ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯

ওয়াসার এমডি উল্টো সাফাই গাইলেন

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়েও দূর হলো না ঢাকার জলাবদ্ধতা

প্রকাশিত: ২৩:০৯, ২৬ জুলাই ২০২০

হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়েও দূর হলো না ঢাকার জলাবদ্ধতা

ফিরোজ মান্না ॥ ঢাকা মহানগরীতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরীর প্রতিটি এলাকায় হাঁটু থেকে বুক পানি জমে যায়। পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো অকার্যকর বলে পানি নেমে যেতেও দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। গত ১০ বছর ধরে একই অবস্থা চলে আসছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে পারেনি ওয়াসা। ওয়াসার এমন পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার এমডি লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। পরে তাকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি বলেন, দশ বছরে ঢাকা ওয়াসা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি সেবা পাচ্ছেন। ড্রেনেজ ব্যবস্থা আগের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থায় রয়েছে। ঢাকা ওয়াসা বিশ্বের রোল মডেল হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। লিখিত প্রশ্নের জবাবে ওয়াসার এমডি বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক প্রকৌশলী জনকণ্ঠকে বলেন, গত এক দশকে শুধুমাত্র গভীর নলকূপ সিন্ডিকেটই নলকূপ বসানো বাণিজ্যের মাধ্যমে কমপক্ষে ৫শ’ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে। নলকূপ এখন প্রায় হাজারের কাছাকাছি। এ বছরও নতুন ৭৩২ কোটি টাকার এক প্রকল্পে আরও প্রায় এক শ’ নলকূপ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা। অথচ আগামী বছরের মধ্যে ৭০ ভাগ সারফেস ওয়াটারে যাবার গালগল্প শোনানো হচ্ছে নগরবাসীকে। গত ১০ বছরে ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে ওয়াসা। এই প্রকল্পের কোন সুফল নগরবাসী পায়নি। যারা দুর্নীতি করছে তাদেরই পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। অন্যদিকে দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন খোলা ড্রেনগুলোর একই অবস্থা। ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করায় সেগুলো জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে। নগরীর ২৬টি খাল দখল-দূষণে ভরে গেছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম ও ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ফজলে নূর তাপস পুরান ঢাকার একটি খাল পরিদর্শন করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখান। ওয়াসার গাফিলতির কারণে খালের এমন পরিস্থিতি। ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ওয়াসার ড্রেনগুলো আমরা প্রতিবছরই পরিষ্কার করে থাকি। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের খোলা ড্রেনগুলো পরিষ্কার না করার কারণে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। মন্ত্রী, মেয়ররা কি জানেন, খালের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার দায়িত্ব কার? এই দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। মন্ত্রী, মেয়ররা বড় বড় কথা বলে যাচ্ছেন। তারা কি আসল খবর রাখেন। আমরা প্রতিবছর ওয়াসার ড্রেন মেশিন দিয়ে পরিষ্কার করি। ওয়াসার ড্রেনের কারণে কোন জলাবদ্ধতা হয় না। এই প্রকৌশলী দীর্ঘ ১০ বছর ধরে একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে ড্রেনেজ বিভাগে যোগ দেন। এরপর ১০ বছর তিনি একই জায়গায় ঘুরে ফিরে চাকরি করে আসছেন। এখন তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি দীর্ঘ সময় একই জায়গায় আছেন এমন প্রশ্ন করলে আতিকুর রহমান বলেন, মাঝখানে ওয়াসার অন্য দু’টি প্রকল্পে চাকরি করেছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে তিনি এখানে ২০১৪ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। প্রায় ৬ বছর ধরেই তিনি ড্রেনেজ বিভাগে কাজ করছেন। তিনি অব দ্য রেকর্ড যে কথা বলেছেন তা উল্লেখ করা হলো না। তবে তিনি বলেছেন, এমডি সাহেবের কঠোর নির্দেশ, মিডিয়ার সঙ্গে কেউ যেন কথা না বলে। মিডিয়ার সঙ্গে যা বলার তিনিই বলবেন। ওয়াসা সূত্র জানায়, প্রতিবছর নগরবাসী জলাবদ্ধতায় নাকাল হচ্ছেন। দেড় বছর আগে বর্তমান মন্ত্রীর আগের মন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আগামী বছর থেকে ঢাকায় আর কোন জলাবদ্ধতা থাকবে না। এ সরকারের তিন মেয়াদে এ পর্যন্ত তিন জন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু গত প্রায় এক যুগ ধরে ঢাকা ওয়াসার’ ড্রেনেজ বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের বদলি হয়নি। ড্রেনেজ বিভাগে প্রতিবছর খালের উন্নয়ন বা পরিষ্কারের নামে কোটি কোটি টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয়। এটা ওপেন সিক্রেট। গত ১০ বছরে প্রকল্পের মাধ্যমে এবং রুটিন কাজের নামে কয়ে শ’ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং আরও অবনতি হয়েছে। গত ১০ বছর আগে এখনকার চেয়ে কম এলাকায় জলাবদ্ধতা হতো। ঢাকা ওয়াসায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক প্রকৌশলীদের দুর্দিনে জামায়াত-বিএনপি সমর্থক প্রকৌশলীদের দখলে ওয়াসার সব গুরুত্বপূর্ণ পদ। বিএনপি সমর্থক মাহমুদ গন্ধর্বপুর প্রকল্পের পিডি, আব্দুল লতিফ ইউটিলিটি শিফটিং প্রকল্পের পিডি, শওকত মাহমুদ ড্রেনেজ প্রকল্পের পিডি, ওয়াসার সব ট্রিটমেন্ট প্লান্টের দায়িত্বে ওয়াহিদ মুরাদ এবং ওয়াসার সব কেনাকাটার দায়িত্বে জামায়াত সমর্থক মোস্তাফিজুর রহমান। এদের সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি। অথচ গত এগারো বছরে ওয়াসায় কর্মরত জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত কর্মকর্তা কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে একজনকেও ওএসডি কিংবা সাসপেন্ড করা হয়নি। এমনকি সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পরেও এডিবির অর্থায়নে নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের তৎকালীন ডিপিডি বুয়েটের সাবেক ছাত্রদল নেতা প্রকৌশলী সালাম ব্যাপারীকে সাসপেন্ড না করে মড্স সার্কেল-১ এ বদলি করা হয়। ওয়াসায় মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক প্রকৌশলীদের চাকরিচ্যুত এবং ওএসডি করে রাখা হয়েছে। অথচ ছাত্রজীবনে যারা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তাদের সকলকেই এমডির রোষানলে পড়ে নির্যাতিত, ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। কেউ চাকরিচ্যুত, কেউ সাসপেন্ড কেউ ওএসডি। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে রুহুল আমিনকে ও রবিউল কায়জারকে। কোন দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও দুইবার সাসপেন্ড করা হয়েছে বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মোজাম্মেল হককে, বর্তমানে তিনি ওএসডি। বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল বাসারকে ওএসডি করা হয়েছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অসীম কুমার ঘোষকে তিন বছর ধরে সাসপেন্ড করে রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এমন ১০ থেকে ১২ জন প্রকৌশলীকে বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয় জানতে ওয়াসার এমডির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে। এই প্রতিবেদক এমডিকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি উপ-প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মোস্তফা তারেক স্বাক্ষরিত জবাবে বলেন, ‘জনাব ফিরোজ মান্না, সাংবাদিক, দৈনিক জনকণ্ঠ, ঢাকা ওয়াসা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নিকট কিছু প্রশ্ন রেখেছেন যার উত্তর দফাওয়ারি নিচে দেয়া হলো। ফিরোজ মান্না : পদ্মা-যশলদিয়া প্রকল্পের মাধ্যমে পুরান ঢাকায় পানি সরবরাহ হচ্ছে? ঢাকা ওয়াসা : জ্বী, হচ্ছে। চীন সরকারের অর্থায়নে পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগারটি জনস্বার্থে নির্মিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১০ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে পানি শোধনাগারটির শুভ উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দিন থেকেই পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কে এর পানি আসছে যার সিংহভাগ সুবিধাভোগী পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। ফিরোজ মান্না : অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পটি উদ্বোধনের দিন থেকেই পানি সরবরাহ ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের বদলে ৫ থেকে ১০ কোটি লিটার সরবরাহ হচ্ছে? এটা কেন? ঢাকা ওয়াসা : পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণকাজ শেষ হলেও ঢাকা শহরে এই পানি সরবরাহের জন্য বিতরণ নেটওয়ার্কে পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা না থাকায় শোধনাগারটি হতে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রণীত নেটওয়ার্ক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পানি শোধনাগারের পুরো সুফল পাওয়া যাবে। বর্তমানে প্রকল্পের পানি শোধনাগারে পরিশোধিত দৈনিক প্রায় ১৮ থেকে ২০ কোটি লিটার পানি ঢাকা শহরের নেটওয়ার্কে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফিরোজ মান্না : আপনি সরকারের ভিশন ২০২০ কে সামনে রেখে পরিবেশবান্ধব পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ২০২০ সালের মধ্যে সারফেস আর আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রেশিও হবে ৭০ ভাগ আর ৩০। অথচ এখনও আপনার আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে প্রায় ৮০ ভাগ পানি সরবরাহ করছেন। তাহলে এত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পানি সরবরাহ প্রকল্প কার স্বার্থে? তাহলে আপনার এই ১০ বছর মেয়াদে সফলতা কি তবে শুধু ১১ বার পানির দাম বাড়ানো? ঢাকা ওয়াসা : ‘ভিশন ২০২১’ কে সামনে রেখে (ভিশন ২০২০ বলে কিছু নেই) ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা ‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’ নামে যুগান্তকারী একটি কর্মসূচী গ্রহণ করে। ঢাকা ওয়াসার ভিশনই হ’ল পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও গণমুখী পানি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা এবং এ লক্ষ্যে ঢাকা ওয়াসা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। এর সুফল ইতোমধ্যে ঢাকাবাসী ভোগ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতার ফলে ঢাকা ওয়াসা বর্তমানে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও গণমুখী পানি ব্যবস্থাপনার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। সে লক্ষ্যে ঢাকা ওয়াসা ইতোমধ্যে একটি ডধঃবৎ গধংঃবৎ চষধহ প্রণয়ন করেছে। মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশ মতে ঢাকা ওয়াসা ইতোমধ্যেই ভূ-উপরিস্থ পানির শোধনাগার নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এর আলোকে তিনটি বৃহৎ (গবমধ) পানি শোধনাগার প্রকল্প নির্মাণ কাজ হাতে নেয়া হয়। পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বর্তমানে বিদ্যমান প্লান্টগুলি হতে চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পানি উৎপাদিত হচ্ছে। নির্মিতব্য বাকি ২টি প্রকল্পসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজগুলো শেষ হলে অচিরেই এটা ৭০ শতাংশে এসে দাঁড়াবে। ভূ- উপরিস্থ’ পানির উৎস থেকে পানি সরবরাহের জন্য গৃহীত অন্য প্রকল্পগুলি হচ্ছে, গর্ন্ধবপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প, এ প্রকল্পে মেঘনা নদীর উৎস হতে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি ঢাকা শহরে সরবরাহ করা হবে। এডিবি, ইআইবি ও এএফডি এর আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২৫ শতাংশ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এটি ২০২৩ সাল নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার জন্য নির্ধারিত আছে। মোট প্রকল্প ব্যয় ৫৪০০ কোটি টাকা। সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প (ফেজ-৩) : মেঘনা নদীর উৎস হতে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি ঢাকা শহরে সরবরাহ করা হবে। ড্যানিডা, ইআইবি, কেএফডব্লিউ ও এএফডি এর আর্থিক সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। শীঘ্রই মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে এবং তা ২০২৪ সাল নাগাদ সম্পন্ন হবে। মোট প্রকল্প ব্যয় ৪৬০০ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের সময়ে ঢাকা ওয়াসার কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন নিচে তুলে ধরা হলো, ঢাকা শহরের পানি সরবরাহে উগঅ (উরংঃৎরপঃ গবঃবৎবফ অৎবধ) স্থাপন করে স্মার্ট পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঢাকা ওয়াসা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ঢাকা ওয়াসা সিস্টেম লস (ঘজড) ৪০ শতাংশ (২০১০) হতে ২০ শতাংশ (২০১৯)-এ নামিয়ে এনে এবং উগঅ এলাকায় সিস্টেম লস ৫ শতাংশে কমিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে দৈনিক ২৩৫-২৪৫ কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে দৈনিক ২৫৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ঢাকা ওয়াসা চাহিদার তুলনায় বর্তমানে বেশি উৎপাদন করতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। ঢাকা ওয়াসা স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠী (খড়ি ওহপড়সব ঈড়সসঁহরঃু) কে বৈধ পানি দেয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ -৮০ শতাংশ পানি সংযোগ দেয়ার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বস্তি এলাকায় ২০২০ সালের মধ্যে পানি সুবিধা ১০০ শতাংশে উন্নীত করণে নিরলসভাবে কাজ করে ঝঁংঃধরহধনষব উবাবষড়ঢ়সবহঃ এড়ধষ (ঝউএ) অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে ই-সেবায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসাবে ই-বিলিং, ই-জিপি, ই-পানি ও পয়ঃসংযোগ, ই-নথি এবং ই-রিক্রুটমেন্ট করে ডিজিটাল ঢাকা ওয়াসায় রূপান্তরিত হয়েছে। পানির পাম্পে ঝঈঅউঅ (ঝুংঃবস ঈড়হঃৎড়ষ অহফ উধঃধ অপয়ঁরংরঃরড়হ) স্থাপন করে ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ দ্বারা গভীর নলকূপের অপারেশন, কন্ট্রোল ও মনিটরিং এর কার্যক্রম পরিচালনা করে ঢাকা ওয়াসার পরিচালন ব্যয় কমিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার অপারেটিং রেশিও ০.৬৬ (আয় ব্যয়ের অনুপাত)। পূর্বে যা ছিল ০.৯৬। উল্লেখ্য, এটির বিশ্বমান ০.৬৫। গ্রাহকবান্ধব ওয়াসা লিংক ১৬১৬২ স্থাপন করে জনসাধারন হতে সার্বক্ষণিক/২৪ ঘণ্টা অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনসেবা গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ণ প্রকল্পে বৈদেশিক বিনিয়োগ ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট বড় প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নে ঢাকা ওয়াসা সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে ঢাকা ওয়াসা ইধহশধনরষরঃু অর্জন করেছে যা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় অর্জন বলে গণ্য করা যায়। ঢাকা ওয়াসার পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ একটি মুখ্য ব্যয়। ইতোমধ্যে বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য অনেকবার বেড়েছে। ১০ বছর মেয়াদে ১১ বার পানির দাম বাড়ানো বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে সময়ের সঙ্গে যায় না। ১০ বছর আগে যে দামে পানি পরিশোধনের মালামাল (ক্লোরিন, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি) পাওয়া যেত এখন কি সেই দর আছে? ১০ বছর আগে ক্যাপিটাল মেশিনারিজের যে মূল্য ছিল, বর্তমান সময়ে ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি শুল্ক, কাস্টম ডিউটি, ভ্যাট এসব কি এক? মুদ্রাস্ফীতির নিরিখে প্রকৃতপক্ষে ঢাকা ওয়াসা পানির দাম বাড়ায়নি। বরং মুদ্রাস্ফীতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ’ওয়াসা এ্যাক্ট ১৯৯৬’ অনুযায়ী প্রতিবছর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হারে পানির মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে মাত্র। সরকারকে উঝখ (উবনঃ ঝবৎারপব খরধনরষরঃু) দিতে ঢাকা ওয়াসাকে এটি করতে হয়েছে। তবে তা অবশ্যই ঢাকাবাসীর বৃহত্তর কল্যাণে। আগামীতে ঢাকা ওয়াসা প্রণীত সুয়্যারেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। মাস্টার প্ল্যানে ২০৩০ সাল নাগাদ বাস্তবায়নের কথা থাকলেও ২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকা ওয়াসা এটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সচেষ্ট আছে। এর ফলে নগরবাসীর ১০০ শতাংশ পয়ঃ সেবা দেয়া সম্ভব হবে। ফিরোজ মান্না : একই কথা তেঁতুলঝোড়া-ভাকুর্তা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও। এই প্রকল্প থেকে দিনে ১৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ আসার কথা। কিন্তু এই প্রকল্পের মাধ্যমে দিনে ৫ কোটি লিটার পানি আসছে। এর কি কোন সত্যতা আছে? ঢাকা ওয়াসা : না। এটি সত্যি না। কোরিয়া সরকারের ইডিসিএফ এর অর্থায়নে এবং আইডব্লিউএম এর ফিজিবিলিটি রিপোর্টের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত সাভারের তেঁতুলঝোড়া-ভাকুর্তা প্রকল্পটি একটি সমীক্ষাভিত্তিক প্রকল্প। মোট ৪৬টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে তুরাগ নদের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসার মূল পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কে এটি যুক্ত হয়েছে। বৃহত্তর মিরপুরবাসী ইতোমধ্যেই এর সুফল ভোগ করছে। কিন্তু সবগুলি পাম্প নির্মাণ সম্পন্ন হলেও স্থানীয় ভূমির মালিকদের সঙ্গে আইনগত জটিলতা থাকায় পূর্ণ ক্ষমতায় পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তথাপিও দৈনিক ৮-১০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কে এই প্রকল্পের মাধ্যমে আসছে। ভূমির মালিকদের সঙ্গে আইনগত জটিলতা ও স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সমস্যা মিটে গেলে ১৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ফিরোজ মান্না : আপনি ছাত্র জীবনে ছাত্রলীগের নেতা কর্মী প্রকৌশলীদের ওএসডি করে বিএনপি জামায়াতের প্রকৌশলীদের ভাল অবস্থানে বসিয়েছেন? এ বিষয়টি আসলে কি? ঢাকা ওয়াসা : না। এটি সর্বৈব অসত্য। আপনি বরং বলতে পারেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা দুর্নীতির বিষয়ে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে চলে। আপনি জানেন, বর্তমান সরকারের মূলনীতিই হচ্ছে দুর্নীতিবাজ যে দল বা মতেরই হোক- তার বা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সুতরাং যখনই কোন ধরা পড়েছে, ঢাকা ওয়াসা ব্যবস্থাপনা তা কঠোর হাতে দমন করেছে। তাই, বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণে ঢাকা ওয়াসা ব্যবস্থাপনা কখনও পিছপা হয়নি। বরং, দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কোন দল বা মতকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি। এখানে বিএনপি জামায়াতের প্রকৌশলীদের ভাল অবস্থানে দেয়ার কোন বিষয়ই নেই। ফিরোজ মান্না : ইদানীং ঢাকা ওয়াসা নিয়ে নানা অনিয়ম দুর্নীতির কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় এই অনিয়ম দুর্নীতি হচ্ছে। কিন্তু আপনি তো কোন অনিয়ম দুর্নীতি সহ্য করেন না। এরপর এসব হচ্ছে কেন? আপনি কি এ বিষয়ে কিছু জানেন কিনা? ঢাকা ওয়াসা : আগেই জানিয়েছি, বর্তমান ব্যবস্থাপনা দুর্নীতির বিষয়ে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি নিয়ে চলে। আর তার মূল ভিত্তি ‘ওয়াসা এ্যাক্ট ১৯৯৬’। ঢাকা ওয়াসা সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে বিধায় পর্যাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগ আনার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাছাড়া, পানি, পয়ঃ ও ড্রেনেজ সেক্টরগুলি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ায় গত রমজানে, কোভিড-১৯ মহামারী সংক্রমণকালে ও গ্রীষ্মকালীন সময়ে অধিক পানির চাহিদার ক্ষেত্রে সরবরাহে কোনরূপ সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। মাননীয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী করোনাভাইরাসের মহামারীকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ করায় এবং উন্নত (উরংরহভবপঃ ণড়ঁৎ তড়হব) নামে একটি কর্মসূচী চালু করায় ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১০ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে ৩টি পানি শোধনাগারের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে এসে ঢাকা ওয়াসাকে দক্ষিণ এশিয়ায় পানি সরবরাহ সংস্থাগুলির মধ্যে ‘রোল মডেল’ হিসেবে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় অনিয়ম/দুর্নীতি- আপনার এই বক্তব্য সঠিক নয়। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, ঢাকা ওয়াসার ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় কোন অনিয়ম দুর্নীতি হচ্ছে না। ‘অনিয়ম দুর্নীতি’র কথা একটি অসাধু কুচক্রী মহলের গুজব। এর কোন ভিত্তি নেই। তাছাড়া এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময়ে বিস্তারিত তদন্ত করেছে এবং কোন দুর্নীতির প্রমাণ পায়নি। তবে এ বিষয়ে আপনার কোন সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ থেকে থাকলে ঢাকা ওয়াসা অবশ্যই প্রচলিত বিধিবিধানের আলোকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। প্রশ্ন রাখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’