ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

আদালতেও হাজির করা হয়নি

২৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ মিন্টুকে, গ্রেপ্তার না মুক্তি সিদ্ধান্ত হয়নি

শংকর কুমার দে

প্রকাশিত: ২৩:১৬, ১২ জুন ২০২৪

২৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ মিন্টুকে, গ্রেপ্তার না মুক্তি সিদ্ধান্ত হয়নি

আনোয়ারুল আজিম আনার

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডের মামলায় পর্দার অন্তরাল থেকে কলকাঠি সোনা চোরাচালানী মাফিয়া চক্র কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই হত্যাকা-ের ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং অপরাধীদের বাঁচাতে মাঠে নেমেছে অদৃশ্য প্রভাবশালী মহল।

ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল করিম মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়ার পর নানা প্রশ্ন উঠেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে ধানমন্ডি থেকে সাঈদুল করিম মিন্টুকে ডিবি হেফাজতে নেওয়ার পর বুধবার বিকেল পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত থাকলেও তাকে গ্রেপ্তার করা হবে নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। গত চব্বিশ ঘণ্টায় তাকে আদালতেও হাজির করা হয়নি।

সাঈদুল করিম মিন্টুকে ডিবি হেফাজাতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় ঝিনাইদহের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে এমপি আনার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন অভিযোগ করেছেন, অপরাধীদের বাঁচাতে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। তবে এমপি আনার হত্যার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে কোনো চাপ নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এমপি আনার হত্যাকা-ের ঘটনায় ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের দুই নেতা জেলার সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল করিম মিন্টু ও জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এমপি আনার হত্যাকা-ের মামলার তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। 
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন কর্মকর্তা বলেন, এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া সৈয়দ আমানউল্লাহ ওরফে শিমুল ভুইয়া, জেলা আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমদে বাবু ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল করিম মিন্টুর মোবাইল ফোনের কললিস্ট, এসএমএস,  হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঝিনাইদহের আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সোনা চোরাচালানের সিন্ডিকেটের বিরোধে এমপি আনার খুন হয়েছেন কি না জিজ্ঞাসাবাদে তা জানার চেষ্টা করা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমদে বাবুকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও বুধবার পর্যন্ত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল করিম মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে নাকি ছেড়ে দেওয়া হবে তা নিয়ে দোদুল্যমানতার মধ্যেই বক্তব্য নিয়ে সামনে চলে এসেছেন এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। 
এমপি আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বলেছেন, গ্যাস বাবু নামে যাকে আটক করা হয়েছে, তিনি আমার বাবার প্রতিপক্ষ নন। আমাদের সঙ্গে তার কোনো শত্রুতা নেই। আপনারা দেখেছেন, আটকের আগে থানায় তিনি (গ্যাস বাবু) জিডি করেছেন যে, তার তিনটি ফোন হারিয়ে গেছে।

একই দিনে একজন মানুষের তিনটি ফোন কীভাবে হারিয়ে যায়, সেটাও আমার প্রশ্ন। বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। এ সময়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে আনার কন্যা অভিযোগ করেন, গেল ১৭ তারিখে তার গিয়াস বাবু সঙ্গে ভাঙায় দেখা হয়েছে, সেখানে টাকা লেনদেনের একটা কথা উঠেছে, যা আমি খবরে শুনেছি।

আমার কথা হলো, এই টাকার জোগানদাতা কে? কেন তারা এটা করিয়েছে ? এগুলো কী পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে! গ্যাস বাবু তো আমার বাবার শত্রু না। এই কাজগুলো কে করাচ্ছে, সেটা আমি বারবার বলেছি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যা মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত করতে কোনো তদবির বা চাপ নেই বলে। তিনি বলেন, সঠিক পথেই তদন্ত এগোচ্ছে। বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। 
সদুত্তরের ওপরই নির্ভর করছে মিন্টুর ভাগ্য ॥ ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেছেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকা-ের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুকে।

ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হত্যাকা-ের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত রয়েছে। সে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মিন্টু যদি কোনো সদুত্তর দিতে না পারেন তা হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা  গ্রেপ্তার) নেবেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুর কাছে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিচার বিশ্লেষণের পরেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাইদুল করিম মিন্টুকে ডাকা হয়েছে।

মিন্টুর কাছে তথ্যগুলো জানতে চাওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ বাবু ওরফে গ্যাস বাবুকে নিয়ে আসি। আমরা যখন কাউকে নিয়ে আসি অবশ্যই কিছু তথ্য-উপাত্ত থাকে। প্রমাণের ভিত্তিতেই তাকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করি।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্যাস বাবু অকপটে স্বীকার করেন যে, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়া ঘাতক শিমুল ভূঁইয়ার সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছিলেন। শিমুল ভূঁইয়া গ্যাস বাবুকে এমপি আনার হত্যার পর ছবি দেখিয়েছেন।
অনেকের সম্পর্কেই তথ্য প্রমাণ আছে ॥ ডিবি তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এমপি আনার হত্যাকা-ে এখন পর্যন্ত দুজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পেয়েছেন ডিবি কর্মকর্তারা।

এমন আরও কতজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে ডিবি কর্মকর্তা বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক গ্যাস বাবু রিমান্ডে রয়েছেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এ ছাড়াও অনেকের সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

এমপি আনার হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত, যারা নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আবার কারও প্ররোচনায় কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা হবে না।
তদন্তে সোনা চোরাচালান থেকে রাজনৈতিক মোড় ॥ এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার বিষয়ে নতুন নতুন তথ্য উঠে আসছে। তদন্তের শুরুর দিকে চোরাচালানের কারণে হত্যাকা- হতে পারে এমন বিষয় সামনে আসে। তবে এখন সেটি মোড় নিয়েছে রাজনীতির দিকে। নিহতের পরিবারেরও দাবি, রাজনৈতিক বিরোধে এই হত্যাকা- ঘটেছে।

ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিগত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান আনার। এই আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাঈদুল করিম মিন্টু। মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার পর সাঈদুল করিম মিন্টু এমপি নির্বাচনে আনারের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রশীদ খোকনের পক্ষে কাজ করেছেন।

এ নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। এ ছাড়াও সাঈদুল করিম মিন্টুকে পৌরসভার মেয়র পদ থেকে বঞ্চিত করার পেছনেও কাজ করেছেন এমপি আনার। এমপি আনার মেয়র পদে শহীদুজ্জামান সেলিমকে বসানোর জন্য কাজ করেছেন। শহীদুজ্জামান সেলিমের ছোট ভাই আক্তারুজ্জামান শাহীন। এই আক্তারুজ্জামান শাহীনই এমপি আনার হত্যাকা-ের মাস্টার মাইন্ড।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কামাল গ্যাস বাবুসহ আরও কয়েকজনকে সন্দেহ তাদের। ইতোমধ্যে তাদের আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় আরও কয়েক রাজনৈতিক নেতা গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। তথ্য-প্রমাণে সাপেক্ষে যে  কোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
আটকের পক্ষে-বিপক্ষে মানববন্ধন ঝিনাইদহে ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা, ঝিনাইদহ থেকে জানান, এমপি আনার হত্যার ঘটনা নতুন মোড় নিতে শুরু করেছে। তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতায় বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন নাম। হত্যার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আটক হচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা।

ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু আটকের পর তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল মানববন্ধন করা হয়েছে। অপরদিকে  এমপি আনার হত্যার প্রতিবাদে হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতেও অব্যহত রয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টু গ্রেপ্তারের পর মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে শহরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বুধবার দুপুরের দিকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারে আবারও শহরের পায়রা চত্বরে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। 
অপরদিকে এমপি আনার হত্যার প্রতিবাদে জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বুধবার দুপুরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ফুরসন্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আয়োজনে টিকারী বাজারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। মানববন্ধনে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়।

×