২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক দশক ॥ বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০২০
  • বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে ২৫ মার্চ, ২০২০ পূর্ণ হয়েছে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের সফল বাস্তবায়ন- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার এক দশক পূর্তি। ২০১৭ থেকে সংসদে গৃহীত সর্বসম্মত প্রস্তাবের নিরিখে ২৫ মার্চ পালিত হয় গণহত্যা দিবস হিসেবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দখলদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় কুখ্যাত সহযোগী বাহিনী রাজাকার, আলবদর এবং আলশামস্ কর্তৃক ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটসহ বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটন দেশে-বিদেশে সকলেরই জানা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব বর্বর অপরাধ সংঘটনে যেসব ব্যক্তি অংশ নিয়েছিল এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করেছিল এবং উস্কানি ও প্ররোচনা দিয়েছিল তাদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালে ২৪ জানুয়ারী ‘দ্য বাংলাদেশ কোলাবরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২’ প্রণয়ন করে রাষ্ট্রপতির ৮ নং আদেশের মাধ্যমে জারি করা হয়। এই আইনটি দালাল আইন, ১৯৭২ হিসেবে পরিচিত ছিল। দালাল আইনের অধীনে প্রায় ৩৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনালে বিচারের আওতায় আনা হয়। ঐ আইনটি বলবত থাকা সত্ত্বেও ১৭ জুলাই ১৯৭৩-এ তৎকালীন আইনমন্ত্রী শ্রী মনোরঞ্জন ধর জাতীয় সংসদে ‘দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) বিল, ১৯৭৩’ সংসদের বিবেচনার জন্য উত্থাপন করেন। বিলটি উত্থাপনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্ত্রী উল্লেখ করেছিলেন- ‘গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীন সংঘটিত অন্যান্য অপরাধে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের আটক, বিচারে সোপর্দ করা এবং দ-দানের উদ্দেশ্যে বিধিবিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন।’

উক্ত বিলটি উত্থাপনের পরে বিলটির ওপর রিপোর্ট পেশের জন্য বাছাই কমিটিতে প্রেরণ করার প্রস্তাব করা হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাননীয় সংসদ সদস্য বিলটির ওপর ব্যাপক আলোচনা ও মতামত প্রদান করেন এবং ওই দিনই বিলটি সর্বসম্মতভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়।

এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেয়া বেতার ও টিভি ভাষণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ঘোষনা দিয়ে বলেছিলেন- ‘তারা (যুদ্ধাপরাধী) মানবিকতাকে লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে বিচার হবে।’ এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন সদা উচ্চকিত ও দৃঢ়। স্বজন হারানোদের ক্ষত তিনি অনুভব করতেন।

‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পরে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায়। সামরিক শাসনের নামে মূলত স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। পদদলিত হতে থাকে সংবিধান, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। ১৯৭৩ সালের আইনটিও থেকে যায় নীরব। দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত কয়েক হাজার অপরাধীকে রাতারাতি ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৭২ সালের কোলাবরেটরস অর্ডার করা হয় বিলুপ্ত। শুরু হয় স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীসমূহ ও ’৭১-এর গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট-অগ্নিসংযোগ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও প্রতিষ্ঠা করা । এ তৎপরতা অব্যাহত থাকে ১৯৯৫ পর্যন্ত।

১৯৯৬-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার গঠিত হলে স্বাধীনতা বিরোধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ধারা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। ওই সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচার করাটাই স্বাভাবিকভাবেই ছিল সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। নানা আইনী ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বিচারিক আদালতে এবং ডেথ রেফারেন্সসমূহ হাইকোর্ট বিভাগে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পুনরায় ক্ষমতায় এলে আপীল বিভাগে আটকে যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ।

২০০৮-এর নির্বাচনে পুনরায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ অর্থাৎ আপীল বিভাগে থেমে থাকা বিচার প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে শেষ হয় এবং পলাতক ব্যতীত অন্যান্য দোষী সাব্যস্ত খুনীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়।

২০০৮-এর নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ’৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এই অঙ্গীকারের সূত্র ধরে ২৯ জানুয়ারি, ২০০৯ বৃহস্পতিবার নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের তৃতীয় বৈঠকে মাননীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী (সিলেট-৩) কর্তৃক উত্থাপিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাব -‘সংসদের অভিমত এই যে, দেশের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হউক’ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপরোক্ত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেনÑ

‘মাননীয় স্পীকার, আজকে যে প্রস্তাবটি এখানে এসেছে, তার ওপর যদিও মাননীয় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী তার জবাব দিয়েছেন। কিন্তু এখানে বিতর্ক দেখা দিয়েছে যে, কে এর উত্তর দেবে? আইনমন্ত্রী দেবেন, নাকি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী দেবেন, নাকি আমি প্রধানমন্ত্রী দেব। যিনিই দিন না কেন, আমার মনে হয়, সেটা কোন বড় বিষয় না। সবচেয়ে বড় হলো যে, (এটা ঠিকই বলেছেন) আজকে সারা দেশের দাবি, জাতির দাবি-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। আর এটা আমাদের অঙ্গীকার। এটা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা ঘোষণা দিয়েছি যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। আর এ বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই আমরা আলাপ-আলোচনা করেছি। এমনকি জাতিসংঘ প্রতিনিধি, ইউএনডিপির প্রতিনিধিসহ অনেকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আর বিভিন্ন দেশে যেভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে কিছু তথ্যও জোগাড় করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে যাঁরা এ ব্যাপারে কাজ করেছেন, তাঁদের বীঢ়বৎঃ ড়ঢ়রহরড়হ নেয়ারও কিছু ব্যবস্থা আমি ইতোমধ্যেই নিয়েছি। কয়েক এক্সপার্টের নামও আমার কাছে আছে এবং তাঁদের সঙ্গে আমরা যথাযথভাবে যোগাযোগ করে যাচ্ছি। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে যোগাযোগ করে যাচ্ছে। আপনি ’৭১-বিধির এই বিষয়টি কিভাবে নিষ্পন্ন করবেন জানি না। কিন্তু আমি এটা বলতে পারি যে, আমরা এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে পারি এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমরা অবশ্যই করব এবং সেই আশ^াস আমি দিতে পারি। অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে এবং এই প্রস্তাবটি আমি সমর্থন করছি।’

জাতীয় সংসদে গৃহীত ওই প্রস্তাবের পর শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনাল গঠন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট-১৯৭৩ (পরবর্তীতে আইন-১৯৭৩ হিসেবে উল্লেখ করা হবে)-এর ধারা ৩-এ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং বিচার্য অপরাধসমূহ বিবৃত আছে। ১৯৭৩ সালে আইনটি প্রণয়নের সময়ে ‘ব্যক্তি’ কিংবা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’-কে (গ্রুপ অব ইন্ডিভিজুয়ালস) বা ‘সংগঠনকে’-কে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ ছিল না। কিন্তু ২০০৯ সালে আইন ১৯৭৩-এর ধারা-৩ সংশোধন করে (২০০৯ সালের ৫৫ নং আইন) ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’ (গ্রুপ অব ইন্ডিভিজুয়াল)-কেও বিচারের এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালকে দেয়া হয়। ওই সংশোধনের ফলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্ঠি’-কে বিচারের আওতায় আনার বিধান সন্নিবেশিত হয়। ২০১৩ সালে অপর আর একটি সংশোধনীর মাধ্যমে (২০১৩ সালের ৩নং আইন) মানবতাবিরোধী বা যুদ্ধ অপরাধে জড়িত ‘সংগঠন’কেও বিচারের আওতায় আনার বিধান সংযুক্ত হয়।

জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা এবং আইন সংশোধনের মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটনে সম্পৃক্ত ‘ব্যক্তি’, ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’ এবং ‘সংগঠন’-কে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার কার্যক্রম বেগবান হয়। সরকার ২০১০ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের পূর্বক্ষণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচার কাজ শুরু হলেও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তদন্ত কাজ দ্রুত সমাপ্ত হয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হতে থাকলে ২২ মার্চ ২০১২ তারিখে আর একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মাত্র দশ বছরে উভয় ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি করেছে এবং বর্তমানে প্রাক-বিচার, বিচার পর্যায়ে রয়েছে ৩৪টি এবং রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ আছে একটি মামলা। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনাল-২ এর কার্যক্রম ১৫-০৯-২০১৫ তারিখ হতে স্থগিত রাখা হয়েছে।

গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অন্যান্য আদালত/এ্যাডহক/হাইব্রিড ট্রাইব্যুনালসমূহের তুলনায় আমাদের উভয় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দশ বছরে ৪১টি মামলা নিষ্পত্তি আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর মনে হলেও এটাই চরম সত্য ও বাস্তবতা। জাতীয়-আন্তর্জাতিক নানামুখী ও বহুরূপী চাপ ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এই অর্জন সম্ভব হয়েছে উভয় ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারকবৃন্দ, প্রসিকিউটরস ও তদন্ত সংস্থার অদম্য মনোবল, পরিশ্রম, অঙ্গীকার (পড়সসরঃসবহঃ) এবং রাষ্ট্রের সার্বিক সহযোগিতার কারণে। এটি উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে. ১৯৭১ এ সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিচার কার্যক্রম বন্ধ এবং বাধাগ্রস্ত করার জন্য সব রকম চেষ্টা- এমনকি বিপুল অর্থ ব্যয়ে আন্তর্জাতিক লবিস্টও নিয়োগ করেছিল।

এ কথা সত্য যে, ট্রাইব্যুনালের বিচারক, প্রসিকিউটরস ও তদন্ত কর্মকর্তাদের নিজ দেশীয় আইনে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহের বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব ধারণা ও পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। তবুও পরিস্থিতি সামলে নিয়ে বিবর্তিত আন্তর্জাতিক আইন বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সকল পক্ষই এগিয়ে গেছে দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে।

ট্রাইব্যুনালসমূহ এবং আপীল বিভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করতে গিয়ে আসামি পক্ষে উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু আইনী প্রশ্নের নিষ্পত্তি ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা করেছে। ওই সকল আইনী প্রশ্নের নিষ্পত্তি ও ব্যাখ্যা দেশীয় আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ বিচারের ক্ষেত্রে দেশে-বিদেশে উদাহারণ ও নজির সৃষ্টি করেছে, সমৃদ্ধ করেছে আন্তর্জাতিক আইন বিজ্ঞানকে।

মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক সর্বপ্রথম রায় প্রদান করা হয় অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদের মামলায়। অভিযুক্ত কালাম পলাতক থাকায় এ রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপীল হয়নি। ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক দ্বিতীয় রায়টি ছিল চীফ প্রসিকিউটর বনাম আব্দুল কাদের মোল্লা মামলায়। এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক অভিযুক্ত আব্দুল কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদ-ের সাজা প্রদান করা হয়। কিন্তু এই সাজা সরকার, ছাত্র-জনতা , ভুক্তভোগী কেউ গ্রহণ করতে পারেনি। কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-ের দাবিতে সৃষ্টি হয়েছিল ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় আন্দোলন-‘গণজাগরণ মঞ্চ’।

১৯৭৩ সালের আইনে কেবল সাজা ও খালাসের বিরুদ্ধে আপীলের বিধান ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত কোন সাজা বা দ-াদেশ ‘অপর্যাপ্ত’ বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপীলের কোন সুযোগ ছিল না। আমরা লক্ষ্য করব যে, জাতিসংঘ সমর্থিত এ্যাডহক ট্রাইব্যুনালগুলোতে অপ্রতুল সাজার বিরুদ্ধে আপীল চেম্বারে আপীলের বিধান রয়েছে। এমন একটি অবস্থায় এবং প্রবল জন প্রত্যাশার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে এবং একই সঙ্গে ‘সমান অধিকারের’ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসেই ১৯৭৩ সালের আইনের সংশোধনী আনা হয়। সরকার বা অভিযোগকারী বা এজাহারকারী কর্তৃক ‘অপর্যাপ্ত সাজার’ বিরুদ্ধে আপীল দায়েরের বিধান সন্নিবেশিত হয়। অতঃপর রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত দ-ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে আপীল দায়ের করে। দ- ও সাজার বিরুদ্ধে কাদের মোল্লা নিজেও আপীল দায়ের করে। উভয় আপীল একত্রে শুনানি হয় এবং একটি অভিন্ন রায়ের মাধ্যমে আপীল বিভাগ কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক নিষ্পত্তিকৃত অনেক আইনী ব্যাখ্যা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেছে।

আপীল বিভাগ দুটো আপীল একত্রে দীর্ঘ শুনানির পর নিষ্পত্তি করেন এবং ১৭.৯.২০১৩ তারিখে রায় প্রদান করেন। সাজাপ্রাপ্ত কাদের মোল্লার আপীল খারিজ করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে [৪:১] রাষ্ট্রপক্ষের আপীল মঞ্জুরপূর্বক বিচারিক ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত দ-াদেশ বৃদ্ধি করে ‘মৃত্যুদ-াদেশ’ প্রদান করা হয়।

আসামি পক্ষে উত্থাপিত আইনি প্রশ্ন প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন (পড়ঁংঃড়সধু রহঃবৎহধঃরড়হধষ ষধ)ি ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট-১৯৭৩’-এর অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালে প্রযোজ্যতা সম্পর্কে আপীল বিভাগ ৭ জন সিনিয়র আইনজীবীর মতামত গ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন সর্ব জনাব টিএইচ খান, রফিকুল হক, এম আমিরুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মামুদ, এএফ হাসান আরিফ এবং আজমামুল হোসাইন।

আসামি পক্ষের বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট আইনে যেহেতু মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি এবং বিচার প্রক্রিয়ার বিষয় সুনির্দিষ্ট নয় সেহেতু, ট্রাইব্যুনালকে ‘প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন’ অনুসরণ করতে হবে এবং বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসমূহ বিচারের এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের নেই। আপীল বিভাগ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ এবং আদালতকে সহায়তাকারী বিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার পর সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে :

ক) প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন যেহেতু দেশীয় আইনের অধীনে গঠিত কোন ট্রাইব্যুনাল গঠনকে বারিত করেনি সেহেতু আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারে সম্পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে;

খ) আইন-১৯৭৩-এর সঙ্গে প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনসমূহ কোনভাবেই বেমানান (ৎবঢ়ঁমহধহঃ) নয়;

গ) প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে আইন-১৯৭৩-এর কোন বিষয় সাংঘর্ষিক হলে আইন-১৯৭৩ প্রাধান্য পাবে;

ঘ) আইন-১৯৭৩ যেহেতু, সংবিধিবদ্ধ বা পূর্ণাঙ্গ আইন সেহেতু, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের, যেমন নুরেমবার্গ অথবা বলকান বিচার সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন হবে না।

উপরোক্তভাবে আপীল বিভাগ আইন-১৯৭৩ এবং দেশীয় আইনের অধীন গঠিত ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছে।

অভিযুক্তদের পক্ষে আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছিল যে, ১৯৭৪ সালে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে বিচার না করে পাকিস্তানে ফিরিয়ে দেয়ার পর আইন-১৯৭৩ অনুসারে কোন ব্যক্তির বিচার করার কোন সুযোগ নেই।

আপীল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, ১৯৭৪ সালে যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, ওই চুক্তিটি কোনভাবেই আইন-১৯৭৩-এর সমকক্ষ হতে পারে না বা আইনের কোন বিধানকে অকার্যকর, অক্ষম বা বাতিল হতে পারে না। ওই চুক্তি ছিল একটি ‘এক্সিকিউটিভ এ্যাক্ট’ যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোন অপরাধের বিচারে কোন বাধা সৃষ্টি করে না।

আসামি পক্ষে আরও আইনগত প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল যে, আইন-১৯৭৩-এর প্রণয়নের সময় শুধু সশস্ত্র বাহিনী (আর্মড ফোর্স) ও তাদের সহযোগী বাহিনীর (অক্সিলারি ফোর্স) যারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে বা করবে তাদের বিচারের লক্ষ্য নিয়েই ওই আইন প্রনীত হয়েছিল; কিন্তু ২০০৯ সালে আইনটি সংশোধন করে ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের আওতাভুক্ত করার আইনী সংশোধনটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মূল আইনের উদ্দেশ্য ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

উপরোক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, ২০০৯ সালে ৫৫নং আইনের মাধ্যমে আইন-১৯৭৩-এর ধারা ৩(১) সংশোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারকে বৃদ্ধি করে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অথবা তাদের ‘সহযোগী বাহিনী’র পাশাপাশি অপরাধে যুক্ত ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে বিচারের ক্ষমতা দেয়ায় আইন বা সংবিধানের কোন ব্যত্যয় ঘটেনি। ওই সংশোধনীটি মূল আইনের অংশ হিসেবে বিবেচ্য এবং আইনটিকে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৭(৩) অনুযায়ী আইন-১৯৭৩ সুরক্ষিত এবং ওই আইনকে কখনও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, যদি তা বেআইনী কিংবা বাতিলযোগ্য হয়ে থাকে।

ট্রাইব্যুনালসমূহ ও আপীল বিভাগ আসামি পক্ষে উত্থাপিত আরও একটি আইনী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, যা হলোÑ দালাল আইন-১৯৭২ এবং আইন-১৯৭৩ সম্পূর্ণ পৃথক-ভিন্ন দুটি আইন। দুটি আইনে বিচার্য অপরাধের প্রকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। দালাল আইন প্রণীত হয়েছিল ওই আইনের তফসিলে উল্লিখিত অপরাধসমূহ বিচারের জন্য যা ছিল মূলত দ-বিধির (পেনাল কোড) অধীনে অপরাধ; কিন্তু আইন-১৯৭৩ প্রণীত হয়েছিল মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা এবং অন্যান্য অপরাধসমূহ যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে সংঘটিত হয়েছে বা হবেÑ তা বিচারের জন্য। সুতরাং উপরোক্ত ওই দুটি আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধসমূহকে এক ও অভিন্নভাবে চিত্রায়িত করার কোন সুযোগ নেই।

এখানে উল্লেখ করা সঙ্গত হবে যে, বঙ্গবন্ধু ৩০ নবেম্বর, ১৯৭৩ দালাল আইনে আটক ব্যক্তি যারা খুন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না তাদের সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করেন। ওই ঘোষণায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, ‘দ-বিধির ৩০২(হত্যা), ৩০৪ (অপরাধজনক নর হত্যা), ৩৭৬ (ধর্ষণ), ৪৩৫ (অগ্নিসংযোগ কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্ম সাধন), ৪৩৬ (ঘরবাড়ি ধ্বংসের অভিপ্রায়ে অগ্নিসংযোগ কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্ম সাধন), ৪৩৮ (জাহাজে অগ্নিসংযোগ কিংবা বিস্ফোরক দ্রব্য দ্বারা অপকর্ম সাধন) মোতাবেক অভিযুক্ত ও দন্ডিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১ নম্বর অনুচ্ছেদ মোতাবেক ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হবে না’। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক সাধারণ ক্ষমার পরিধি ছিল সীমিত।

ট্রাইব্যুনালসমূহ কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন রায়ে এই বিষয়টি আলোকপাত করে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনকারীরা কখনও বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার আওতাভুক্ত ছিল না এবং ওই সাধারণ ক্ষমা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী বিলম্বিত বিচারের বিষয়ে আপীল বিভাগ ও ট্রাইব্যুনালের অভিমত হলো যে, বিগত ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় না নিয়ে আসার ধারাবাহিক ব্যর্থতায় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তরা কোন দায়মুক্তি পেতে পারে না।

ট্রাইব্যুনাল-২, চীফ প্রসিকিউটর বনাম কামারুজ্জামান এবং চীফ প্রসিকিউটর বনাম আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছিল যে, বেসামরিক কোন ব্যক্তি কোন সশস্ত্র বাহিনীর ‘সহযোগী বাহিনীর’ (আলবদর বাহিনী) উচ্চতর/উর্ধতন পদে বা দায়িত্ব পালন করলে ওই বাহিনীর অধঃস্তন ব্যক্তি/সদস্যদের অপরাধের দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উচ্চতর পদে বা নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের ওপরও বর্তাবে। কোন গোষ্ঠী বা বেসামারকি সহযোগী সংগঠনের অধঃস্তনদের নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব স্বভাবতই সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির ওপর বর্তায়। আন্তর্জাতিক আইন বিজ্ঞানেও এটিই বিবর্বিত হয়েছে।

‘উর্ধতন নেতৃত্বের দায়ভার’ (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) সম্পর্কে আসামীপক্ষ হতে বিভিন্ন সময়ে এটি বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ‘উর্দ্ধতনের দায়-দায়িত্ব’ (সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি) সম্পর্কিত আইনি নীতিটি বে-সামরিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, তা হবে শুধু সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে’ প্রাসঙ্গিক। কিন্তু আপীল বিভাগ ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক দ- ও সাজাপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামী কর্তৃক দাখিলকৃত আপীল মামলায় বেসামরিক ব্যক্তিও ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র (উর্ধতন নেতৃত্বের দায়ভার) আইনী নীতি অনুযায়ী কোন সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগী কোন বাহিনীর উর্ধতন পদে বা নেতৃত্বে থাকলে ওই বাহিনীর অধঃস্তন ব্যক্তি/সদস্যদের অপরাধের দায়-দায়িত্ব তাকে বহন করতে হবে এবং ‘উর্দ্ধতন নেতৃত্বের দায়ভার’এর কারনে অধঃস্তনদের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে মর্মে ট্রাইব্যুনালের অভিমতের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। আলবদর বাহিনীর শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত নিজামীর দ- ও সাজা উপরোক্ত আইন নীতির আলোকে আপীল বিভাগ বহাল রেখেছে। [১৩ এডিসি(এডি) পৃষ্ঠা ৬০৭ অনুচ্ছেদ ৪৯, ৫১,৫৩,৫৬]

আসামি পক্ষে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে দুটি উপাদান থাকতে হয়। এর একটি হলো অপরাধটি যেন একটি ‘ব্যাপক’ এবং ‘পরিকল্পিত/সুসংগঠিত’ (রিফবংঢ়ৎবধফ ধহফ ংুংঃবসধঃরপ) আক্রমণে সংঘটিত হয় এবং অপরটি হলো ‘ব্যাপক ও সুসংগঠিত’ আক্রমণের বিষয়ে অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ ‘জ্ঞান’ ও ‘সমর্থন’ থাকতে হবে। কিন্তু আইন-১৯৭৩’এ এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত, যে কারণে এই আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের’ বিচার করার কোন এখতিয়ার নেই। কিন্তু ট্রাইব্যুনালসমূহ এ আইনী প্রশ্ন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে-

‘১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী যাদের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা হবে তারা সবাই তাদের কৃত অপরাধ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীকে (সিভিলিয়ন পপুলেশন) লক্ষ্য করে করেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে এসব যুদ্ধাপরাধী মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং একটি ‘ব্যাপক’ এবং ‘সুসংগঠিত’ আক্রমন চালিয়ে যাবতীয় অপরাধ সংঘটন করে যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। সুতরাং বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধকালে নিরস্ত্র বাঙালি জনগোষ্ঠি লক্ষ্য করে পরিচালিত আক্রমনগুলো যে ‘ব্যাপক ও সুসংগঠিত’ ছিল তা আর আলাদা করে প্রমান করার প্রয়োজন পড়ে না। উপরন্তু, অনেক আন্তর্জাতিক দলিল অনুযায়ী ‘মানবতার অপরাধ’ প্রমাণের ক্ষেত্রেÑ ‘আক্রমণটি যে ব্যাপক ও সুসংগঠিত ছিল’ তা প্রমাণ করার প্রয়োজন হয় না।’

এ বিষয়ে আপীল বিভাগ আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় অভিমত দিয়েছে যে, আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের জন্য অপরাধটি ‘ব্যাপক এবং সুসংগঠিত’ ছিল তা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। অপরাধ সংঘটনের জন্য এটা প্রমাণ করাই যথেষ্ট হবে যে- ‘১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারন নির্বাচনের ফলাফলকে নস্যাত এবং নির্বাচনে বিজিতদের ফল ভোগ করতে না দেয়ার এবং বাঙালী জাতির স্বাধিকারকে অবদমিত করার উদ্দেশ্য থেকে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ চলাকালে কোন ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণ’ সাধারন বাঙালী জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ, আক্রমণের উদ্যোগ বা ষড়যন্ত্র করেছে।’ আপীল বিভাগের এ ব্যাখ্যা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ সংঘটনের প্রেক্ষাপটের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে একটি স্বতন্ত্র মানবাধিকার বলে স্বীকৃতি দেয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার ব্যক্তিরও প্রতিকার পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত। এই অধিকারটি দুটো মুখ্য মানবাধিকার দলিলে সন্নিবেশিত রয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষনাপত্রের (ইউডিএইচআর) অনুচ্ছেদ ৮ এবং আইসিসিপিআরের ২(৩) অনুচ্ছেদে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ‘কার্যকর’ প্রতিকারের বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এই বিবেচনায় বাংলাদেশে নিজস্ব আইনে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে চলমান বিচার কার্যক্রমের এখতিয়ার ও বৈধতা এবং স্বচ্ছতা ও মান প্রশ্নতীত এবং যে কোন ধরনের বিভ্রান্তিমুক্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের এ্যাম্বাসেডর-এ্যাট-লার্জ মিঃ স্টিফেন জে র‌্যাপ বেশ কয়েকবার ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শন ও এর বিচারিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। অনেক বৈশ্বিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতো তিনিও বাংলাদেশের নিজস্ব বিচারিক ফোরামে মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসূত অপরাধের বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে-

[....] these trials[….] are of great importance to the victims of the 1971 war of independence from Pakistan. What happens in Bangladesh today will send a strong message that it is possible for a national system to bring those responsible for grave human rights abuses to justice.

[‘Old Evidence and Core International crimes: FICHL Publication series No.16(2012)-page 169]

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন করে সংঘটিত অপরাধ সমুহ তদন্ত করা এবং অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তিকে বিচারে সোপর্দ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। বাংলাদেশ নিজেদের সার্বভৌম সংসদে ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ অর্থাৎ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধসমূহ ও গণহত্যার বিচারে অনন্য নজির স্থাপন করেছে। প্রতিষ্ঠিত করেছে- সত্য ও ইতিহাস। প্রকাশ্য, স্বচ্ছ এবং অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সব ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করে এ বিচার ব্যবস্থা আগ্রহ ও নজর কেড়েছে বিশ^ সম্প্রদায়ের। বৈশ্বিক আইন অঙ্গনেও বাংলাদেশের ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ আজ ইতিবাচক আলোচনার বিষয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অপ্রতিরোধ্য অঙ্গীকারে ১৯৭৩ সালে প্রণীত দেশীয় আইনে গঠিত বিচারিক ফোরামে এই প্রকৃতির বর্বর অপরাধের বিচার ভবিষ্যতে বিশে^র যে কোন ভূখ-ে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০২০

২৫/০৩/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: