ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১

শেখ হাসিনা ও পুতিনের ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে আজ হস্তান্তর

পরমাণু যুগে দেশ

স্বপ্না চক্রবর্তী, রূপপুর (পাবনা) থেকে

প্রকাশিত: ২৩:৫২, ৪ অক্টোবর ২০২৩; আপডেট: ১০:৩৪, ৫ অক্টোবর ২০২৩

পরমাণু যুগে দেশ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি

এমন স্বপ্নও বাস্তব হবে তা কল্পনা কেউ করেনি। শেখ হাসিনা সরকার তা বাস্তবে রূপ দিল। নানা বাধা উপেক্ষা করে সম্পন্ন হওয়ার পথে দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ। প্রথম ইউনিটের ভৌত এবং অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়ে গেছে ৯০ শতাংশের বেশি। আর দ্বিতীয় ইউনিটের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ।

দেশে পৌঁছে গেছে এর জ্বালানি ইউরেনিয়ামও। আজ বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির  পুতিনের ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে হবে এর আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর। আর এর মাধ্যমেই দেশে শুরু হবে পারমাণবিক যুগের সূত্রপাত। ঐতিহাসিক এই কমিশনিংয়ের মধ্য দিয়ে ইউরেনিয়াম জ্বালানির যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ, গড়বে নতুন ইতিহাস।


এটিকে স্মার্ট বাংলাদেশের শুভ সূচনা বলেও দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজের ওপর নির্ভর করে আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনা করছে সরকার। আর এর জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে সব ধরনের নিরাপত্তা। 
১৯৬১ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সেই সময়কার সরকার। ১৯৬৮ সাল নাগাদ জমি অধিগ্রহণসহ বেশকিছু কাজ আংশিক সম্পন্নও হয়। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল ঢেউ শুরু হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়।

স্বাধীনতার পরে ফের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের উদ্যোগ নেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার। এরপর নানা সীমাবদ্ধতায় এর কাজ আর বেশিদূর না এগোলেও ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় এলে গতি পায় প্রকল্পে। ২০০৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করলে চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শুরু হয়। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদী তীরবর্তী রূপপুর এলাকাকে একাধিক সমীক্ষার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের যথার্থতা যাচাই-বাছাইয়ের পর শুরু হয় এর নির্মাণ কাজ


এক হাজার ৬২ একর জমির ওপর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমি উন্নয়ন, অফিস, রেস্ট হাউজ, বৈদ্যুতিক সাব- স্টেশন ও কিছু আবাসিক ইউনিটের নির্মাণ প্রায় শেষের পথে জানিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান জনকণ্ঠকে বলেন, ১৯৯৭-২০০০ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার উদ্যোগে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ সময়ে মানবসম্পদ উন্নয়নসহ কিছু প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।


আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। দলটি ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবে রূপ দিয়েছে। পরে ২০০৯ সালে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে অপরিহার্য কার্যাবলী সম্পাদন’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রাথমিক সব কাজ এবং পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়।

২০০৯ সালের ১৩ মে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রুশ ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটোম) মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। পরে ২০১০ সালের ২১ মে বাংলাদেশ এবং রাশিয়া সরকারের মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়। 


প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ড. ইয়াফেস ওসমান বুধবার প্রকল্প এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একটি জাতীয় কমিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর সভাপতিত্বে কারিগরি কমিটি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ ও আটটি সাবগ্রুপ গঠন করা হয়। যারা সার্বক্ষণিক এর নির্মাণকাজের তদারকি করেন। এর মধ্য দিয়ে নিউক্লিয়ার ক্লাবের ৩৩তম গর্বিত সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

ইতোমধ্যেই রূপপুরে পৌঁছে গেছে আংশিক ইউরেনিয়াম রড।
মন্ত্রী বলেন, আসলে সাতটি বছর নিরলসভাবে কাজ করা হয়েছে। রুশ বন্ধুরা বলেছে, এটা পৃথিবীর সেরা হবে। আমরা তার নজির দেখতে পাচ্ছি। করোনার সময়েও কাজ ব্যাহত হয়নি। সাংবাদিক বন্ধুসহ সারাদেশের মানুষ সহায়তা করেছেন। আমাদের প্রকৌশলীরা এবং মালামাল রুশদের কাছে পরীক্ষা দিয়ে এ গ্রেড পেয়েছে।


তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। ফরাসি ও রুশদের সঙ্গে কথা শুরু করেছিলেন। তার কন্যার হাত ধরে সফল হলো বাংলাদেশ। আমরা এখন নিউক্লিয়ার ক্লাবের গর্বিত সদস্য। আমরা সাড়ে ছয় বছরে এর চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছে গেছি। বিশ্বে আর কোথাও সাত-আট বছরে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের রেকর্ড নেই। কোথাও কোথাও পনেরো বছর সময় লেগেছে। সত্যিকার অর্থে প্রধানমন্ত্রীর নজর থাকায় কাজটি শেষ করতে পেরেছি। 


শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্বদানকারী এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর এর নির্মাণের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জনকণ্ঠকে বলেন, ২০১০ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক ইউকিয়া আমানো বাংলাদেশ সফর করেন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে আইএইএ থেকে সবধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।

২০১১ সালের ৯ থেকে ১৫ নভেম্বর সময়ে বাংলাদেশের পারমাণবিক অবকাঠামোর সার্বিক অবস্থা মূল্যায়নের জন্য আইএইএ ইন্টিগ্রেটেড নিউক্লিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার রিভিউ (আইএনআইআর) মিশন পরিচালিত হয়। ২০১১ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশ এবং রাশিয়া সরকারের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০১২ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অ্যাক্ট-২০১২ পাস করা হয়।


২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পাদনের জন্য স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। স্বাক্ষরিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি (আইজিএ) এবং স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট এগ্রিমেন্টের ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপারেটিং অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বিধান সংবলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আইন, ২০১৫ জারি করা হয়। ১৮ আগস্ট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) গঠন করা হয়। ২৫ ডিসেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায়ের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 


২০১৬ সালের ১০ থেকে ১৪ মে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পারমাণবিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আইএইএ-এর সুপারিশ বাস্তবায়ন অগ্রগতি রিভিউ করার জন্য ফলোআপ মিশন পরিচালনা করা হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালের ২১ জুন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাইট লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ২৬ জুলাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল পর্যায়ের কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।


রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিষয়ে রুশ ফেডারেশন ও বাংলাদেশ পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট কোঅর্ডিনেটিং কমিটি (জেসিসি)-এর একটি সভা ২০১৬ সালের ২২ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জ্বালানি সরবরাহ, জ্বালানির ব্যবস্থাপনা, অপারেশন ও মেনটেন্যান্স সংক্রান্ত চুক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরে ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় ফিরিয়ে নিতে 


পারস্পরিক সহায়তা’ সংক্রান্ত একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৭ সালের এপ্রিলে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার এবং গ্লোবাল সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার এনার্জি পার্টনারশিপ (জিসিএনইপি), ভারতের পরমাণু শক্তি সংস্থা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে।


আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক ইউকিয়া আমানো ২০১৭ সালের ৩ জুলাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি এ কেন্দ্র স্থাপনে সব আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণ করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও রুশ ফেডারেশনের সঙ্গে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট এক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। 
২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অনুকূলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। 


২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাই প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পথে পা দেয় এবং দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ ক্লাবে পদার্পণ করে।


ড. শৌকত আকবর বলেন, আমি শুরু থেকেই এই কেন্দ্রের কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে যখন আমরা এই কেন্দ্র সম্পর্কে বলতাম যে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করব। তারা হাসত। অথচ আজ আমরা সফল। আমাদের এই কেন্দ্রে ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর এবং ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিপাত্র বা রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উভয় অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাবনার ঈশ্বরদীতে যুক্ত হন তিনি। যা ছিল আমাদের জন্য প্রথম মাইলফক। পরে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছায় এর জ্বালানিও। এখন আমরা গর্ব করে বলতে পারি আমরা এখন পরমাণু শক্তির দেশ।
তিনি বলেন, আজ বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের কাছে এই ইউরেনিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করবেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা

রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেস্কি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকবেন। আরও যুক্ত থাকবেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি। এর মাধ্যমে এক নতুন যুগের সূচনা হবে বলে আমরা মনে করছি।


জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি হবে ২ শতাংশ ॥ রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরু হলে জিডিপিতে ২ শতাংশ অবদান রাখবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। মন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের শুরুতে জনগণ রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাবে। উত্তরবঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগণ এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হবে।


তিনি বলেন, সঞ্চালন লাইনসহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পরই পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে। মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের (আইএইএ) গভর্নিং বডির সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। 
প্রকল্প সূত্র জানায়, প্রকল্পে কর্মরত রুশ নাগরিকসহ বিদেশী নাগরিকরা গ্রিন সিটি আবাসনে থাকেন। গ্রিন সিটির ভেতরে তাদের জন্য নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই আয়োজন চলবে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত।


গ্রিন সিটির বিভিন্ন দেয়ালে শিল্পী টিপু সুলতানের চিত্রকর্ম পরিদর্শনকালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ৩৩তম পারমাণবিক দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। সেইসঙ্গে এই ধরনের টেকনোলজি নিয়ে কাজের সক্ষমতা অর্জন করেছি আমরা।


আগামী সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু ॥ এই কেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রসঙ্গে কিছুটা রহস্য করে উত্তর দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা মাত্র সাড়ে ৬ বছরে কাজ শেষ করেছি, এখন তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই। আমরা প্রস্তুত হলেই চলবে না, ট্রান্সমিশন লাইন লাগবে। দেড় বছর সময় লাগতে পারে, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে হবে। 
তবে পরমাণু বিজ্ঞানী ও প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর বলেন, বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের বড় একটি ভূমিকা রয়েছে। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছি, বিদ্যুৎ ভবনে যৌথসভা করেছি। সব ঠিকঠাক থাকলে আশা করছি আগামী সেপ্টেম্বরে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে পারব।


কাজের অগ্রগতি ॥ এর প্রথম ইউনিট ৯০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ইউনিটের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭০ শতাংশ হয়েছে জানিয়ে ড. শৌকত আকবর বলেন, দাপ্তরিক ভাষায় প্রথম ইউনিট থেকে দ্বিতীয় ইউনিট এক বছর পিছিয়ে থাকলেও আমরা ছয় মাসের ব্যবধানে রয়েছি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে। প্রথম ধাপে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। প্রথম ধাপের সফলতার পর ধাপে ধাপে ৫০ ও ৭০ শতাংশ এবং শেষ ধাপে পুরোপুরি উৎপাদনে যাবে। এই ধাপগুলো পার হতে সাধারণত ১০ মাস সময় লাগে। তবে প্রথম দিন থেকেই বিদ্যুতের সুবিধা পাবে জনগণ। সে কারণে সেপ্টেম্বরে চালু হচ্ছে এ কথা বলা যায়।


নিরাপত্তায় যত উদ্যোগ ॥ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে জনগণের মনে নানা ধরনের আতঙ্ক কাজ করলেও এর শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রকল্প পরিচালক জানান, এখানকার বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের ধাপে ধাপে অনুমোদন নিতে হয়েছে। মোট আটটি স্তর ছিল, প্রত্যেকটি স্তর থেকে পরবর্তী স্তরে যেতে আইএইএ অনুমোদন নিতে হয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষায় পাস করে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছে। এখানে ঘাটতির সুযোগ নেই।


তিনি বলেন, রেডিয়েশন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। রেডিয়েশনের মাত্রা মানুষের সহন ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। আমরা ২৩টি রেডিয়েশন স্টেশন চালু করব, সেখানে রেডিয়েশনের মাত্রা প্রদর্শিত হবে। যে কেউ দেখতে পারবেন। এসব স্টেশন ১৮ কিমি দূরে পর্যন্ত থাকবে। আমরা দেখেছি ১২.৫ কিলোমিটার দূরে মনিটরিংয়ের প্রয়োজন নেই। 


প্রশিক্ষিত জনবল ॥ এই কেন্দ্র দেশীয় জনবল দিয়েই একটা সময় পরিচালিত হবে জানিয়ে শৌকত আকবর বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত হয়েছে এবং সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে ইউরেনিয়াম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ৫ অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার ক্লাবের সদস্য হব। কমিশনিংয়ের প্রথম দিন থেকে আমাদের প্রশিক্ষিত জনবল যুক্ত থাকবে। তারপর আমরা ভেবে দেখব নিজেরা চালাতে পারব কিনা।
ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা ॥ ঋণ পরিশোধ সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক বলেন, দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের দুই বছর পর কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এ বিষয়ে ইয়াফেস ওসমান বলেন, সারাবিশ্বেই এখন নানা রকম সংকট চলছে। আমরাও কিছু মোকাবিলা করছি। এটি নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।


ইউরেনিয়াম ॥ গত ২৯ সেপ্টেম্বর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুরে নেওয়া হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জ্বালানি ইউরেনিয়াম রড। এর আগে রাশিয়ার একটি কারখানা থেকে একটি বিশেষ বিমানে করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পারমাণবিক জ্বালানির এই চালান আনা হয়। রাশিয়ার নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্টে (এনসিসিপি) এই জ্বালানি উৎপাদিত হয়। রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চুক্তিবদ্ধ রয়েছে রোসাটম।


উপকৃত হবে উত্তরবঙ্গের জনগণ ॥ এই কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে বেশি কারা উপকৃত হবে জানতে চাইলে ইয়াফেস ওসমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন পিছিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গের মানুষের সুবিধা যেন নিশ্চিত হয়। আমরা সেদিকে নজর রাখছি। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র আমাদের জন্য একটি মাইলফলক। যা বাস্তবায়নে সর্বশ্রেণির মানুষের সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাই সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।

×