মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘পুনঃকল্পনায় সুলতানার স্বপ্ন’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে দুই খুদে দর্শক
গত শতকের প্রথম দশকের কথা। সেই সময়ের পশ্চাৎপদ সমাজে নারীর অবস্থান ছিল বড্ড নাজুক ও ভঙ্গুর। প্রতিবন্ধকতা ও পঙ্কিলতায় ভরপুর ছিল নারীর চলার পথ। নারীর শিক্ষা থেকে স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিসর ছিল সংকীর্ণ। এমন বাস্তবতার বিপরীতে ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হয় রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন রচিত ‘সুলতানার স্বপ্ন’ শিরোনামের উপন্যাসিকা। ১২০ বছর আগের সেই রচনায় উঠে এসেছিল এক ইউটোপিয়ান পৃথিবীর কল্পনা, যেখানে নারীরা জ্ঞানের আলোয় নেতৃত্ব দেবে, বিজ্ঞানচর্চা এগিয়ে নেবে এবং পুরুষরা পালন করবে গৃহস্থালি কাজ।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার উল্টোপিঠে নতুন ভাবনার খোরাক জোগানো সেই গ্রন্থটি ২০২৪ সালে ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড (এশিয়া প্যাসিফিক) স্বীকৃতি অর্জন করে। আর এই স্বীকৃতির উদ্যাপনে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ষষ্ঠ তলার গ্যালারিতে চলছে পুনঃকল্পনা সুলতানার স্বপ্ন শীর্ষক বিশেষ দৃশ্যশিল্প প্রদর্শনী। শর্মিলি রহমানের কিউরেশনে যৌথভাবে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং কলাকেন্দ্র। প্রদর্শনীর সহযোগী হিসেবে রয়েছে লাইব্রেরি উইদাউট বর্ডার্স এবং অলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা।
ব্যতিক্রমী এই শিল্পায়োজনে উপস্থাপিত হয়েছে উনিশ শিল্পীর সৃজিত বৈচিত্র্যময় শিল্পসম্ভার। ঠাঁই পেয়েছে রং-তুলির আঁচড়মাখা মাঝারি আকৃতির চিত্রপট থেকে খ- খ- চিত্রকর্মে সাজানো বিশাল আকারের স্ট্রল পেইন্টিং, আলোকচিত্র, স্থাপনাশিল্প, ভিডিওচিত্রসহ মিশ্র মাধ্যমের শিল্পকর্ম। সুলতানার স্বপ্ন শীর্ষক গ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে সৃজিত হয়েছে এসব শিল্পকর্ম। কয়েক দফা বইটি পড়ার পর শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন পারস্পরিক আলোচনা ও কর্মশালায়।
অতঃপর চার মাসের প্রস্তুতি শেষে উপন্যাসিকাটির অন্তর্গত নির্যাস থেকে শিল্পীরা নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সৃজন করেছেন দৃশ্যশিল্পের অন্তর্গত বহুমাত্রিক শিল্প। এসব শিল্পে ‘সুলতানার স্বপ্ন’র ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মাল্টি ডিসিপ্লিনারি মাধ্যমের এসব শিল্পকর্মে উদ্ভাসিত হয়েছে নারীর অন্তর্গত সংগ্রামের অধ্যায়। শিল্পিত পন্থায় উচ্চারিত হয়েছে নারীর প্রতি সমতার আহ্বান। পুরুষশাসিত সমাজের অযাচিত অনুশাসন ও বাধা-বিপত্তির বিপরীতে শিল্পালোকে উচ্চারিত হয়েছে নারী মুক্তির জয়গান।
প্রদর্শনীটি প্রসঙ্গে কিউরেটর শর্মিলি রহমান বলেন, শিল্পই ভাঙতে পারে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া প্রতিবন্ধকতা। শিল্পই বদলাতে পারে নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ। সেই বিবেচনায় প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নারীদের অগ্রযাত্রা ও অধিকারের শিল্পিত বয়ান উঠে এসেছে এই শিল্পায়োজনে।
ব্যতিক্রমী এ প্রদর্শনীর শিল্পকর্মে গল্পচ্ছলে উপস্থাপিত হয়েছে সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা লিঙ্গভিত্তিক রীতিনীতির অযৌক্তিকতা ও হাস্যকর বিষয়সমূহ। কাঠের তৈরি স্বপ্নের সুতা শীর্ষক ভাস্কর্যে মেলা ধরা হয়েছে নারীর জীবনের প্রতীকী উপাখ্যান। একগুচ্ছ ফুলের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি ধারাল কেচিÑএমন দৃশ্যময় ক্যানভাসে উঠে এসেছে নারীর প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ জীবন বাস্তবতা। উল্টোদিকে আবার কিছু শিল্পকর্ম নারীর নিজস্ব ভাবনা, স্বাধীনতা ও অগ্রযাত্রার ধারাভাষ্য উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেনÑ রু´িণী চৌধুরী, দীপ্তি দত্ত, ফারজানা আহমেদ ঊর্মি, জাফরিন গুলশান, জয়তু চাকমা, সালমা আবেদিন পৃথি, সুমনা আক্তার, ইফাত রাজোয়ানা রিয়া, পলাশ ভট্টাচার্য, এ. আহসান, হেলাল স¤্রাট, বিলাস ম-ল, রূপশ্রী হাজং, সাজিয়া রহমান সন্ধ্যা, ফারিহা জেবা, আসাং মং, সৈয়দ সাইফ, রাজীব দত্ত ও সালমা জাকিয়া বৃষ্টি।
আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। প্রতিদিন সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকবে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।
প্যানেল হু








