সোমবার ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১৮ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

জাতির পিতার স্বপ্নের সার্থক অনুবাদক

  • হারিসুল হক

কী ব্যাপার এত ভিড় কেন? মিরপুর ডিওএইচ থেকে যে রাস্তাটি আগার গাঁ অভিমুখে ছুটে চলেছে তার পল্লবী প্রান্তের দুই ধারে এক অবাক করা ভিড়। রাস্তার দুই ধারের বহুতল অট্টালিকার জানালা, বারান্দা, ছাদে অগণিত উন্মুখ মুখ। খবর নিয়ে জানলাম আজ ২৯ আগস্ট ২০২১ বাংলাদেশের যোগাযোগ খাতে এক ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে। ঢাকার বুকে মেট্রো রেলের পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হবে আজ দুপুর ১২টার দিকে। মেট্রোর এ যাত্রা শুরু হবে দিয়াবাড়ি কেন্দ্রীয় ডিপো থেকে পল্লবী অব্দি। এ মহাক্ষণ চাক্ষুস করার জন্যই নগরবাসীর এত ব্যাকুলতা। আমিও আমার নিজের ভেতর এক ধরনের চাঞ্চল্য অনুভব করলাম। বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার ভেতরকার ময়ূর তার পেখম মেলে ধরে নাচতে লেগেছে। এবং তাই আমিও আর দশজনার মতো এপার্টমেন্টের ছাদের দিকে ছুট লাগালাম।

প্রমত্তা পদ¥া। এর উপর দিয়ে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু- সে সেতু কেবল মোটরযান পারাপার করেই ক্ষান্ত থাকবে না একই সঙ্গে রেলগাড়িও এপার- ওপার করবে। এমনটি তো কোনদিন অবচেতনেও ভাবতে পারিনি। মনে পড়ে ছেলেবেলার স্কুল জীবনের কথা। তখন এদেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পণ্ডিত মশায়ের গৎবাঁধা প্রশ্ন- নোয়াখালী কিসের জন্য বিখ্যাত? এদেশের চেরাপুঞ্জি কাকে বলা হয়? কোন কোন জেলায় রেল নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। আহা আজ যদি পণ্ডিত মশায় জীবিত থাকতেন! তিনি দেখতে পেতেন পদ্মার ওপাড়েও রেল চলছে। স্বপ্ন সত্যি হওয়া বুঝি একেই বলে। নাকি কল্পনারও অতীত যা সেটাই যখন বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করল তখন তাকে কী শব্দে অভিষিক্ত করি? কী বাক্যে প্রকাশ করলে আত্মা প্রশান্ত হবে। আমার জানা নেই।

জীবনের দেড়টি যুগ আমি চট্টগ্রামে কাটিয়েছি। দেখেছি বর্ষাকালে সবুজ পাহাড়ের পা ছুঁয়ে কর্ণফুলীর অদম্য ছুটে চলা। কর্ণফুলীর প্রশ্নস্ত বক্ষজুড়ে তৃতীয়া চাঁদের মতো বঙ্কিম গলুই নিয়ে তরতর এগিয়ে চলা দুরন্ত সাম্পান সংবেদনশীল যে কাউকে উতল করতে সক্ষম। সে নদীর নিচ দিয়ে টানেল হচ্ছে। এক নগরী দুই শহর কনসেপ্ট বাস্তবায়িত হচ্ছে। এও এক অবিস্মরণীয় মূর্ত উন্নয়ন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- যার আত্মাজুড়ে প্রবহমান ছিল কেবল বাঙালীর মুক্তিচিন্তা। জীবনের ৪৬৮২টি দিন তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন কেবল বাঙালীর জন্য বাংলার জন্য কথা বলতে গিয়ে। তাঁর লেখা ’অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ’ কারাগারের রোজনামচা’-এর পাতাজুড়ে সে সকল স্বপ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানীদের এ দেশীয় দোসররা ভেবেছিল বাংলাদেশকে নিয়ে জাতির পিতার সব স্বপ্নসাধ চ‚র্ণ হয়ে গেল। তারা বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠল, স্বাধীনতার শত্রæদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংসদে বসল, রাজাকারের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের নিশান উড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দিল।

সঙ্গত কারণেই পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলোর লক্ষ্য বিবর্জিত ও দিকদর্শনবিহীন রাষ্ট্র পরিচালনার কারণে বাংলাদেশ বিশে^ একটি মর্যাদাহীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে পড়েছিল। বাইরের দুনিয়ায় বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছিল ঝড়, জলোচ্ছ¡াস এবং ভিখিরির দেশ হিসেবে। জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেল। সেই সময় দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচনে যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচী যেমন- আশ্রয়ণ প্রকল্প, ঘরে ফেরা কর্মসূচী ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাাপন করেছেন। এছাড়া কর্মহীন মানুষের জন্য কর্মসংস্থান করা, নতুন নতুন শিল্প ও কল-কারখানা চালু, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা, নিরক্ষরতা দূর করা সহ নানা কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেছেন।

এছাড়া সেই সময় আর্থ-সামাজিক খাতে দেশ বেশ অভ‚তপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করে। যেমন-ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী ‘গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি’, পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘শান্তি চুক্তি’, যমুনা নদীর উপর ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’ নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে নির্বাচনী মেনিফেস্টো ‘দিনবদলের সনদ’ উপস্থাপন করে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ২০০৯-১৩ মেয়াদে সরকারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে-বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩,২৬০ মেগাওয়াটে উন্নীতকরণ, গড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন, ০৫ কোটি মানুষকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণ, মিয়ানমারের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড ও ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, বিনা জামানতে বর্গাচাষীদের ঋণ প্রদন, চিকিৎসা সেবার জন্য সারাদেশে প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, দারিদ্র্যের হার ২০০১ সালের ৪৮.৯ শতাংশ থেকে ২০১৩ সালে ১৪.৮ শতাংশে হ্রাস, ২০১১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক শেখ হাসিনার শান্তির মডেল গ্রহণ ইত্যাদি।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় অর্জনের পর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এ মেয়াদকালে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নতকরণ, ভারতের পার্লামেন্ট কর্তৃক স্থল সীমানা চুক্তির অনুমোদন, ভারতের সঙ্গে সামুদ্রিক জলসীমার বিরোধের নিষ্পত্তি, ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয় ১,৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, ৩৯ বিলিয়ন ডলারের ওপর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্জন, পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছেন। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার সফল বাস্তবায়ন ও নিবিড় পরিবীক্ষণের ফলে বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই এমডিজির অধিকাংশ লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ঋঅঙ কর্তৃক উরঢ়ষড়সধ অধিৎফ, এমডিজি-৪ অর্জনের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক ‘টঘ গউএ অধিৎফং ২০১০’ এবং এমডিজি-৫ এর সাফল্যের জন্য

‘ঝড়ঁঃয-ঝড়ঁঃয অধিৎফ’ প্রদান করা হয়েছেবাংলাদেশ ২০৩১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, যা ২০২৫ সালে শেষ হবে- যা বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪ লাখ ৯৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ বিশ^ অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বর্তমানে ৪১তম অবস্থানে আছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বর্তমান অর্থনীতির ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ হবে বিশে^র ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ‘ঞযব ডড়ৎষফ রহ ২০৩০: ঙঁৎ খড়হম-ঃবৎস চৎড়লবপঃরড়হং ভড়ৎ ৭৫ ঈড়ঁহঃৎরবং’ শিরোনামের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আগামী ১২ বছরের মধ্যে ১৬ ধাপ অগ্রসর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ক্রয় ক্ষমতার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৪৪ নম্বরে।

এ সব কিছুই সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার দূরদর্শিতার জন্য। পিতার স্বপ্নকে তিনি নিরন্তর অনুবাদ করে যাচ্ছেন আর সেসব অনূদিত কর্মযজ্ঞ বিশ^সভায় বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়। আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। দীর্ঘজীবী হোন তিনি। তিনি আমাদের মাঝে আরও অনেকদিন কর্মচাঞ্চল্য নিয়ে বেঁচে থাকুক। এতেই বাঙালী এবং বাংলাদেশের কল্যাণ। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু জয়তু শেখ হাসিনা বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

শীর্ষ সংবাদ: