ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

শতাধিক ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলা, হতাহত ২৩০

জনকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:২১, ১৯ মার্চ ২০২৬

শতাধিক ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলা, হতাহত ২৩০

তেহরানে বুধবার শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি, বাসিজ বাহিনী প্রধান ও নৌ-সেনাদের জানাজায় হাজার মানুষের ঢল-সংগৃহীত

ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. আলি লারিজানির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে তেল আবিব শহরে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এতে হতাহত হয়েছে দুই শতাধিক ইসরাইলি। বুধবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আগ্রাসনের জবাবে চলমান ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর ৬১তম ধাপে এসব হামলা চালানো হয়। খবর প্রেস টিভির।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ড. লারিজানির শাহাদাতের প্রতিশোধ নিতে বহু-ওয়ারহেড বিশিষ্ট খোররমশাহর-৪ ও কাদর ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি এমাদ ও খেইবার শেকান প্রজেক্টাইল ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে।’
আইআরজিসি দাবি করে, এই তীব্র ও দ্রুতগতির হামলায় খোররমশাহর-৪ ও কাদর ক্ষেপণাস্ত্র দখলকৃত ভূখ-ের কেন্দ্রস্থলে ১০০টির বেশি সামরিক ও নিরাপত্তা স্থাপনায় কোনো বাধা ছাড়ায় আঘাত হেনেছে। এই সাফল্যের পেছনে জায়নবাদী শাসনের বহুমাত্রিক ও অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার ফল বলে উল্লেখ করেছে আইআরজিসি। আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, এ পর্যন্ত ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪’-এর হামলায় ২৩০ জনের বেশি ইসরাইলি নিহত বা আহত হয়েছে।
তেল আবিব ছাড়াও দখলকৃত নগর আল-কুদস, হাইফা বন্দরনগরী, প্রযুক্তিকেন্দ্র বেয়ার শেবা এবং নেগেভ মরুভূমিসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল ও কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে হামলা। এছাড়া, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও এই প্রতিশোধমূলক হামলার আওতায় এসেছে বলে জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
লারিজানির জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল ॥ ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি, আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজের প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি এবং শ্রীলঙ্কার উপকূলে নিহত দেশটির নৌ-সেনাদের জানাজা বুধবার তেহরানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, তাদের জানাজায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পাশাপাশি হাজারো মানুষ অংশ নেন। খবর আল জাজিরার।
এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর শহরাঞ্চলে ইরানের হামলার জন্য দায়ী মূলত যুক্তরাষ্ট্র। এমনটাই জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেন, মার্কিন বাহিনী সামরিক ঘাঁটি ছেড়ে শহরের হোটেলগুলোতে অবস্থান নেয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বুধবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ‘আমরা কেবল শত্রুপক্ষের আনুষ্ঠানিক সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ থাকিনি। যেখানে যেখানে মার্কিন বাহিনী ও তাদের স্থাপনা ছিল, সেগুলোই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এর কিছু স্থান শহরাঞ্চলের কাছাকাছি হতে পারে, তবে এটি আমাদের দোষ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের দোষ। তারা তাদের বাহিনী ঘাঁটি থেকে সরিয়ে শহরের হোটেলে নিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের আচরণই এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের সম্পূর্ণ অবসানই চায় তেহরান- এবং তা সব ফ্রন্টে।
হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেন স্পষ্ট বিধিমালার আওতায় এই নৌপথে শান্তিপূর্ণ চলাচল স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি ও বাসিজ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গোলামরেজা সোলেইমানিকে হত্যার পরও তেহরানের নেতৃত্ব ভেঙে পড়বে না বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। 
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র নয়। বরং এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
সাক্ষাৎকারে আরাগচি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এখনো বুঝতে পারেনি যে ইরানের সরকার বা ব্যবস্থা কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে থমকে যায় না। আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী। অবশ্যই প্রতিটি ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কারো শাহাদাত এই কাঠামোকে অচল করতে পারবে না।
ইরানের হামলায় ইসরাইলে নিহত ২ ॥ ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলে নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ১৯২ জন। ইসরাইলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার দুপুরের পর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে এ তথ্য।
নিহত দু’জনের নাম ইয়ারোন মোশে এবং ইলানা মোশে। তারা স্বামী-স্ত্রী এবং উভয়ের বয়স ৭০ বছরের কাছাকাছি। বুধবার সকাল ৮ টার দিকে ইসরাইলের রামাত গান শহরে ক্লাস্টার বোমা ছোড়ে ইসরাইল, তাতেই খুন হন তারা। এছাড়া বাকি যে ১৯২ জন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৪ জনের আঘাত মাঝারি এবং বাকিদের আঘাত অল্প বলে জানানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে।
ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রীকে হত্যার দাবি ॥ ইসরাইলের হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতাদের প্রাণহানির তালিকায় যুক্ত হলো আরও একজনের নাম। এবার দেশটির গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিবকে হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এদিকে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে আজ বুধবার ভোরে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম এ খবর জানিয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এক টেলিগ্রাম বার্তায় জানায়, হামায় স্থাপনাটিতে আগুন ধরে গেছে এবং উদ্ধারকারী ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বর্তমানে ঘটনাস্থলে রয়েছেন। উল্লেখ্য, ইরানের সাউথ পার্স বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র। যেখানে ইরান ও কাতার উভয় দেশের গ্যাস উত্তোলন-বিষয়ক স্থাপনা রয়েছে। এদিকে ইসরাইলের সংবাদমাধ্যমগুলো স্থানীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান দক্ষিণ ইরানের বুশেহর প্রদেশে দেশটির গ্যাস অবকাঠামোতে এই হামলা চালিয়েছে।

প্যানেল হু

×