ‘হিন্দু-মুসলমান’ নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘যে দেশে শুধু ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাঁধন তাকে বাঁধতে পারে না সে দেশ হতভাগ্য। মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সহজ মিলন সেটাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। ধর্ম যেখানে সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে রাষ্ট্রিক স্বার্থ কি তাকে বাঁচাতে পারে?’ আসলে পারে না। দ্বিজাতিতত্তে¡র ভিত্তিতে ৪৭ সালের দেশ ভাগ সিংহভাগ মানুষের জীবনে মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনি। শেকড়ের গভীরে সেই যে বিষ ঢালা হয়েছে তা সম্প্রসারিত হয়ে আজ অবধি পরিত্রাণের কোন সুনির্দিষ্ট পরিক্রমা দৃশ্যমান হয়নি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবন শুরু ও এগিয়ে যাওয়ার পালাক্রমে বিংশ শতাব্দীর হরেক রকম ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে থাকলেও সাম্প্রদায়িক সংহতিকে ধারণ করেই বড় হয়েছেন। কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামায় নিজেকে সুস্থির রাখতে পারতেন না। প্রাথমিকভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে গিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেয়া ছাড়াও সুভাস বসুর ভক্ত বনে যাওয়াও নিয়মিত জীবনের অনন্য অধ্যায়। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কোনভাবেই মানতে পারেননি তিনি। বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়ায় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় নিজেকে বারবার শাণিত করেছেন। তিনি সর্ববাঙালীর মঙ্গল আর কল্যাণ কামনায় ধর্মীয় ভেদবুদ্ধিকে আমলে না নেয়ার চেতনায় উদ্ভাসিত হতেন। যে চারটি মৌলিক নীতিকে সাংবিধানিকভাবে সম্পৃক্ত করতে দ্বিধাহীন ছিলেন সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রত্যয়টিও আপন শৌর্যে মহীয়ান।

বঙ্গবন্ধুর বাংলায় কারা এমন সহিংস উন্মত্ততায় পরিস্থিতিকে বেসামাল পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে সেটাও খতিয়ে দেখা পরিস্থিতির ন্যায্য দাবি। তথ্যপ্রযুক্তির সমৃদ্ধ বলয়ে অপরাধ ও হোতাকে শনাক্ত করা খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। এমনতর অবাঞ্ছিত সংঘর্ষ কোনভাবেই সংহতিকে নিরাপদ নির্বিঘেœ থাকতে দেয় না। ধর্মীয় হানাহানি, উগ্রতা আর অসহনীয় উত্তাল পরিস্থিতি তৈরি করাও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানও এক প্রকার দায়বদ্ধতা। এমন সব ঘটনা আসলে হঠাৎ করে মাথাচাড়া দিচ্ছে না। কোথায় যেন ভেতরের প্রচ্ছন্ন বোধে তার শিকড় গভীরে ও অন্ধকারে জিইয়ে আছে। দেশটা সব মানুষের। কোন ধর্ম বা গোষ্ঠীর নয়। আড়ালে বিরাজ করা অপশক্তি ওঁৎ পেতে থাকে কখন কোন্্ চক্রান্তে সমস্যার বীজ বপন করা যায়। সময়-সুযোগ বুঝে উত্তপ্ত দাবানল ছড়ানোও পরিস্থিতিকে লাগামহীন করে দেয়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বঙ্গবন্ধু যে মহান লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য নিয়ে ছয় দফা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে পরবর্তীতে তা আরও জোরদার আন্দোলনে স্বাধীনতার যুদ্ধ ত্বরান্বিত করেন সেখানে তো অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অপার সম্ভাবনা নির্দেশ করাই ছিল। সে জায়গায় বারবার যারা আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করছেন তাদের খুঁজে বের করাও সময়ের অপরিহার্য দাবি। আর দেরি করা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আর প্রধানমন্ত্রীর আধুনিক ও প্রযুক্তির সমৃদ্ধ দেশ তৈরি করতে গেলে এই বিষবাষ্প থেকে জাতিকে মুক্ত করতেই হবে। সকল মানুষের মিলনযজ্ঞে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় জোর কদমে এগিয়ে যাবে।

লেখক : সাংবাদিক

শীর্ষ সংবাদ:
শীর্ষে যাবে রফতানিতে ॥ গার্মেন্টস শিল্পে ঈর্ষণীয় সাফল্য         ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক আস্থা ও শ্রদ্ধায় বিস্তৃত         ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ১১ মাসের মাথায় সুচির কারাদণ্ড         বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা         অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সচিব পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়া!         বিজয়ের মাস         জাওয়াদ দুর্বল হয়ে লঘুচাপে রূপ নিয়েছে         ৪৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ         অরাজকতা সৃষ্টির নীলনক্সা জামায়াতের         আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের সূচনা ৬ ডিসেম্বর         বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী ছিন্ন করা যাবে না         বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, ২৭৫ কোটি ৩২ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি         বিএনপি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে         সমিতি সংগঠন খুলে ফায়দা লুটে নিচ্ছে বিশেষ শ্রেণী         তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর         দেশে টিকা উৎপাদনে দুই-চার দিনের মধ্যেই চুক্তি : স্বাস্থ্যমন্ত্রী         সমাপনী পরীক্ষা না থাকলেও বৃত্তি ও সনদের ব্যবস্থা থাকবে : শিক্ষামন্ত্রী         চরফ্যাশনে ট্রলার ডুবি ॥ ২১ মাঝি-মাল্লা নিখোঁজ         পেট্রোবাংলার নতুন চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান         আড়াইহাজারে আগুনে দুই শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ