ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৪ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা

প্রকাশিত: ০৮:৫৮, ২৮ মার্চ ২০১৯

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা

মুক্তিযোদ্ধারা দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কেননা তাদের জন্যই আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির এক অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কথাটি বুঝি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দাপটে প্রকৃত ও ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধারা আজ কোণঠাসা। নিজেদের পরিচয় দিতে তারা কুন্ঠা বোধ করেন। এই দুরবস্থার জন্য কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা দায়ী নন কোনভাবেই। বরং যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তখনই সে মর্জিমাফিক তৈরি করেছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা। আর এই সুযোগে তালিকায় সন্নিবেশিত হয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম। ফলে জটিল আবর্ত তথা গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা। এটা খুবই দুঃখজনক যে স্বাধীনতার ৪৮ বছর অতিবাহিত হতে চললেও আজ পর্যন্ত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল ও নির্ভেজাল একটি তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হলো না। তদুপরি রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবশালীদের দাপটে অমুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে একেবারে নির্ভুল তালিকা তৈরির উদ্যোগও ভেস্তে যেতে বসেছে। সর্বশেষ যে তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তাতে আদালতে রিটের কারণে অমুক্তিযোদ্ধাদের তো বাদ দেয়া যাচ্ছেই না, বরং নতুন প্রায় ২৭ হাজার জনের নাম প্রস্তাব করা হযেছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য। নতুন সংখ্যাটি অস্বাভাবিক ও অসঙ্গত প্রতীয়মান হওয়ায় সেটি যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় কমিটি। অথচ নির্ভুল ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রদর্শিত হওয়ার কথা ছিল এবারের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে অন্তত ছয়বার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রতিবারই তালিকায় ঢুকেছে অমুক্তিযোদ্ধা তথা ভুয়াদের নাম। ফলে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা নিয়ে বরাবরই সন্দেহ ও প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। দেশে এখন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৮ জন। প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ জন। তাহলে বাকিরা কেন পান না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক ও সঙ্গত। আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানী ভাতা, সন্তান-নাতি-নাতনির জন্য চাকরির কোটা, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কারণে মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ এবং তালিকাভুক্তির জন্য এত বিপুল লোভ ও আগ্রহ। তদুপরি আছে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের দাপট। ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেখিয়ে সিনিয়র সচিব পদ বাগিয়ে নেয়ার ঘটনাও আছে। কিছুদিন আগেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেখানোয় অর্ধশতাধিক সরকারী কর্মকর্তাকে শাস্তি প্রদানের খবর আছে। প্রকৃতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দেড় লাখের বেশি হওয়ার কথা নয়। এত গেল ঘটনার একদিক। অন্যদিকে বার বার যাচাই-বাছাই, তথাকথিত অর্থে সঠিক তালিকা প্রণয়ন সর্বোপরি গোটা প্রক্রিয়াটিই সমালোচনা তথা প্রশ্নের মুখে পড়ায় যথার্থই যারা মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সম্মান ও মর্যাদা হানি হচ্ছে স্বভাবতই। এটা তো সত্য যে, যে বা যারা জীবন বাজি রেখে একাত্তরের রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তারা আদৌ কোন প্রাপ্তির আশায় যানটি। বরং সশস্ত্র যুদ্ধে সম্মুখসমরে যোগ দিয়েছিলেন দেশমাতৃকার টানে, স্বদেশকে স্বাধীন করবেন বলে। তাদের মধ্যে অনেকেই জীবন সায়াহ্নে এসে কায়ক্লেশে জীবনযাপন করছেন। কেউ রিক্সা চালাচ্ছেন, কেউ হয়েছেন বস্তিবাসী, আবার কেউ নৌকার মাঝি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। অথচ তারাই মাঠ পর্যায়ের যথার্থ মুক্তিযোদ্ধা, যাদের নাম তথাকথিত তালিকায় থাকার কোন প্রয়োজন পড়ে না। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে মাঠ পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ৪৭০টি কমিটি গঠিত হয়। এর মধ্যে ৩৮৬টি কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। ৮৪টি কমিটি কাজ করতে পারেনি সদস্যদের দ্বন্দ্ব ও আদালতে মামলা থাকায়। উপরন্তু ২৬ হাজার ৯৪২টি নতুন নাম সুপারিশ করে পাঠিয়েছে তালিকাভুক্তির জন্য। যাতে ৮-১০ বছরের বালকের নামও ঠাঁই পেয়েছে। উৎকোচ গ্রহণ করে নাম অন্তর্ভুক্তির কথাও উঠেছে। অতঃপর অবস্থা হয়েছে যে, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার উপক্রম। আবার আগের তালিকা থেকে অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম বাদ দেয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে আদালতের রুল জারি থাকায়। এ অবস্থায় প্রকৃত ও নির্ভুল মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যে কারণে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায় সুচিন্তিত ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়ে পড়েছে অপরিহার্য। তবে শেষ বিচারে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়াই বাঞ্ছনীয়।