১ এপ্রিল ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • রায়হান আহমেদ তপাদার

চীন পৃথিবীর সবচাইতে বেশি জনসংখ্যার দেশ। পৃথিবীর ১৯.৪৮ শতাংশ মানুষ এই দেশে বসবাস করে। দেশটি পৃথিবীর দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশও। গ্লোবাল জিডিপির ৯.৩ শতাংশ এই দেশের কৃতিত্ব। সেই দেশে গত কয়েকদিনে করোনাভাইরাস যেভাবে সুনামির মতো শক্তি নিয়ে হানা দিয়েছে তাতে শুধু চীনই নয় সারা পৃথিবীতেই সুনামির ধাক্কা আসতে শুরু করেছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন। চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, যাতায়াত এই সময়ে এত বেশি যে, সেগুলোর অনেকেই ধীরে ধীরে বা দ্রুত বন্ধ হতে চলেছে। উড়োযান অনেকেই আর চীনমুখী করছে না। চীন থেকে, উড়োযান তেমন বেশি ভিনদেশে উড়ছে না। হাজার হাজার উড়োযান এই একটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলে কত-শত কোম্পানি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে, আবার লাখ লাখ ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিজ দেশে বা অন্য কোন দেশে চলে যাচ্ছে- যা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনার ব্যবস্থা করছে বললে অত্যুক্তি হবে না। অনেক দেশের সঙ্গে চীনের পণ্যসামগ্রীর প্রাত্যহিক বাজার যেভাবে সচল ছিল তা কমে আসতে শুরু করেছে। অনেকেই জাহাজ চীনা বন্দরে নোঙ্গর করতে সাহস পাচ্ছে না। চীনের বাতাস ও মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমণের যে ধারণা সৃষ্টি করেছে তাতে কার সাহস আছে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে চীনে যাতায়াত আগের মতো স্বাভাবিক রাখার? সবার মধ্যেই করোনাভাইরাসের আতঙ্ক, মৃত্যুর আতঙ্ক! অথচ মৃত্যুর পরিসংখ্যান এখনও এমন নয় যে, সবাই এভাবে নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে সবকিছু গুটিয়ে বসে থাকবেন। কিন্তু থাকতে তো দেখা যাচ্ছে।

অনেক দেশেই এখন করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নানা ধরনের চেকআপ করা হচ্ছে। সর্বত্রই বাড়তি আয়োজন, বাড়তি খরচ, বাড়তি সতর্কতা। অজানা এই করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব চীনের পাশাপাশি পড়তে শুরু করেছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। সঙ্কুচিত হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিধি আর সরবরাহ ব্যবস্থা। বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে বাধ্য হচ্ছে। উহান শহর নিষিদ্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরেই ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি তেল সরবরাহ। পুরো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে সূচকের দরপতন হচ্ছে। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যান লাখ লাখ চীনা পর্যটক। চীনা পর্যটকদের অন্য দেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় চলতি বছর নিউইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়ার লোকসান গুনতে হতে পারে ৫৮০ কোটি ডলার। চীনা পর্যটকরা অন্য যেসব দেশের পর্যটন খাতে অনন্য অবদান রাখেন প্রায় সব দেশকেই এবার গুনতে হবে কঠিন লোকসান। করোনাভাইরাসের প্রভাবে চীনেও আসতে পারছেন না পর্যটকরা। এরই মধ্যে ধস নামতে শুরু করেছে দেশটির পর্যটন খাত। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ আর এশিয়া চীনাদের দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আমেরিকান এয়ারলাইন্স, ডেল্টা এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স চীনে ফ্লাইট বাতিল করেছে। সিঙ্গাপুর তো চীনের পর্যটক নিষিদ্ধ করার চিন্তা-ভাবনা করছে। এদিকে, হংকং চীন সংলগ্ন সীমান্তই বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছে। দেশটির অন্যতম জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ক্ষেত্র উহান শহর লকডাউন থাকায় জ্বালানি কেনা কমিয়ে দিয়েছে বিদেশী প্রতিষ্ঠান। ক্রমাগত দর হারাচ্ছে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার। সেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব শেয়ারবাজারে।

অপরদিকে করোনাভাইরাস আতঙ্কে নিজ বাসস্থান ছাড়ছেন অনেক চীনা। কমছে শিল্পখাতের কার্যক্রম ও খুচরা বিক্রি। বেড়ে যেতে পারে বেকারত্ব আর মূল্যস্ফীতি। এর আগে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসে পুরো বিশ্বে ৪ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে ইবোলায় ক্ষতি হয়েছিল ৫ হাজার ৩শ’ কোটি ডলার। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই করোনার কারণে চীনের ক্ষতি ৬ হাজার কোটি ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, করোনাভাইরাসে দেশটিতে এ পর্যন্ত আট শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। বেশির ভাগ মৃত্যু ও নতুন সংক্রমণের ঘটনাই ঘটেছে হুবেই প্রদেশে, যা উহান শহরকে এ ভাইরাসের ‘উৎসস্থল’ বলা হচ্ছে। এছাড়া এ পর্যন্ত চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে হংকংয়ে একজন এবং ফিলিপিন্সে একজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে চীনের বেশ কয়েকটি শহর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে কয়েক হাজার লোককে কোয়ারেন্টাই করে রাখা হয়েছে। ট্রেন স্টেশন ও বিমানবন্দরের পাশাপাশি রাস্তাগুলোও বন্ধ করে দেয়ায় চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। প্রথমে এই প্রদেশেই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছিল। প্রাদেশিক রাজধানী উহানের একটি সি-ফুড মার্কেট থেকে ভাইরাসটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রফতানি। নতুন করে এলসি তো খোলা হচ্ছেই না, পূর্বে এলসি করা পণ্যের জাহাজীকরণও বন্ধ। বন্ধ রয়েছে ব্যবসায়ী এবং কর্মরতদের আসা-যাওয়াও।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই যুক্ত রয়েছে চীন। রফতানিমুখী এবং স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানাগুলো কাঁচামালের জন্য অনেকাংশেই চীনের ওপর নির্ভরশীল। বতর্মানে বাংলাদেশের ১২টি প্রকল্পে ৯০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে চীন। এসব প্রকল্পে কাজ করছে দুই হাজারের বেশি চীনা বিশেষজ্ঞ। করোনাভাইরাসের কারণে একরকম নিথর হয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। এর বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা আরও বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের জরিপ থেকে দেখা যায়, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগির অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না। এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্প-কারখানা চালু করতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির লক্ষ্য। আটকে গেছে শত শত এলসি। এতে ব্যাংকের খেলাপী ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় আছে বহু ব্যবসায়ী। উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয় চীন থেকে। এর বাইরেও কাপড়, আদা, রসুন, বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যসামগ্রী, মেশিনারি, খুচরা যন্ত্রাংশ, খেলনা, মোবাইল, বৈদ্যুতিক সামগ্রী মিলিয়ে শত শত আইটেমের পণ্য আমদানি করা হয় চীন থেকে। সবচেয়ে বড় বাণিজ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক ও এর কাঁচামাল আমদানি, যা চীনের বাইরে থেকে প্রত্যাশা করাটা অসম্ভব।

বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ-চীনের ব্যাপার নয়। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও চীনের বাণিজ্য আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। সেটির ভবিষ্যত কী হবে তা কেউ এখনই বলতে পারছে না। তবে সময় যদি বেশি নেয়া হয়, করোনাভাইরাস যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে শুধু চীনই নয়, অন্যান্য দেশও এই রোগের প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। যদি দেশটি চীন না হয়ে ছোট কোন দেশ হতো তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এতটা প্রভাব নাও পড়তে পারত। যেহেতু দেশটি চীন, তাই করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চাইতেও অর্থনীতির সঙ্কট অধিকতর দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে যাচ্ছে। সে কারণে অনেক দেশেই নানা দুর্ভাবনা সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর ভেতরে শুরু হয়েছে। করোনাভাইরাস একটি রোগ। এর আতঙ্ক সংক্রমণের। তাতে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু এই রোগের কারণে চীন যেভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তাতে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে যুক্ত পৃথিবীর প্রায় সব ছোট-বড় দেশও অর্থনৈতিক সঙ্কটে সংক্রমিত হতে যাচ্ছেÑ এটি বড় বিপদের কথা। সম্ভবত নিকট অতীতে অর্থনৈতিক কোন সঙ্কটই পৃথিবীকে এতটা আতঙ্কিত করেনি যতটা করোনাভাইরাসের কারণে এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি আঁতকে ওঠার মতো পর্যায়ে যেতে বসেছে। তবে বিশ্ব যত দ্রুত নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রতিযোগিতা, ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ একপাশে ঠেলে রেখে যদি করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে যে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে সেটি মোকাবিলায় আত্মনিয়োগ করে, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ও পরিষেবা দ্রুত নিয়ে আসতে পারে, একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে আর্তমানবতার সেবায় হাতে হাত রেখে এগিয়ে আসে, তাহলে এই ভাইরাস বেশিদিন টিকে থাকার কথা নয়।

পৃথিবীতে এর আগে নানা ভাইরাসের কথা শোনা গেছে, মৃত্যুর খবরও শোনা গেছে। দ্রুতই সেসব অঞ্চলে চিকিৎসার সুযোগ ঘটেছে। আক্রান্ত মানুষ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই ভাইরাস পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পড়ছে।

কিন্তু অন্য সব ভাইরাসের ক্ষেত্রে ঘটেনি এমন আতঙ্ক, যা চীনের করোনাভাইরাস নিয়ে ঘটেছে। চীন থেকে এখন বিদেশীরা দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভাইরাসটি এমনই যে, সরে যাওয়ারও উপায় নেই। মানব স্পর্শেই এই ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে। যদিও এ পর্যন্ত মৃত্যু খুব বেশি ঘটেছে তা বলা যাবে না। আক্রান্তের সংখ্যা এখনও পর্যন্ত অর্ধলাখে পৌঁছায়নি। তারপরও পৃথিবীব্যাপী চীনা করোনাভাইরাসের আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়ে পড়েছে যে, মানুষ এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। কারণ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার খবর যেভাবে প্রচার হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স, নিকটাত্মীয়- কেউই স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত রোগীকে নিরাপদে রেখে চিকিৎসা দেয়ার কথা ভাবতে পারছেন না। চিকিৎসা দেয়ারও কোন স্বীকৃত ওষুধ, টিকা বা ব্যবস্থা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত দিতে পারছে না। সে ধরনের চিকিৎসার উদ্ভাবন রাতারাতি ঘটানো সম্ভবও নয়। দিন যতবেশি গড়াচ্ছে করোনাভাইরাসের বিস্তার ও আতঙ্ক ততবেশি দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, লন্ডন প্রবাসী

[email protected]

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৯/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: