ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

রফতানি আয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কি?

প্রকাশিত: ০৭:১৬, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

রফতানি আয়ের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে কি?

আগেরবারের লক্ষ্য থেকে সামান্য বাড়িয়ে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য পণ্য ও সেবা খাত মিলিয়ে ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার নতুন রফতানি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। প্রতি ডলার ৮০ কোটি করে হিসাব করলে বাংলাদেশী মুদ্রায় রফতানি লক্ষ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রফতানি লক্ষ্য ছিল ৪ হাজার ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের রফতানি আয় ও চলিত অর্থবছরের রফতানি লক্ষ্য নির্ধারণ-বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ তথ্য তুলে ধরেছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পণ্যে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং সেবায় ৫ দশমিক ৫৭ অর্থাৎ গড়ে ১ দশমিক ৯৯ শতাংশ রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর গতবারের প্রকৃত রফতানির তুলনায় চলতি অর্থবছরে পণ্যে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ এবং সেবায় ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ অর্থাৎ গড়ে ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে পণ্য রফতানি (কম্পিউটার সেবাসহ) থেকে আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। আর সেবা রফতানি (কম্পিউটার সেবা বাদে) থেকে এবার রফতানি আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি ডলার-যা আগেরবার ছিল ৩১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে পণ্য রফতানি করে ৩ হাজার ৪৮৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং সেবা রফতানি করে ৩১৭ কোটি ২৮ লাখ ডলার (অনুমিত) আয় হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি ইংল্যান্ডে পাউন্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে ইউরোর অবমূল্যায়ন না হলে রফতানি আয় আরও বেশি হতো।’ ৮ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে নিট ওভেনসহ তৈরি পোশাক খাতের রফতানি লক্ষ্য করা হয়েছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ডলার। গত অর্থবছর তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ৮১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিট পণ্য থেকে ১ হাজার ৩৭৫ কোটি ডলার ও ওভেন থেকে ১ হাজার ৪৩৯ কোটি ডলার আয় হয়েছে। রফতানি আয়ের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ ১০ খাতের মধ্যে পোশাকের পরের খাতগুলো হচ্ছে হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্রকৌশল পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য এবং সিরামিক পণ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৭ দশমিক ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রকৌশল পণ্যে, ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্লাস্টিক পণ্যে এবং ১২ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ওষুধ খাতে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন পণ্য রফতানি বৃদ্ধির জন্য স্থিতিশীল নীতি দরকার বলে মনে করেন। তিনি বলেছেন, ‘ কষ্ট লাগে যে এখনও পণ্যের স্যাম্পল (নমুনা পণ্য) ছাড়াতেই ১০ দিন সময় লাগে।’ চামড়া খাত ভাল করলেও জাহাজ নির্মাণশিল্প নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন তিনি। রফতানিতে নগদ সহায়তা দিতে সরকারের ব্যয় প্রতিবছর বাড়ছে। বিগত অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। চলতি বছর এ ব্যয় আরও বাড়বে। কারণ অর্থ মন্ত্রণালয় এ বছর নতুন পাঁচটি পণ্যকে নগদ সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া চারটি পণ্যে সহায়তার হার বাড়ানো হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে চিঠি দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে যে পাঁচটি পণ্য রফতানিতে নগদ সহায়তা মিলবে, সেগুলো হলো তথ্যপ্রযুক্তির পণ্য, কাপড়ের তৈরি জুতা, ওষুধের কাঁচামাল, ব্যাটারি ও নারিকেলের ছোবড়ার আঁশ থেকে উৎপন্ন পণ্য। এ ছাড়া চলতি বছর হোগলা, খড়, আখের ছোবড়া ইত্যাদি দিয়ে তৈরি পণ্য ও চামড়া শিল্পনগর থেকে উৎপাদিত চামড়া রফতানিতে নগদ সহায়তা ৫ শতাংশ এবং আলু রফতানিতে নগদ সহায়তা ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। রফতানি আয়ের বিপরীতে সরকার নগদে যে ভর্তুকি দেয় তাই নগদ সহায়তা। ১০ শতাংশ নগদ সহায়তার মানে হলো ১০০ টাকা রফতানির বিপরীতে রফতানিকারকরা সরকারের কাছ থেকে ১০ টাকা পান। চলতি অর্থবছর ২৭টি পণ্য বা ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা দেয়া হবে, যা দুই বছর আগেও ১৪টিতে সীমাবদ্ধ ছিল। বাজেট নথি থেকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালাগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ করা উপাত্ত ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে নগদ সহায়তা বাবদ সরকারের ব্যয় ছিল ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা হয়েছে। নগদ সহায়তার তালিকায় এমন কিছু খাত আছে, যারা দশকের পর দশক ধরে এ সুবিধা পাচ্ছে। আবার নগদ সহায়তার অর্থ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও বিস্তর। অনেক সময় ভুয়া নথি দাখিল করে এবং রফতানির টাকা দেশে না এনেও নগদ সহায়তা হাতিয়ে নেয় কোম্পানিগুলো। এ বিষয়ে বেসরকারী গবেষণা সংস্থা পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেছেন, নগদ সহায়তা দিয়ে রফতানি খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করা যায় না। এ জন্য দরকার রফতানিবান্ধব শুল্কনীতি ও অনুকূল বিনিময় হার। তিনি মনে করেন, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতে সাময়িক নগদ সহায়তা দেয়া ঠিকই আছে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে রফতানি খাতকে টেকসই করতে হলে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, উচ্চ সুরক্ষার কারণে দেশের বাজারেই পণ্য বিক্রিতে লাভ বেশি। এতে শিল্প খাত রফতানিমুখী হচ্ছে না। নগদ সহায়তা পেয়ে অনেক সময় রফতানিকারকরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন। ভারত বাংলাদেশের পাট পণ্য রফতানিতে যে এ্যান্টিড্যাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে তার পেছনে এই নগদ সহায়তা দায়ী বলে মনে করা হয়। এ ছাড়া কোন দেশ পণ্য রফতানিতে ভর্তুকি দিলে আমদানিকারক দেশ বিপরীতে সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাউন্টারভেইজিং শুল্ক আরোপ করতে পারে। অবশ্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন বৈশ্বিক রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নগদ সহায়তা দিতে হয়। তিনি বলেন, এ দেশে উৎপাদন খরচ বেশি। ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমানো যায় না। এ জন্য রফতানিকারকদের নগদ সহায়তা দিতে হয়। নগদ সহায়তার যাতে অপব্যবহার না হয় এবং এর ব্যবস্থাপনা যেন ঠিক থাকে তা নজরে রাখতে হবে। কখন বাড়াতে হবে, কখন কমাতে হবে, কখন বাদ দিতে হবে তা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। কারণ, এটি সরকারের একটি আর্থিক দায়ও। দেশের রফতানি খাতকে উৎসাহিত করতে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ভর্তুকি বা নগদ সহায়তার খাত ও হার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে প্রথমে ২০টি পণ্য রফতানিতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল, পরে আরও কয়েকটি পণ্য ভর্তুকির আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। এতে পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২টি। এর সঙ্গে চলতি অর্থবছরে আইটিসহ ৫টি খাতকে নগদ সহায়তার আওতায় নেয়া হয়েছে সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ গত বছর ২ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করে। একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পোশাক রফতানিকারক দেশ। তবে ইইউ জোট হিসাবে নিলে বাংলাদেশ তৃতীয়। সব মিলিয়ে গত বছর বিশ্বের মোট পোশাক রফতানির ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে গেছে। ডব্লিউডিটওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোশাক রফতানিতে বরাবরের মতো শীর্ষ অবস্থানে আছে চীন। দেশটি গত বছর ১৬ হাজার ১০০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। বিশ্বের মোট পোশাক রফতানির ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশই চীনের দখলে। তবে গেল বছর পোশাক রফতানি ৭ শতাংশ কমে গেছে চীনের। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ২৮ দেশের জোট ইইউর প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ। তারা রফতানি করেছে ১১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের পোশাক। তৃতীয় বাংলাদেশ। চতুর্থ শীর্ষ পোশাক রফতানিকারক দেশ ভিয়েতনাম গত বছর ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। তাদের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত গত বছর ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। অবশ্য তাদের পোশাক রফতানি ২ শতাংশ কমে গেছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট পোশাক রফতানির ৪ শতাংশ ভারতের দখলে আছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মোহাম্মদ নাছির সম্প্রতি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকশিল্প নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে আমাদের সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। ‘পোশাকশিল্পের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আমরা একটি উদ্যোগ নিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে বিদেশী ক্রেতাদের সামনে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিবাচক অগ্রগতি তুলে ধরা হবে। উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিয়ে শিল্পের অগ্রগতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবৃদ্ধি প্রাপ্তি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে রফতানির লক্ষ্য বাস্তবায়নের নিমিত্তে সমস্যাসমূহ দূরীকরণের মাধ্যমে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।