ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১

বাগেরহাটে জমিসহ ঘর পাচ্ছেন ৬৯৬ পরিবার

ভাসমান মানুষগুলোর মুখে নতুন সূর্যের ঝলমলে হাসি

বাবুল সরদার, বাগেরহাট

প্রকাশিত: ১৮:১১, ২০ মার্চ ২০২৩

ভাসমান মানুষগুলোর মুখে নতুন সূর্যের ঝলমলে হাসি

আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাঁই পাওয়া মানুষদের মুখে আনন্দের ঝিলিক

‘এক গাছেরই ছায়ায় ঢাকে, সব উঠানের বুক, খুশির সুরে সব বাড়িতেই একই মধুর সুখ,..অমূল্য যে মাটির জমিন স্বাধীন করলেন পিতা, কন্যা জুড়লেন সোনার খনি, আশ্রয় দিলেন সেথা..।’ বিশ্বের বুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত আশ্রয়ণ প্রকল্পে উপকূলীয় বাগেরহাট জেলায় মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ৪র্থ পর্যায়ে ভাসমান ভূমিহীন আরও ৬’শ ৯৬টি পরিবার জায়গাসহ দৃষ্টিনন্দন বাড়ি পাচ্ছেন। এ পরিবার গুলোর অধিকাংশ ছিল ‘অতি দরিদ্র সীমার নীচে’।

বাসস্থানের মৌলিক অধিকার ছিল না তাদের। এখন তারাই জায়গার মালিক হচ্ছেন, বাড়ির মালিক হচ্ছেন। একই সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান করা হচ্ছে। এমন অধরা স্বপ্নপূরণের আনন্দ-অশ্রু এখন তাদের চোখে। মুখে নতুন সূর্যের ঝলমলে হাসি।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয়েছে স্বামী হারা নাসিমা বেগমের। তার একটি মেয়ে। যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে কাজ করতেন। রাত হলে প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে ঘুমাতেন আড়পাড়া বাজারে। আর সকালে বাজার ঝাড়ু দিতেন। বাবা সেকেল উদ্দিন মারা যাওয়ার পর নিদারুণ মানবিক জীবন-যাপন ছিল তার নিত্য সঙ্গী। তিনি জায়গাসহ বাড়ি পাচ্ছেন সদর উপজেলার ‘আড়পাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে’। 

সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার রুবাইয়া তাছমিন রবিবার বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করে এ খবর বলতে নাসিমা বেগম হতবাক। যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। এক সময় তিনি আত্মহারা আনন্দে কেঁদে দেন। প্রতিবন্ধী মেয়েকে জড়িয়ে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য দোয়া করতে থাকেন।    

অনুরূপ তিন সন্তানের জননী শারিরীক প্রতিবন্ধী আকলিমা বেগম প্রায় ভিক্ষা করে চলতেন। আশ্রয়হীন তিনি আজ এখানে তো কাল সেখানে থাকতেন। থাকা খাওয়ার যন্ত্রণা সইতে না পেরে বড় ছেলে কুদ্দুস কৈশরে চলে গেছে চট্রগামে। সেখানে কোন এক হোটেলে বয়ের কাজ করে। আর দুই মেয়ে হামিদা ও খাদিজাকে নিয়ে তিনি থাকতেন খাল পাড়ে বাগানের পাশে তাল পাতা আর পলিথিনে মোড়ানো ঘরে। আকলিমা  বেগম এলজিইডির অধীনে সড়কে দিন মজুরের কাজ করেন। আর মেয়ে হামিদা এ বাড়ি ও বাড়ি, কখনও ধান ছাঁটাই মিলে আবার বাজারে কাজ। ছোট মেয়ে খাদিজা একটি প্রইমারী স্কুলে পড়ে। তবে সে প্রায়শই পুষ্টিহীনতায় অসুস্থ থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন শুনলেন তার নামে ঘর বরাদ্দ হইছে। তিনি জায়গাসহ বাড়ি পাচ্ছেন বাগেরহাট সদর উপজেলার লাউপালা আশ্রয়ণ প্রকল্পে।  

তার ভাষায়, ওই নায়েব সাহেব নাম নিছিলো। শুনলাম, প্রধানমন্ত্রী জায়গা দেবে, ঘর দেবে। কি আশ্চার্য, আল্লার খেলা বুঝা দায়। .. বলতে বলতে অকল্পনীয় স্বপ্নপুরণের আনন্দে তিনি কেঁদে দিয়ে দু’হাত তুলে আল্লাহ্র কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা জন্য দোয়া মোনাজাত করেন।  
    
সুন্দরবন সংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার গনি হওলাদার মৎস্যজীবী। থাকতেন ভোলা নদীর বাঁধের ভেতরে ভাঙ্গাচোরা টিন আর গোলপাতার ঝুপড়িতে। কয়েক মাস আগে রোগে ভুগে বৌ মারা গেছেন। ছেলে-মেয়ে ৫ জন। তিনিও স্বাভাবিক কাজের শক্তি হারিয়েছেন। নিদারুণ কষ্টে ছিলেন। জীবন যেন তার কাছে বোঝা মনে হচ্ছিল। তিনি জানালেন, শরণখোলার ইউএনও স্যারের অফিসের এক লোক এসে আমার নাম নিয়ে যায়। এরপর ইউএনও নূর-ই আলম সিদ্দিকী নিজে আসেন। সব কথা শুনে-দেখে বলেন, আপনাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জায়গাসহ পাকা বাড়ি দেবেন।..’

একথা শুনে গণি হওলাদার প্রথমে ফ্যাকাশে হাসি দেন। যেন বিশ^াস করতে পাছিলেন না। এরপর কাঁধে হাত রেখে ইউএনও আবার তাকে নিশ্চিত করলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে দু’হাত তুলে আল্লাহ্র কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা জন্য দোয়া মোনাজাত করেন।

অনুরূপ ৪ সন্তান নিয়ে স্বামীহারা হনুফা বেগমের  বা’ রাস্তার পাশে বছরের পর বছর রাত কাঠানো অনিমেষ মন্ডলের ভাসমান জীবনের গল্প শুনলে যে কোন মানবিক মানুষের চোখ ভিজে যায়। এদের কারো কারো জীবন-গাঁথা “পথের পাঁচালির অপুর সংসার’’ বা “পাষন্ড পন্ডিত’ এর মতো মর্মস্পশি সিনেমার কাহিনীকেও যেন হার মানায়।

আজ সেই ভাসমান মানুষ গুলোর মুখে যেন নতুন সূর্যের ঝলমলে হাসি। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি আসলেই রূপকথাকেও হার মানাচ্ছে। যার রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২২ মার্চ বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের জমি-বাড়ি উপহার দেবেন। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সরেজমিনে আশ্রয়নের এসব ঘর পরিদর্শন শেষে তার সন্মেলন কক্ষে সোমবার দুপুরে (২০ মার্চ) প্রেস ব্রিফিং করেন।

তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, এ জেলায় মোট ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের সংখ্যা ৬ হাজার ২৬৭ টি। ১ম, ২য়, ৩য় পর্যায়ে জমিসহ বাড়ি দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ২৫৪ পি পরিবারকে। ৪র্থ ধাপে ২২ মার্চ বুধবার এ জেলার আরও ৬’শ৯৬ টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়ে কবুলিয়ত, জমির খতিয়ান, গৃহ প্রদানের সনদসহ বাড়ি হস্থান্তর করবেন। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘আশ্রয়ন প্রকল্প’ পৃথিবীতে অতূতপূর্ব মানবিক দৃষ্টান্তের মডেল হিসেবে চীর স্মরণীয় হয়ে থাকবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র মুখ্য সচিব মো: তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পের জমিসহ বাড়ি দেওয়া এবং এ প্রকল্পের বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে সমন্বিত কার্যক্রমের ফলে অতি দরিদ্রের হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। যা এসডিজির লক্ষ্যমাত্র পূরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ৪র্থ পর্যায়ে এদিন(২২ মার্চ) বুধবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাগেরহাটসহ সারা দেশে মোট ৩৭ হাজার ৭’শ ৮৯ টি গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ বাড়ি উপহার দেবেন।

বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অরবিন্দ বিশ্বাস জানান, ৪র্থ পর্যায়ে জেলার সদর উপজেলার ২টি আশ্রয়ন প্রকল্পে ৪৪ টি, কচুয়া উপজেলার ২ টি আশ্রয়ন প্রকল্পে ১০ টি, মোল্লহাট উপজেলার ৩ টি আশ্রয়নে ৮৩ টি, ফকিরহাট উপজেলার ৪ টি আশ্রয়ন প্রকল্পে ৭৫ পি, মোংলা উপজেলায় ২ টি আশ্রয়ন প্রকল্পে ২২০ টি, রামপাল উপজেলায় ২০ টি, মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ৪ পি আশ্রয়নে ১৩৭ টি, শরণখোলার ৭৫ টি এবং চিতলমারী উপজেলায় ৩২ টি পরিবারকে এদিন  প্রধানমন্ত্রী জায়গাসহ বাড়ি হস্থান্তর করবেন।  
  
সরেজমিনে রামপাল ও চিতলমারী উপজেলায় একাধিক আশ্রয়নে গিয়ে দেখা যায়, ইতোমধ্যে জায়গাসহ বাড়ি পাওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতিরা বাস করছেন রঙিন টিন আর পাকা দেয়ালের আধাপাকা বাড়িতে। সেখানেই করছেন শাক-সবজির আবাদ। কেউবা হাঁস-মুরগি, ছাগল-গরু পালন করছেন। সন্তানদের পাঠাচ্ছেন স্কুলে। আশ্রয়হীন ভাসমান মানুষ গুলো বসবাসের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া এই সুবিধাটি পেয়ে তাঁদের সবার মুখে এখন নতুন সূর্যের ঝলমলে হাসি। এখন আর সেই দুঃশ্চিন্তা নেই।
আশ্রয়নে ঠিকানা পাওয়া হানুফা বেগম এর সাথে কথা বলতে গেলে প্রথমেই হেসে ওঠেন। 

তারপর বলেন, আগো তো কেউ মানুষ মনে করত না। রাস্তায় রাস্তায় থাকতাম। এখন নিজের ঠিকানা পেয়েছি। নিজেরা কৃষি করছি, হাঁস-মুরগি পালন করছি। সত্যই এটা স্বপ্নের চেয়ে বেশি।

 এসআর

×