ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

রফিকুজ্জামান রনি

বর্ণিল পথে ক্লান্তিহীন পথিক

প্রকাশিত: ১২:৪২, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯

বর্ণিল পথে ক্লান্তিহীন পথিক

আল মাহমুদ কবিতাপাগল মানুষ ছিলেন এতে কোন সন্দেহ নেই। সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ‘কবি’ শব্দেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। নিজেও চেয়েছেন এই শব্দটা চিরকাল তাঁর নামের সঙ্গী হোক। তাই কবিতার মাঠ চষে বেড়িয়েছেন জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত। কবিতার যূপকাষ্ঠ-বেদিতে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করলেও এই একটি মাত্র জায়গায় তিনি আটকা পড়ে থাকেননি চিরকাল, চষে বেড়িয়েছেন অনেক অনেক মাঠ; ফলিয়েছেন ফসলের পর ফসল। গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-উপন্যাসÑ কোথায় পড়েনি তাঁর দক্ষ হাতের নিড়ানি? একবাক্যে বলা যায়, বহুবর্ণিল পথে হাঁটা এক ক্লান্তিহীন মুসাফির ছিলেন আল মাহমুদ। কবিতায় আল মাহমুদ সেরাদের দলেরই একজন, এটা তাঁর নিন্দুকেরাও স্বীকার করেন। কিন্তু আমরা যখন গল্প-গদ্যকার আল মাহমুদের দিকে তাকাই কিংবা ঔপন্যাসিক আল মাহমুদের দিকে নজর দিই তখন ধন্দে পড়ে যাই তাঁর বহুল চর্চিত এবং কর্ষিত মাঠের কোন ফসলটি সেরা, আর কোন ফসলের বাম্পার ফলন ফলিয়েছেন তিনি কলম-নিবের তীব্র তরল কালিতে। তাঁর প্রবন্ধ যেমন ভাষাবৈচিত্র্য, চিন্তার বহুরৈখিকতা এবং প্রকরণ-মাধুর্যতা চোখ আটকে দেয় তেমনিভাবে গল্প-উপন্যাসেও পাওয়া যায় ব্যক্তিত্বের নির্মলতা, কাল-ছাপানো নির্যাস, মুক্তি সংগ্রামের তীব্র বাসনা এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের করুণ সত্য আখ্যান। ফলে গল্প-কবিতা কিংবা উপন্যাস-প্রবন্ধÑ কোন ডেরায় তিনি শ্রেষ্ঠতম আসনটি গেড়েছেন সেটা নির্ণয় করা শক্ত। প্রায় প্রত্যেকটি ভূমিতেই তিনি বুনেছেন ক্লাসিক্যাল বীজ ও কুড়িয়েছেন সতেজ-পুরুষ্ট ফসল। সুতরাং কোনটা থেকে কোনটাকে ক্ষুদ্রখাটো কিংবা দীর্ঘবৃহৎ করে আলাদা পরিম-লে আবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। আশ্চর্য সত্য এই যে, তাঁর গদ্যে গাণিতিক ফর্মুলা তথা জ্যামিতিক অঙ্কনচিত্রের মতো বহুকৌণিক পথপরিক্রমার দিকটাই স্পষ্ট হয়, তার পরও সেখানে নেই পরিমিতিহীন কাব্যভাষার আরোপিত উচ্ছ্বাস, নেই শব্দ ও বাক্যের গতিবিহীন বেঢপ-কোরাস। কবিতায় যেমন অন্যতম সেরা, গল্পেও সেরাদেরই দলে আছেন আল মাহমুদ। অন্তর্দৃষ্টি, সমাজ সচেতনতা, দ্রোহ-চাতুরতা, বৈষম্যচিত্র এবং প্রান্তিক সময়ের চালচিত্র তাঁর গল্পকে দিয়েছে আলাদা শক্তি। ব্যতিক্রমী সুর তুলেছেন পূর্ববর্তী কিংবা সমকালীন লেখকদের সৃষ্টিসম্ভার থেকেও। কালো নৌকা, পানকৌড়ির রক্ত, জলবেশ্যাÑ এ রকম অনেক গল্প আছে যা আল মাহমুদকে খুব সহজেই নিয়ে গেছে সেরা গল্পকারদের কাতারে। কালো নৌকায় স্বামীহারা এক অসহায় গৃৃহবধূর আর্তস্বর, স্ত্রীহারা শ্বশুরের দীর্ঘশ্বাস এবং পারিপার্শ্বিকতা যে ট্র্যাজিক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, মানবজাতি এই অনিবার্য পরিণাম এড়াতে পারে না : আড়াই হাজার বছর আগে যেমনিভাবে এড়াতে পারেনি সফোক্লিসের ইডিপাস। ফলে অশ্লীলিতার অপবাদ থেকে বেরিয়ে, সম্পর্কের বৈধতা-অবৈধতার মাত্রা ছাপিয়ে গল্পটি হয়ে উঠেছে অজ¯্র আড়ালে-আবডালে গুমরে কাঁদা মানুষেরই জীবনাখ্যান। ‘জলবেশ্যা’র দিকে তাকালেও মানুষের অসহায়ত্ব, বাজার-দালালি এবং সুযোগসন্ধানীদের আগ্রাসন চিত্র পিকাসোর অঙ্কনকলার মতোই স্পষ্ট হয়ে ভেসে ওঠে চোখের কণিনীকায়। গল্পে, নৌকা-চাপা জলচর সম্প্রদায় তথা বেদেনী এবং লোকালয় বাসিন্দা সাধারণ পুরুষের এক অন্ধরাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বেদেরূপী শয্যাজীবী এক নিষ্ঠুর ছলনাময়ী নারীর অর্থ-আদায়ের ভয়ঙ্কর এক কৌশলচিত্র তুলে ধরেছেন, সেখানে আকর্ষণীয় দেহসৌষ্ঠব, অঙ্গমৈথুন ও ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল বাচনক্রিয়া প্রদর্শন করে পুরুষকে দুর্বল করা এবং নির্বিষ সাপের বক্স খুলে সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার চাতুরিপণার কথা অত্যন্ত নান্দনিকভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। এ গল্পে আল মাহমুদ নিজেকে একজন সূক্ষ্ম সমাজচিন্তকের পরিচয়ে তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরকেও ভিন্নভাষায়, ভিন্ন উপকথায় এবং ভিন্ন স্বাদের চরিত্রনির্মাণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন, গল্পের করস্পর্শে তিনি ভেঙে দিয়েছেন হাজারযুগের প্রচলিত মিথ-প্রবচন। ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে নারীর সতীত্ব-রং এবং পাখির উষ্ণ রক্তÑ এ দুটির তুলনামূলক আলোচনা করে পাঠককে দারুণভাবে চমকে দিয়েছেন আল মাহমুদ। গল্পের পরম্পরায় সাদা-ধবল বক এবং কৃষ্ণকালো পানকৌড়িকে একই বন্দুকের নলে, প্রায় একই আলোছায়া থেকে শিকার করার পর মাছখেকো পাখি দুটোকেই পাশাপাশি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন শ্যালিকার কল্যাণে। তখন নিস্পন্দ, প্রাণহীন দুটো পাখিদেহের দিকে তাকিয়ে দুইগোত্রের এবং দুই বর্ণের দুটো খেচরপ্রাণিকে পাশাপাশি পড়ে থাকার দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে মৃত্যুর পর জাগতিক কোন ধর্মবর্ণের বিভেদবিভাজন না থাকার বিষয়টি শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন। একই মাটিতেই পড়ে থাকা দুই রঙের দুটো লাশ! মৃত্যু যে কোন রকম পার্থক্য ছাড়াই এক করে দিতে পারে সবকিছুকে সেটাই তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন গল্পের অভূতপূর্ব বয়ানে। পুরো গল্পেই ঘোরের পর ঘোর সৃষ্টি করে সামনে এগিয়ে যান এবং আচানক এক মুহূর্তের কাছে গিয়ে ফুলস্টাপ টানেন! আমরাও চকিত-বিস্ময়ে নির্বিকার হয়ে যাই। গল্প-কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ সব ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র এবং দাপুটে ভূমিকা পালন করেছেন আল মাহমুদ। আমাদের ছড়া-সাহিত্যেও তাঁর নাম উজ্জ্বল, স্বর্ণময়। শুধু সোনালি কাবিন, লোক লোকান্তর, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো কিংবা বখতিয়ার ঘোড়া দিয়েই আল মাহমুদকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে সেটা খ-িত মূল্যায়ন বৈ আর কিছু হবে না। আল মাহমুদ নামটি উঠে আসলে তাঁর কথাসাহিত্য এবং গদ্যকেও টেনে আনতে হবে, হবেই হবে!