ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯

সারের কৃত্রিম সংকটে হতাশ ঠাকুরগাঁওয়ের চাষিরা 

নিজস্ব সংবাদদাতা, ঠাকুরগাঁও 

প্রকাশিত: ১৮:০০, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

সারের কৃত্রিম সংকটে হতাশ ঠাকুরগাঁওয়ের চাষিরা 

সারের সংকট

কৃষি নির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁও। এই জেলায় এবার তুলনামূলক আমন মৌসুমে বৃষ্টি-পাতের পরিমাণ কম হওয়ায় শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে ধান রোপন করায় কৃষকদের খরচ বেড়েছে। সেই সঙ্গে কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দেওয়ায় বেশি দাম দিয়েও পাচ্ছেন না তারা। ফলে চরম হতাশ ও অনিশ্চয়তা ভুগছেন জেলার চাষিরা।

জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে সার সংকটের অজুহাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দামে এমওপি, টিএসপি ও ডিএপি সার ক্রয় করায় চলতি আমন মৌসুমে ধানের উৎপাদন খরচ বেশি হচ্ছে। আমন রোপনের প্রথম ধাপে বেশি দাম দিয়ে অল্পস্বল্প সার পেলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে কৃষকরা সারই পাননি। এছাড়া অতিরিক্ত টাকা দিয়েও এমওপি ও টিএসপি সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের। 

সদর উপজেলার রামপুর গ্রামের কৃষক সোলায়মান আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘ডিলারদের কাছে সার কিনতে গেলে বলে সার নাই। আমরা সার ছাড়া কীভাবে চাষাবাদ করবো।

আব্দুল খালেক নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা পটাশ (এমওপি) সার খুচরা বাজারে কিনতে গেলে এক হাজার ৮০০ টাকা ও ইউরিয়া এক হাজার ৪০০ টাকা নিচ্ছে। তাও আবার প্রথম ধাপে সার পেলেও এখন বেশি দামেও সার পাচ্ছি না। 

ডিলাররা বলছেন, সরকারের নির্ধারিত দামেই তারা সার বিক্রয় করছেন ও স্থানীয় কিছু কিছু খুচরা সার বিক্রেতারা ডিলাদের কাছে সার না পেয়ে বিক্রয় বন্ধ রেখেছেন। ফলে কৃষকদের সার দিতে পারছেন না।

সারের দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে পীরগঞ্জ উপজেলার বিসিআইসি’র সার ডিলারের প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সরকারের নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি করছি।

সদর উপজেলার শিবগঞ্জ বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা আলম বলেন, ‘আমি প্রায় গত দুইমাস থেকে পাচ্ছি না, তাই দোকানে কৃষকরা সারের জন্য ভীড় করলেও এক কেজি সারও দিতে পারছি না। আমন ধানের জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রাসায়নিক সার দিতে না পেরে ফলন কম হওয়ার আশঙ্কায় হতাশ কৃষকরা।

এদিকে বিএডিসি’র ডিলাররা বলছেন, ‘চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এমওপি সারের কোনো বরাদ্দ না পাওয়ায় কৃষককে সার দিতে পারছিনা।’ অন্যদিকে অভিযোগ করে ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া হাটের বিএডিসি’র সার ডিলার ওহিদুল ইসলাম শাহ বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি ও ডিএপি সারের বরাদ্দ দিলেও আমরা এমওপি (পটাশ) সারের কোনো বরাদ্দ পাইনি। তাই কৃষককেও পটাশ সার দিতে পারিনি।’

বাংলাদেশ ক্যামিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) শিবগঞ্জ ঠাকুরগাঁও বাফারগুদাম কার্যালয়ের তথ্য মতে, জেলায় বিসিআইসি’র মোট ৬৩ জন সারের ডিলার রয়েছে। বর্তমানে এই গুদামে ইউরিয়া সারের মজুদ আছে সাড়ে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন। চলতি বছরের চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বরাদ্দকৃত ইউরিয়া সার তিন হাজার ৭২৪ মেট্রিক টনের মধ্যে তিন হাজার ১০০ মেট্রিক টন সার বিতরণ করা হয়েছে। 

ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ বিএডিসি’র উপ-সহকারী পরিচালক (সার) কার্যালয়ের সূত্র মতে, জেলায় বিএডিসি’র সার ডিলার মোট ১৪৯ জন। চলতি বছরের চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ৯৬৭ মেট্রিক টন টিএসপি ও এক হাজার ৪৬ টন ডিএপি বরাদ্দকৃত সারের মধ্যে টিএসপি মজুদ আছে ৩৪১ দশমিক ৪৫ ও ডিএপি ৫৯১.০৫ মেট্রিক টন। সেপ্টেম্বর মাসে এমওপি সারের বরাদ্দ থাকলেও গত ১৯ তারিখ পর্যন্ত এমওপি সার গুদামে ছিল না। কিন্তু ২০ সেপ্টেম্বরে এই গুদামে এমওপি সার মজুদ হয় ১৬৯ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন।

ঠাকুরগাঁওয়ের শিবগঞ্জ বিএডিসি’র উপ-সহকারী পরিচালক (সার) জিল্লুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেপ্টেম্বর মাসের বেশ কিছুদিন এমওপি সার ছিল না, তবে পরে এসেছে। কৃষিমন্ত্রণালয় থেকে ডিলারদের বরাদ্দ দিলে তাদের এমওপি সার দিতে পারবেন।’

জেলা কৃষিসম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, জেলায় এবার আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হলেও ১০ হেক্টর বেশি জমিতে অর্থাৎ এক লাখ ৩৭ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. আব্দুল আজিজ জানান, পরিবহনের জন্য এমওপি সার সময় মতো আসতে না পারায় কিছুটা সংকট দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এখন এমওপিসহ সকল প্রকার সার পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুদ আছে বলে জানান তিনি।

এদিকে সময় মতো সার না পাওয়া আমন ধানের ফলনসহ আগাম সবজি নিয়ে হতাশ ও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন বলে জানান সদর উপজেলার কৃষক ইউসুফ আলী ও আল আমীন। তারা বলেন, ‘সারের অভাবে ধানের গাছের চেহারা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোথাও সার পাচ্ছি না। এভাবে সার না পেলে আমরা চাষাবাদ কেমন করে করবো। আর কিছুদিন গেলেই আবার আলু লাগাতে হবে। আলুতে তো আরও বেশি সার লাগবে বিশেষ করে পটাশ, ইউরিয়া ও টিএসপি। কিন্তু পটাশ ও টিএসপি সার তো এখনি পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে সার না পেলে চাষাবাদ বন্ধ করে দিতে হবে। জ্বলানি তেলসহ সারের দাম অতিরিক্ত বেড়েছে। আমরা কৃষকরা কাকে কি বলবো। আমাদের কথা কে শুনবে? সরকারকে বিনীত অনুরোধ করছি যে আমাদের কৃষকদের কম দামে ও সময় মতো যেন সরকার সার সরবরাহের ব্যবস্থা করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ড. আব্দুল আজিজ জানান, জেলায় সবজি ও আলু চাষের জন্যেও পর্যাপ্ত পরিমাণে সার মজুদ আছে। তাই কৃষকদের অধৈর্য না হওয়ার পরার্শ দেন তিনি।

এমএইচ

সম্পর্কিত বিষয়: