ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

আছে আরও বহু প্রজাতির গাছ

যশোরে এক ছাদেই দুষ্প্রাপ্য ৩শ’ ৫০ শ্বেতচন্দন

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ০০:১৭, ২২ মার্চ ২০২৩

যশোরে এক ছাদেই দুষ্প্রাপ্য ৩শ’ ৫০ শ্বেতচন্দন

যশোরের বাগমারাপাড়ায় এক বাড়ির ছাদে ঔষধি গুণসম্পন্ন ৩৫০টি শ্বেতচন্দন গাছ

দেশে দুষ্প্রাপ্য হলেও যশোরের বাগমারাপাড়ায় এক বাড়ির ছাদে শোভা পাচ্ছে ঔষধি গুণসম্পন্ন ৩৫০টি শ্বেতচন্দন গাছ। সেখানে আরও আছে দেড় শতাধিক বট, পাকুড়, অ্যাডেনিয়াম, অশ্বত্থ, তেঁতুল, অর্জুন, সৌদি খেজুর, পলাশ, বাগানবিলাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।
 সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছাদে সবুজের সমারোহ। সেখানে ছোট বড় গামলা ও প্লেটে রাখা বিশেষ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট গাছ। বাড়ির ছাদে এমন দৃষ্টিনন্দন সবুজের সমারোহে বনসাই বাগান করেছেন সাজ্জাদ হোসেন (৪১)। সাজ্জাদ হোসেনের বাড়ি যশোর শহরের বাগমারাপাড়ায় (বিসমিল্লাহ গ্যারেজ)। একান্নবর্তী পরিবারের তিনটি বাড়ির ছাদে পাঁচ শতাধিক বনসাই রয়েছে তার।
সাজ্জাদ হোসেন জানান, বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বনসাইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর না এগোনোয় পারিবারিক সিদ্ধান্তে ২০০৭ সালে তিনি মালয়েশিয়া চলে যান। সেখানে তিনি এক চীনা নাগরিকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নান্দনিকভাবে সাজানো ১৭টি বনসাই দেখতে পান। সেগুলোর মধ্যে ছিল চায়না বট, তেঁতুল ইত্যাদি। বনসাইগুলো তাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেগুলো দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশে ফিরে বনসাই বাগান করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০১০ সালে সাজ্জাদ হোসেন দেশে ফিরে আসেন।
সাজ্জাদ বলেন, প্রথমে তিনি কিছু জমি লিজ নিয়ে স্ট্রবেরি ও সবজি চাষ শুরু করেন। কিন্তু ওই কাজে সফল হননি। ২০১৩ সালে জানুয়ারিতে বট, পাকুড় ও অশ্বত্থের চারা সংগ্রহ করে বনসাই বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি যশোর সদর উপজেলার বন বিভাগের ঝুমঝুমপুর এলাকার নার্সারি থেকে ১০টি শ্বেতচন্দনের চারা সংগ্রহ করেন। সেই ১০টি চারা থেকে আজ সাড়ে ৩শ’ শ্বেতচন্দনের গাছ শোভা পাচ্ছে তার ছাদ বাগানে। যে চারা তিনি নিজেই তৈরি করেছেন; এখনও করছেন।

বর্তমানে তার বাগানে ৮ বছর বয়সী ৪০টি, ৭ বছর বয়সী ৬০টি, ৬ বছর বয়সী ৬৫টি এবং ৪ বছর বয়সী ৭০টি শ্বেতচন্দনের বনসাই রয়েছে। এছাড়া তিন থেকে দুই বছর বয়সী আরও শতাধিক চারা রয়েছে। আট বছরের একটি শ্বেতচন্দন বৃক্ষের দাম দুই লাখ টাকার বেশি বলে জানান তিনি। বনসাই তৈরিতে সাজ্জাদ হোসেন কারও কাছে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেননি। শুরুর দিকে নিয়মিত যাতায়াত করতেন যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে। ঘেঁটেছেন এ সংক্রান্ত বই। এসব বই-পুস্তক ও ম্যাগাজিন থেকে বনসাই তৈরির প্রণালি, গাছের খাবার ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা নেন। সে অনুযায়ী তিনি নিজেই মাটি তৈরি করেন।
এ ছাড়া বাড়ির বারান্দায় ল্যাব তৈরি করেছেন সাজ্জাদ। এই ল্যাবে মাটি তৈরি করেন তিনি। বিভিন্ন উপাদান দিয়ে  তৈরি মাটিতে প্রথমে একটি গাছ এনে তিনি পরীক্ষা করেন। গাছে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করেন না। রোগবালাই দেখা দিলে মেহগনির পাতা পচানো পানির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে গাছে ছিটিয়ে দেন।
সাজ্জাদ হোসেন জানান, ‘গত সাত-আট বছর ধরে শ্বেতচন্দন গাছের বনসাই করে সফল হয়েছি। বর্তমানে নিজের বাড়ির জায়গায় বেশ কয়েকটি এ চন্দন গাছ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রোপণ করেছি; যা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে জমির অভাবে এ কাজ সফল হচ্ছে না। শ্বেতচন্দন এখন বিলুপ্তপ্রায়। আমি চেয়েছি, ঔষধি গুণের খনি ভেষজ শ্বেতচন্দন বৃক্ষটি মানুষের হাতের নাগালেই থাকুক।

তাই যদি অনুমতি পাই- সরকারি বিভিন্ন অফিস আদালতের অব্যবহৃত জায়গায় এ গাছ রোপণ করতে চাই। সেই রোপণ করা গাছসহ পরিচর্যার দায়িত্ব তিনিই নেবেন। এ গাছ থেকে সরকার আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারবে বলেও তিনি জানান। সাজ্জাদ বলেন, ‘গাছের বয়স ২০ হলেই প্রায় পরিণত এই গাছ ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি কাঠ দেবে। মাটির উপরের ভাগের কাঠের বর্তমান দাম প্রতিকেজি ১৫ হাজার টাকা। গাছের বয়স ২০ বছর পার হলে আরও বেশি দাম পাওয়া সম্ভব।

সাবেক ফরেস্ট রেঞ্জার বৃক্ষপ্রেমী বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুল বলেন, এই ছাদ বাগান দেখলে অনেকেই শ্বেতচন্দন গাছ রোপণের আগ্রহ জন্মাবে। সাজ্জাদ হোসেনের এ উদ্যোগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে তিনি জানান। সামাজিক বন বিভাগ যশোর অঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক অমিতা ম-ল জানান, ‘চন্দন কাঠের চাষ বেশ লাভজনক, উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো; আমাদের দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর বেশ চাহিদা রয়েছে।

সেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজো এর চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। চন্দন কাঠের চাষে আপনাকে যে পরিমাণ অর্থব্যয় করতে হবে, তার বহুগুণ বেশি অর্থ আপনি উপার্জন করতে পারবেন। অর্থাৎ এটি বেশ লাভজনক। তবে এর জন্য আপনাকে কমপক্ষে ১৫-২০ বছর দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে। এতে ব্যয় হয় প্রায় এক লাখ টাকা এবং এতে মুনাফা হয় ৬০ লাখ থেকে  এক কোটি টাকা পর্যন্ত। শ্বেত চন্দন গাছগুলোকে চিরসবুজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর থেকে উৎপাদিত তেল এবং কাঠ ঔষধ তৈরি করতেও ব্যবহৃত হয়। শ্বেতচন্দন কাঠের তেল সাবান, প্রসাধনী এবং আতর সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

×