বছর ঘুরে মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে আবার হাজির হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর
বছর ঘুরে মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে আবার হাজির হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। সারা মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের ঘরে ঘরে ঈদ নিয়ে এসেছে আনন্দের বারতা। বাংলাদেশের আকাশে আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল শুক্রবারই পালিত হবে ঈদ। আর চাঁদ দেখা না গেলে ঈদ হবে শনিবার। বিশ্লেষকদের মতে, আজ চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া দেশের এক শ্রেণির মুসলমান সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে একই দিনে ঈদ উদযাপন করেনে। নিয়মানুযায়ী পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার তথ্য পর্যালোচনা ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ নির্ধারণ করতে আজ বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসবে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি।
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঈদের একটি বিরাট ও সুদূরপ্রসারী আবেদন হচ্ছে, ভ্রাতৃত্ব বোধ ও ব্যাপক ঐক্য স্থাপন। সদকার মাধ্যমেও এই আবেদন অনেকটা পূরণ করা সম্ভব। তথাপি, আল্লাহর প্রতি সদকার মাধ্যমে এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাথে জামাত সহকারে ঈদের নামাজ আদায় করার মধ্যেও একই উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে। জামাত সহকারে নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদের পরিবর্তে ঈদগাহ নির্ধারণ হতে ঈদের উদ্দেশ্য অনুধাবন করা যেতে পারে। ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়া মহানবী (সা.)-এর সুন্নত, তিনি সব সময় ঈদগাহে নামাজ আদায় করতেন।
একবার ভীষণ বৃষ্টির সময় ময়দানে গমন করা সম্ভব ছিল না বলে হুজুর (সা.) মসজিদেই নামাজ আদায় করেছিলেন। এই একবার ব্যতীত তিনি আর কখনো মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তিনি উভয় ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়তেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, বিপুল সংখ্যায় মুসলমানগণ যেন ঈদের নামাজের জন্য উপস্থিত হতে পারে। কেননা, মুসলিম ঐক্য ও সংহতি প্রকাশের জন্য এটাই উৎকৃষ্ট পন্থা। কিন্তু আজকাল দেখা যায়, মাঠে-ময়দানে তথা ঈদগাহের পরিবর্তে মসজিদগুলোতেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে (বৃষ্টি-বাদল ছাড়াই) ঈদের নামাজ সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। ইসলামী পন্ডিতদের মতে, ঈদের গোটা উৎসবটাই হচ্ছে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আনন্দের সাথে ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধ-সাম্য, মুসলিম ঐক্য-সংহতি এবং মানবতাবোধ তথা মানব কল্যাণের এক অপূর্ব নিদর্শন।
সদকা, জাকাত, দান-খয়রাত, ঈদের সময় যাকাত প্রদান, খোতবা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ করলে মুসলমানের ঈদোৎসবের সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যায়। ঈদের বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে অন্যান্য জাতির আনন্দ উৎসবের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইসলামের পূর্বে আরবে প্রচলিত আনন্দ-উৎসবের পরিবর্তে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র ঈদ নির্ধারণের ঘটনাই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, দুনিয়ার প্রত্যেক জাতির মধ্যে আনন্দ প্রকাশের বিভিন্ন উৎসব দিবস প্রাচীন যুগ থেকেই বিদ্যমান। তাদের ন্যায় মুসলমানদের জন্যও দুটি উৎসব দিবস ধার্য করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কা হতে মদীনার হিজরত করলে সেখানে দেখতে পান যে, মদীনাবাসীরা দু›দিন আনন্দ-উৎসব পালন করছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের জন্য দুটি ঈদের দিন ধার্য করে দেন- একটি ঈদুল ফিতর এবং অপরটি ঈদুল আজহা। অন্যান্য জাতির উৎসব অপেক্ষা ইসলামের এই দুইটি দিন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অতি উত্তম। হিজরী দ্বিতীয় সালে রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মহান ঈদের কথা ঘোষণা করেন।
গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদের বৈশিষ্ট্য শাশ্বত, এর আদর্শ শিক্ষা চিরন্তন এবং এর আবেদনও অনাবিল, অন্যকোনো ধর্মে ঈদের এই তাৎপর্য, বৈশিষ্ট্য ও মাহাত্ম্য পরিলক্ষিত হবে নাÑ ঈদের এই গৌরব কেবলমাত্র মুসলিম জাতির জন্য নির্ধারিত, মুসলমানগণই ঈদের তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারে এবং তারাই এর মৌলিক আদর্শ মূল্যায়ন করতে সক্ষম। এর শিক্ষা অনুসরণ করে নিজেদের জীবনকেও সার্থক এবং সাফল্যম-িত করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান বিশ্বে ঈদের যথার্থ আদর্শ কতটুকু গ্রহণ করা হচ্ছে?
কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও লৌকিকতা ব্যতীত মুসলিম উম্মাহ ঈদের আদর্শ হতে বহু দূরে সরে গেছে। আমাদের দেশেও দেখা যায়, আনুষ্ঠানিকতা প্রদর্শন ও অর্থব্যয়ের তীব্র প্রতিযোগিতা, যার সাথে ঈদের আদর্শের কোন মিল নেই। বরং ঈদের সাথে যোগ হয় ইসলামে নিষিদ্ধ অপচয় ও অন্যান্য শয়তানি কার্যকলাপের প্রতিযোগিতা। তাই সকলের উচিত, সত্যিকারের ঈদ-আদর্শের অনুসরণ করা এবং অপচয় ত্যাগ করা।
চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক সন্ধ্যায় ॥ পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার তথ্য পর্যালোচনা ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতরের তারিখ নির্ধারণ করতে আজ বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসবে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। বুধবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামী ফাউন্ডেশনের সম্মেলন কক্ষে সন্ধ্যা ৬টায় বৈঠকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ।
সারাদেশ থেকে প্রাপ্ত চাঁদ দেখার সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই সভা থেকেই নিশ্চিত করা হবে কবে পালিত হবে মুসলিম উম্মাহর সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। বাংলাদেশের আকাশে কোথাও শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে ০২-৪১০৫৩২৯৪, ০২-২২৬৬৪০৫১০ এবং ০২-২২৩৩৮৩৩৯৭- এই ফোন নম্বরগুলোতে অথবা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানোর জন্য অনুরোধ জানিয়েছে ইসলামিক
বায়তুল মোকাররমে এবারও ৫টি জামাত হবে।।প্রতি বছরের মতো এবারও পবিত্র ঈদুল ফিতরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে পাঁচটি ঈদের নামাজের জামাত হবে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে শুক্র বা শনিবার (২০ বা ২১ মার্চ) দেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহ ও বিভিন্ন মসজিদে মুসল্লিরা দুই রাকাত ঈদের ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন। ঈদুল ফিতরের তারিখ নির্ধারণে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সভায় বসবে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি। ঈদুল ফিতরে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে ৫টি ঈদ জামাত সকাল ৭টা, সকাল ৮টা, সকাল ৯টা, সকাল ১০টা ও সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বুধবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশের প্রধান ঈদ জামাত সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হবে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক জাতীয় ঈদগাহে ইমামতি করবেন। বিকল্প ইমাম হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফাসসির ড. মাওলানা মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী প্রস্তুত থাকবেন।
প্রথম জামাতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মিজানুর রহমান, দ্বিতীয় জামাতে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী, তৃতীয় জামাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক মাওলানা মো. জাকির হোসেন, চতুর্থ জামাতে ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ধর্মীয় প্রশিক্ষক মাওলানা যোবায়ের আহমেদ আল আযহারী এবং পঞ্চম ও সর্বশেষ জামাতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ইমামতি করবেন। এ সময় বিকল্প ইমাম হিসেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী লাইব্রেরিয়ান মাওলানা শহীদুল ইসলাম প্রস্তুত থাকবেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত সকাল ১০টায় ॥ ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাতকে সামনে রেখে দেশের বৃহত্তম ঈদগাহ ময়দান কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আগত মুসল্লিদের নিরাপত্তায় চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এবারও থাকছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মোতায়েন থাকবে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি। ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১০টায়। জামাতে ইমামতি করবেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে থাকবেন হয়বতনগর এ. ইউ. কামিল মাদরাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় ঈদগাহ ময়দানের সার্বিক প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, ঈদগাহ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা, র্যাব-১৪ ময়মনসিংহের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিরা টুপি, জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন ছাড়া অন্য কিছু সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছাতা বহনেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, ঈদের জামাত আয়োজনের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের ঘটনার পর থেকে প্রতিবছরই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এবারও চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
মাঠ ও আশপাশ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে একাধিক চেকপোস্ট ও পিকেট। ছয়টি ওয়াচ টাওয়ারের মধ্যে চারটি পুলিশ এবং দুটি র্যাব ব্যবহার করবে। তিনি জানান, মাঠজুড়ে সিসিটিভি নজরদারির পাশাপাশি চারটি ড্রোন ক্যামেরা ও ছয়টি ভিডিও ক্যামেরা মোতায়েন থাকবে। নিরাপত্তায় থাকবে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল, সুইপিং টিম ও কুইক রেসপন্স টিম। এছাড়া ফায়ার সার্ভিস, ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল টিম প্রস্তুত থাকবে।
র্যাব-১৪ ময়মনসিংহের অধিনায়ক নাঈমুল ইসলাম বলেন, স্নাইপার, ড্রোন ক্যামেরা ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে। র্যাব সদস্যরা পোশাক ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো ধরনের হুমকি নেই বলেও জানান তিনি। মাঠ প্রস্তুতকরণ, রং করা, অজু ও গোসলের ব্যবস্থাসহ মুসল্লিদের জন্য সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। মুসল্লিদের যাতায়াত সুবিধার্থে ঈদের দিন কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ ও ভৈরব-কিশোরগঞ্জ রুটে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে।
প্যানেল হু








