ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

নাড়ির টানে প্রিয়জনের কাছে ফিরছে মানুষ

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

প্রকাশিত: ০০:০৭, ১৯ মার্চ ২০২৬

নাড়ির টানে প্রিয়জনের কাছে ফিরছে মানুষ

পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামের বাড়ি ফিরছেন ঢাকায় বসবাসরতরা। বুধবার সদরঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি লঞ্চ

ঈদুল ফিরতরের আর মাত্র এক বা দুইদিন বাকি। তাই পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে শেষ মুহূর্তে ঢাকা ছাড়ছেন রাজধানীবাসী। আজ বৃস্পতিবার যদি শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায় তাহলে শুক্রবার সারাদেশে উদযাপিত হবে ঈদুল ফিতর। না হলে শনিবার। আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ।
এ বছর ঈদ উদযাপনের ঢাকা বাইরে যাবে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ। ঈদের দীর্ঘ ছুটি উপভোগের জন্য মানুষ ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাচ্ছেন বেশি। একসঙ্গে এত লোক যাতায়াত করায় চাপ বেড়েছে গণপরিবহনের ওপর। তাই বুধবার রাজধানীর বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে ছিল ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি গণপরিবহনেই ছেড়ে যাত্রী বোঝাই করে। যাত্রাপথে পরিবহন সংকট, ঈদ বকশিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া, মহাসড়কে থেমে থেমে যানজট ও ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে দীর্ঘ যানজটসহ নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ঘরমুখো মানুষদের। তবুও আপনের জনের সঙ্গে ঈদ করতে পারাটা যেন সকল ভোগান্তি ম্লান হয়ে যায়। পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা যেন অন্য রকম আনন্দ বলে জানান তারা। 
সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন টার্মিনালে ঘুরে দেখা গেছে, বুধবার সকাল থেকে বিভিন্ন বাস টার্মিনালে ছিল ঘরমুখো মানুষের ভিড়। বেলা বাড়ার সঙ্গে এই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। সন্ধ্যায় প্রতিটি বাস কাউন্টারে ছিে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। পরিবার-পরিজন নিয়ে সবাই নির্দিষ্ট গন্তব্যের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে তাদের। অনেকই বিভিন্ন রুটের বাসের টিকিট সন্ধান করতে দেখা গেছে।    
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে সুরুজ মিয়া নামের শ্যামলী পরিবহনের এক কাউন্টারম্যান জানান, ঈদের এক বা দুইদিন আগের সব অগ্রিম টিকিট অনেক আগেই বিক্রয় হয়ে গেছে। তাই শেষ সময়ে কোন টিকিট বিক্রয় হচ্ছে না। তবে যদি কোনো যাত্রী টিকিট ফিতর দেয়। তা বিক্রয় করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কোনো বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না।  
চাঁপাইনবাবগঞ্জের টিকিটের খোঁজে আসা আব্দুল আলিম নামের এক যাত্রী জানান, শেষ মুহুর্তে টিকিট নেই এটা জেনেই এসেছি। কিন্তু যদি কেউ ফেরত দেন, তাহলে সেটি নিয়েই রওনা হবেন। এছাড়া অনেক পরিবহনে পিছনের সিট ও ইঞ্জিন কভারে টিকিট পাওয়া যায় কিনা তা খোঁজ করেন তিনি। 
এদিকে বুধবার রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন করেন সড়ক, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এ সময় তিনি বলেন, সব বাস কাউন্টার থেকে নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের ভোগান্তি বা অভিযোগ আমরা পাইনি। রাস্তায় কোনো যানজট নেই। সার্বিকভাবে ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক রয়েছে। যাত্রীরা শৃঙ্খলার সঙ্গে ঢাকার বাইরে যাতায়াত করতে পারছেন এবং কোথাও বড় ধরনের বিঘœ ঘটার খবর পাওয়া যায়নি। গত ১৫ মার্চ রাত ১১টা থেকে পর্যাপ্ত তেল দেওয়া হচ্ছে। যমুনা সেতু দিয়ে মঙ্গলবার ৩২ হাজার গাড়ি বেশি চলাচল করেছে। তারা তেল পেয়েছে বলেই তো যেতে পারছে। কেউ না পেলে অভিযোগ করতে পারবে। গণপরিবহনে ফুয়েল ঘাটতি নেই।’

মহাসড়কে যানজটের ভোগান্তি
যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়া সড়ক ও মহাসড়কে বেড়েছে গণপরিবহনের চাপ। এতে ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথে দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। বিশেষ করে ঢাকা প্রবেশমুখ গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায় দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে ঘরমুখো মানুষদের। এছাড়া ঢাকা বাইরে সাভার ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক ও আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া-ডিইপিজেড সড়কে থেমে থেমে যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। 
স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদযাত্রায় এবাবও উত্তরের যাত্রীদের জন্য ভোগান্তির নাম গাজীপুরের চন্দ্রা পয়েন্ট। গতবারের মত এবারও চন্দ্রা পয়েন্টের দীর্ঘ যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। যা গিয়ে শেষ হয়েছে জিরানি পর্যন্ত। এছাড়া সড়কের অতিরিক্ত গাড়ীর চাপের কারনে কবিরপুর, বাড়ইপাড়া, জুম্মআ ঘরসহ কয়েকটি পয়েন্টে যানবাহনের  দীর্ঘ লাইন তৈরী হতে দেখা গেছে। এতে ১০ মিনিটের পথ পারি দিতে সময় লাগছে এক থেকে দেড় ঘন্টা। এছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর, উল্লাইল, গেন্ডা, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে থেমে থেমে  যানজটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানান।
আবুল হোসেন নামের এক পরিবহন চালক জানান, ঈদের আগে গাড়ী চাপ বেশী থাকায় সড়কে পথে পথে জটলা রয়েছে। চন্দ্রার মুখে পড়তে হয়েছে দীর্ঘ যানজটে। তবে গাবতলী থেকে বাস ছেড়ে নবীনগর পর্যন্ত তেমন ঝক্কি পোহাতে হয়নি।

সদরঘাটে লঞ্চ যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়
বুধবার ভোর থেকেই রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ছিল ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়। বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা লঞ্চে যাতায়াতের জন্য ভোর থেকেই সদরঘাটে আসতে থাকে। স্বাভাবিক এ সব লঞ্চ ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ও রাতে বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। কিন্তু ঈদে প্রচ- ভিড় থাকায় লঞ্চে যাত্রী বোঝাই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আগে প্রতিদিন ৫০-৬০ টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করত ঈদ উপলক্ষে ১০০-১২০টি লঞ্চ চলাচল করছে বলে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)’র কর্মকর্তারা জানান।
বিআইডব্লিউটিএ’র ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক (বন্দর) মো. মোবারক হোসেন মজুমদার জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ঈদুল ফিরত উপলক্ষে ঢাকা নদীবন্দরে সার্বিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে আনসার, পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি যাত্রীদের মালামাল বহনে সুবিধার জন্য ১০০টি ট্রলি, যা যাত্রীরা নিজেরাই ব্যবহার করতে পারবেন। অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০টি গেটে মোট ৪০টি রাখা হয়েছে। ক্যাডেট সদস্যরা এতে সহায়তা করছেন। ঈদ উপলক্ষ্যে ১২০ টি লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে উদ্দেশ্যে চলাচল করবে।’ কোনো অবস্থাই লঞ্চে যাতে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা না হয় সে জন্য কঠোর নজরদারী করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা জানান, নতুন সরকারের আমলে যাত্রীসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিআইডব্লিউটিএ। সদরঘাটকে আরও সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি চালু করা হয়েছে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা। ঈদের আগে পাঁচ দিন ও পরে পাঁচ দিন মোট ১০ দিনের জন্য যাত্রীদের জন্য ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব অর্থায়নে কুলিদের মজুরি দিয়ে নিয়োগ করায় যাত্রীরা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। লঞ্চ মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ উপলক্ষে ভাড়া ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত স্বস্তি যোগ করেছে।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (বন্দর) এ কে এম আরিফ উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, নতুন সরকারের সময়ে যাত্রীদের কল্যাণে আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আগে ওপরের অংশ পরিষ্কার থাকলেও ভেতরটা তেমন ভালো ছিল না। এবার পুরো এলাকায় পরিবর্তন এনেছি। সরেজমিনে এলে বোঝা যাবে সদরঘাট এখন অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন।
এদিকে ঈদযাত্রা স্বস্তির করতে হাতিয়া ও ভোলাগামী যাত্রীদের জন্য নতুন তিনটা জাহাজ চালু করেছে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। ঢাকা-হাতিয়া নৌপথে যাত্রীদের জন্য রূপসা ও সুগন্ধা এবং ঢাকা-বেতুয়া নৌপথের যাত্রীদের চলাচল করছে মধুমতি নামের এই জাহাজগুলো। সোমবার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এই তিনটি জাহাজ সার্ভিসের উদ্বোধন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। 

নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেছে ট্রেন
বুধবার সকাল থেকে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ছিল ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। যাত্রীদের এই ভিড় সামলাতে কিছুটা বেগ পেতে হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিডিউল বিপর্যয় ঘটেনি বলে জানান রেলওয়ে কর্মকর্তারা। নির্ধারিত সময়েই ট্রেনগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে বলে জানান তারা। 
সরেজমিনে কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে ছিল ঘরমুখো মানুষের প্রচ- ভিড়। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি, টিকিট কাউন্টারের সামনে ছিল দীর্ঘ লাইন। অনেক যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে পরিবার-পরিজন নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। বুধবার সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে বেনাপোলগামী রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যায়। এছাড়া সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে জয়ন্তীকা এক্সপ্রেস, নকশিকাঁথা, অগ্নিবীণা, রাজশাহী কমিউটার, নারায়ণগঞ্জ কমিউটার, মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন নির্ধারিত সময় কমলাপুর রেলস্টেশন ছেড়ে গেছে। প্রতিটি ট্রেন ছিল যাত্রীদের প্রচ- ভিড়। 
আনোয়ার হোসেন নামের সিলেটগামী যাত্রী জানান, ঈদের সময় ট্রেন মিস হওয়ার ভয় থাকে। তাই আগেই চলে এসেছি। ভিড় অনেক বেশি, তবে পরিবেশ ভালো লাগছে। আশা করি কোনো ঝামেলা ছাড়াই বাড়িতে যেতে পারব।
নির্ধারিত সময় প্রতিটি ট্রেন ছেড়ে গেছে জানিয়ে ঢাকা বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার দুপুর পর্যন্ত কোনো ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় হয়নি। যাত্রীরা স্বস্তির সঙ্গে ঈদযাত্রা উপভোগ করছেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে যাত্রীরা নির্বিঘেœ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।

প্যানেল হু

×