ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

৩০ জুনের পর সব বন্ধ ॥ সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্ত

ব্যাটারিচালিত রিক্সা, লক্কড় ঝক্কড় বাস চলবে না

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:১০, ১৬ মে ২০২৪

ব্যাটারিচালিত রিক্সা, লক্কড় ঝক্কড় বাস চলবে না

ব্যাটারিচালিত রিক্সা, লক্কড় ঝক্কড় বাস ৩০ জুনের পর বন্ধ

রাজধানী ঢাকায় আগামী ৩০ জুনের পর আর কোনো ফিটনেসবিহীন, রঙচটা ও লক্কড় ঝক্কড় বাস চলাচল করতে পারবে না। এ ছাড়া সারাদেশের ২২টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। পাশপাশি ঢাকায় যেন ব্যাটারিচালিত রিক্সা বা গাড়ি চলাচল করতে না পারে  সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রনে সারাদেশে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য ‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ এই পদ্ধতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জরুরি কারণ ছাড়া হুটার বা হর্ন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদ।
বুধবার রাজধানীর বনানীতে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইটিএ)’ আইন-২০১৭ -এর অধীনে এই উপদেষ্টা পরিষদ করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পর এই উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হলো। সভার সভাপতিত্ব করেন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)র মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
সভা শেষে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরে আধুনিক গণপরিবহন চলাচল করে। কিন্তু ঢাকায় লক্কড় ঝক্কড় ও রঙচটা গাড়ি চলে। এগুলো দেখতেও তো খারাপ লাগে। এর চেয়ে ঢাকার বাইরে মফস্বল এলাকাগুলোতে উন্নতমানের গণপরিবহন চলে। এই লক্কড় ঝক্কড় বাসগুলোর বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

যদিও এখন ডাম্পিং করতে গেলে দেখা যায় ওই ধরনের গাড়ি আর রাস্তা বের হবে না। তখন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঢাকার রাস্তায় পুরনো ফিটনেসবিহীন বাস ডাম্পিং নয়, ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ 
ওবায়দুল কাদের বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা আনতে বিআরটিএ অনেক কর্মসূচি ও আইন করে। কিন্তু রেজাল্ট কী? সড়কের দুর্ঘটনা এবং যানজট তো কমছে না। ২২টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিক্সা নিষিদ্ধ করেছি।

এখন থেকে ব্যাটারিচালিত কোনো রিকশা বা গাড়ি যেন ঢাকা শহরে না চলে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, চলতে যেন না করতে পারে-সে ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা পৃথিবীর কোনো দেশেই বন্ধ হবে না। তবে দুর্ঘটনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যানজট এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কিছু যদি আমরা করতে না পারি তা হলে আমাদের নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন দেখতে কী লাভ। প্রতিনিয়তই আমাদের কথা শুনতে হচ্ছে।
ঈদের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি ঘটে জানিয়ে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা মানুষ হিসেবে আমাকে কষ্ট দেয়। একটা মন্ত্রণালয়ে এতদিন দায়িত্ব পালন করার পরও সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। অথচ নিয়ম তো এমন হওয়া উচিত ছিল, এই বছরের ঈদে যে যানজট এবং দুর্ঘটনা ঘটবে, আগামীতে তা আরও কমবে। কিন্তু সেখানে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাহলে আমরা কী কাজ করছি? আমাদের টিম ওয়ার্কের কী সফলতা আছে? এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।
৩১ জুনের পর ঢাকায় লক্কড় ঝক্কড় বাস থাকবে না ॥ সভায় ঢাকায় লক্কড় ঝক্কড় ও রঙচটা বাস চলে তা বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে মালিকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। এজন্য তাদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ৩১ মে পর্যন্ত।

যেহেতু অল্প সময়ের মধ্যে হয়নি তাই আমরা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার চিন্তা করছি। বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট থেকে তো লাভ নেই, তাই আমাদের আগে ফিটনেসের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্কাইপ (ধ্বংস করা) করার যে  প্রস্তাব এসেছে তা আমরা সমর্থন করছি। ঢাকা শহরে বর্তমানে যে পরিবহনগুলো আছে তা দৃষ্টিনন্দন করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য ফিটনেস। ফিটনেস থাকতে হবে আগে। তারপর দৃষ্টিনন্দনের বিষয়টি আসবে।
ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোকে বাজেয়াপ্ত করে সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর করা হবে পরে সিটি করপোরেশন সেগুলোকে ধ্বংস, সেল বা নিষ্পত্তি করবে এমনটি জানিয়ে ডিএসসিসির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ঢাকা শহরের যত অবৈধ ফিটনেসবিহীন বাস ট্রাক ধরা হবে সেগুলোকে মাতুয়াইল ভাগাড়ে রাখার ব্যবস্থা আমরা করে দেব।

তবে ফিটনেসবিহীন যে গাড়ি ধরা হবে সেটা সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত করা হবে। সেটা মালিকের কাছে ফেরত দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। সে গাড়িগুলোকে আমরা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ধ্বংস করব। পরে সেই সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবে সিটি করপোরেশন। মোট কথা ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলোকে বাজেয়াপ্ত করে সিটি করপোরেশনে হস্তান্তর করা হবে, সিটি করপোরেশন সেটা ডাম্পিং ইয়ার্ডে রাখবে ধ্বংস এবং সেল বা নিষ্পত্তি করবে। 
৬০ শতাংশ বাসের মালিক গ্যারেজের মিস্ত্রি ॥ সভায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্র্যাপের বিষয়ে সমর্থন জানিয়ে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্র্যাপ করা হোক। তাহলে অন্য মালিকরা সতর্ক হবে। ঢাকা শহরের ৬০ শতাংশ বাসের মালিক গ্যারেজের মিস্ত্রি ও পরিবহনের কাজ করা লোক। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধের বিষয়ে মালিক সমিতি সব সময় সহায়তা করার জন্য প্রস্তুত আছে। শুধু মালিক সমিতিরে একা করলেই হবে না সবার একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে।
ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিক্সা নিষিদ্ধ ॥ সভায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিক্সা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ২২টি মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিক্সা নিষিদ্ধ করেছি। এখন থেকে ব্যাটারিচালিত কোনো রিক্সা বা গাড়ি যেন ঢাকা শহরে না চলে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, চলতে যেন না পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে।

দেখা যাচ্ছে হাইওয়েতে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহন বেশি চলছে। এগুলোর জন্য সবচাইতে বেশি দুর্ঘটনা হচ্ছে। এখন দুর্ঘটনা কম মনে হলেও হতাহত বেশি হচ্ছে। একটা বাসের সঙ্গে যদি মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়, সে মোটরসাইকেলের দুজনই নিহত হন। ইজিবাইকেও ৯/১০ জন থাকে। ড্রাইভারসহ সবার মৃত্যু ঘটে। হতাহতের সংখ্যা বেশি হলেও দুর্ঘটনা কমে গেছে। আমরা যে স্পিড লিমিট করেছি, সেটা কাজে আসবে।
সভায় মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘ভয়াবহ ব্যাপার যখন রিক্সাচালকরা দুই পা ওপরে তুলে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। অনেক প্রতিবন্ধী আছেন যারা চোখে কিছুটা কম দেখেন তারাও এই রিক্সা নিয়ে নেমে পড়েন।’ ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সিদ্ধান্তে আসা দরকার যে ঢাকায় ইজি বা অটোরিক্সা চলবে না। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।’
‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ ॥ শুধু ঢাকা শহরে নয়, সারাদেশে কোথাও হেলমেট ছাড়া বাইকারদের যেন তেল দেওয়া না হয় বুধবার থেকেই তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘ঢাকা সিটিতে মোটরসাইকেল অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করেছি। এখানে হেলমেট ছাড়া সাধারণত দেখা যায় না।

সবাই হেলমেট পরে। আমরা যে কৌশলটা নিয়েছি তা মফস্বলেও চালু করেন। ডিসি এসপি সাহেবদের বলেন যে ওইসব জায়গাতেও কাউকে তেল দেওয়া হবে না, যদি হেলমেট না থাকে। ‘আজ সিদ্ধান্তই নিলাম। শুধু ঢাকা শহর করলে হবে না। পুরো বাংলাদেশ করতে হবে। ‘নো হেলমেট নো ফুয়েল’ এই নীতিতে আমরা যাব। এই সিদ্ধান্তই আজ নিলাম।’

হাইওয়েতে মোটরসাইকেল চলাচল কমাতে স্পিড লিমিট কাজে আসবে বলে মন্তব্য করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে গতিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছি তা আগামীতে কাজে আসবে। ইদানীং হাইওয়েতে মোটরসাইকেল ইজিবাইকসহ তিন চাকার গাড়িগুলোর জন্য বেশি দুর্ঘটনা হয়ে থাকে।’
সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তফা কামাল, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

×