ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান

স্মরণ ॥ তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

প্রকাশিত: ২১:০৬, ২৮ আগস্ট ২০২০

স্মরণ ॥ তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম

শোকের মাস আগস্ট প্রায় শেষ হতে চলেছে। শোকাবহ এই মাসটি অন্যরকম এক বিষণœতায় মূর্ত থাকে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট আমরা হারাই আমাদের জাতির পিতাকে। সেদিন নিষ্ঠুর ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও শিশুপুত্র রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রায় সবাইকে হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধুর দুই আদরের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় অলৌকিকভাবে আল্লাহর অশেষ রহমতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। এই শোকাবহ মাসেই যুক্ত রয়েছে আমাদের পারিবারিক আরও একটি কান্না ও কষ্ট। ২০১২ সালের শোকাবহ এই আগস্ট মাসের ২৮ তারিখে আমার পিতা সাবেক গণপরিষদ সদস্য ডাঃ আখ্লাকুল হোসাইন আহমেদ ইন্তেকাল করেন। আমার আব্বা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন একান্ত অনুসারী, তাঁর সহকর্মী। আজ কিছুু কথার গুচ্ছে প্রয়াত প্রিয় বাবাকে স্মরণ করছি। আজ আমার বাবার ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী। বাবাকে নিয়ে আমার কত স্মৃৃতি! তার নীতি বৈশিষ্ট্য কখনও বিস্মৃত হইনি! এসবই আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা, নৈতিক ও বিনয়ী স্বভাবের একজন মানুষ। কর্তব্য কাজে কখনও অবহেলা করতেন না। দেখেছি রাজনৈতিক বিশ্বাসে বাবা ছিলেন সদা অটল ও আপোসহীন। যা বিশ্বাস করতেন সেটিই তাকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে নিয়েছে নির্মোহভাবে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের নির্মম খবরটি যেদিন সকালে রেডিওতে প্রচারিত হয় সেদিন নেত্রকোনা জেলার গ্রামীণ শহর মোহনগঞ্জ থানা সদরে তার (ডা. আখ্লাকুল হোসাইন আহমেদের) নেতৃত্বে স্থানীয় নেতা কর্মীদের নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল ও পরে গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করা হয়। এটি বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার বাবার অকপট আনুগত্য, শ্রদ্ধা, দৃঢ় চেতনা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল থাকার মানসিকতার দৃশ্যমান প্রতিফলন। আমি নিশ্চিত প্রতিকূল অবস্থায় এ ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ করার কি পরিণতি হতে পারে সেটি সেদিন আমার বাবা ও তার সহকর্মীরা আদৌ ভাবেননি। এরূপ কর্মসূচী পালন করার কারণেই ১৯৭৬ সালের গোড়ার দিকে আমার বাবাকে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে নিয়ে আটক করা হয়। বাসায় থাকা এবং মোহনগঞ্জ না ছাড়ার শর্তে ডাক্তার আখ্লাকুল হোসাইন আহমেদকে সেদিন সন্ধ্যায় সেনা ক্যাম্প থেকে ছেড়ে বাসায় গৃহবন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ, বারহাট্টা, কলমাকান্দা ও সুনামগঞ্জের প্রতিরোধ যোদ্ধারা এ বিষয়টি জানেন। বাবার সেদিনের ঐ সাহসী কর্মসূচী তাকে কেবল মানবিক করেনি, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ে তিনি কতটা আঘাত পেয়েছিলেন সেটিও উঠে আসে। বাবা ছিলেন নিজের কর্তব্যবোধে সচেতন। একইসঙ্গে তিনি তার সন্তানদেরকেও নিজ নিজ কর্তব্য কাজে সদা নিবিষ্ট হতে প্রেরণা দিতেন। দেশ ও জনকল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে নিবেদিত হতে উৎসাহিত করতেন। তিনি ছিলেন এলাকার সকল শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক। দীর্ঘদিন এলাকার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। স্কুল বা কলেজের শিক্ষকদের প্রায়ই উপদেশ দিতেন সবার প্রতি সুআচরণ করতে। তিনি বলতেন কোন শিক্ষার্থীর মনোজগত যেন শিক্ষকের কোন অনাকাক্সিক্ষত আচরণ দ্বারা প্রভাবিত না হয়। একজন শিক্ষার্থীর প্রতি কেবল সুআচরণই সুফল বয়ে আনতে পারে। আমি দেখেছি, বাবা নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। তার ডায়েরির সংখ্যা অনেক। তিনি ডায়েরিতে নিজের ভাবনার কথা লিখতেন। আবার দৈনিক পত্রিকাগুলোতে আকর্ষণীয় বা শিক্ষণীয় কোন খবর বা তথ্য থাকলে সেটিও গেঁথে রাখতেন তার রোজনামচায়। দেখেছি তার দলের নেত্রী বা নেতাদের অনেক বক্তব্যও তার ডায়েরিতে স্থান পেয়েছে। ক’দিন আগে আব্বার এসব ডায়েরিতে চোখ বুলাচ্ছিলাম। ১৯৯১ সালের এমনই একটি ডায়েরির পাতা উল্টে দেখতে পাই তিনি লিখেছেন - ‘মানুষের সন্তান কিন্তু মানুষ হয়ে জন্মায় না, সে মানুষ হওযার সম্ভাবনা বা বীজ নিয়ে জন্মায় মাত্র, কিন্তু শিক্ষাই মানুষের সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তোলে। সন্তানকে মানুষ করে গড়ে তুলতে না পারলে অন্য সব কিছুই প্রকৃত পক্ষে অর্থহীন।’ তিনি আরও লিখেছেন- ‘শিক্ষকদের বলা হয় শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় পিতা। জন্মদাতা পিতা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখায়। আর শিক্ষক দেখায় জ্ঞানের আলো। যে পিতা তার সন্তানকে রেখে আহার করে, সে পিতা নামের অযোগ্য, সেই রকম যে শিক্ষক তার ছাত্রদের জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত রেখে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করে সে শিক্ষকও শিক্ষকতা পেশার উপযুক্ত নয়।’ আব্বার ডায়েরিতে খুঁজে পাওয়া এ লেখাগুলো তার নিজের ভাবনা প্রসূত কিনা জানি না। লেখাটির নিচে সূত্র উল্লেখ নেই। তাই হতে পারে এটি তার নিজের ভাবনা প্রসূত কিছু শব্দগুচ্ছ। আবার অন্য কোন উৎস থেকেও তিনি এ লেখাটি নিজ ডায়েরিতে উদ্ধৃত করে থাকতে পারেন। তবে নিজের ডায়েরিতে এ লেখাটিকে বন্দী করে বাবা তার এক মুক্ত ও সঠিক চিন্তা ও মানসিকতায় নিজেকে উদ্ভাসিত করেছেন। আমি দেখেছি, পরীক্ষায় আমাদের ভাল ফলাফলে বাবা আনন্দিত হতেন। ঠিক একইভাবে এলাকার অন্য ছাত্রের ভাল ফলাফলেও তিনি আনন্দ পেতেন। তার দৃষ্টিতে সকল ছাত্রছাত্রীই ছিল তার সন্তান তুল্য। স্থানীয়ভাবে কোন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করলে তিনি সবসময়ই তাকে উৎসাহ দিতেন। কখনও প্রাইজবন্ড, কখনও কলম বা কখনও বই উপহার দিয়ে। এভাবে এমন স্বীকৃতি পাওয়া ছাত্রের সংখ্যা বেড়ে গেলেও বাবা এই রীতিটা বহাল রেখেছিলেন। কর্তব্য কাজে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা ছিলেন ১১ নং সেক্টরের সাব-সেক্টর মহেশখলা ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্জ। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ জেলার বহু মুক্তিযোদ্ধা এই ক্যাম্পের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আমার বাবার কর্তব্যনিষ্ঠা ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে তার সাহস ও অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্প আজও শোনা যায়। আব্বা ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট বেলা প্রায় দশটা ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ মিনিট ইন্তেকাল করেন। আমি তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক। সকাল দশটায় লক্ষ্য করি আব্বার শরীরটা বেশ খারাপ, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, বুকে বেশ কফ জমেছে। এই অবস্থায় তাকে আমি কিছু ঔষধ দিই। খুব গুরুত্বপুর্ণ একটি মামলার বিচারকার্য চলছিল তখন আমাদের ট্রাইব্যুনালে। ছোট ভাই সোহেলকে বলি একটি এ্যাম্বুলেন্স ডেকে আব্বাকে যেন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যায় সাকশান দেয়ার জন্য। আব্বার নিকট জানতে চাইলাম আমি কোর্টে যাব কিনা। অস্পষ্ট কণ্ঠে বাবা জানতে চেয়েছিলেন সেদিন ট্রাইব্যুনালে কোন মামলার শুনানি ছিল কিনা? আমি হ্যাঁসূচক জবাব দিলে তিনি আমাকে কোর্টে যেতে বলেছিলেন। আমি কোর্টে যাই। এজলাসে বসার পাঁচ সাত মিনিটের মধ্যেই খবর আসে আব্বার অবস্থা খুব খারাপ। আমি যেন সরাসরি হলি ফ্যামিটি হাসপাতালে যাই। বিষণ্ণ মনে কোর্ট থেকে নেমে পড়ি। হাসপাতালে যাই। কিন্তু আব্বাকে আর জীবিত অবস্থায় পাইনি। ততক্ষণে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেছেন। (ইন্নাহ লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শোকাচ্ছন্ন হই সবাই। আমার স্ত্রী, ছোট ভাই সাজ্জাদসহ সবাই চলে আসে। মরদেহের গোসল শেষে আসরের পর কাকরাইলের সার্কিট হাউস মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন স্পীকার বর্তমানে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আব্দুল হামিদের ঐকান্তিক ইচ্ছায় বাদ আসর ও মাগরিবের পূর্বে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আব্বার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ আগস্ট তার মরদেহ তার জন্মস্থান মোহনগঞ্জে নেয়া হয়। পথিমধ্যে নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তৃতীয় জানাজা এবং মোহনগঞ্জ পাইলট হাইস্কুলে চতুর্থ জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে মোহনগঞ্জ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?’ কবির এই চরণ দুটি প্রত্যেক মানুষের জীবনের এক কঠিন সত্য। মানুষ চলে যায়, থেকে যায় তার কর্ম। বাবার কর্তব্য পরায়ণতা আমাদের প্রত্যেক ভাই বোনের জীবনের পাথেয়। মৃত্যুর আধা ঘণ্টা পূর্বেও তিনি আমাকে আমার কর্তব্য কাজ করার জন্য উৎসাহিত করে গেছেন। আজ বাবার ৮ম মৃত্যুবার্ষিকীতে বলছি - আব্বা, আপনি আমাদের সামনে যে আদর্শ জীবনের প্রতিচ্ছবি রেখে গেছেন আমরা সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইনি। আপনার শিক্ষা ও আদর্শ আমাদের জীবনকে করেছে সুবাসিত, অর্থবহ। আমি কেবল একজন বাবাকে হারাইনি। একজন বন্ধুকে হারিয়েছি। প্রিয় বাবা, আপনি এদিনে চলে গেছেন। আমাদের বিশ্বাস আল্লাহ আপনাকে ভাল রেখেছেন। আপনি সেখানে রয়েছেন সদাহাস্য। আপনার স্মৃতি ও আদর্শ আমরা ভাইবোনেরা ও আপনার পৌত্রগণ তাদের হৃদয়ে ধারণ করে আছে। আপনার প্রিয় কবি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলি- ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।’ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন। লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২