২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

করোনায় আক্রান্ত চীন, আতঙ্কে দেশ

প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • বিশ্বজিত রায়

করোনায় কাঁপছে চীন। ভাবনায় ফেলেছে বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বকে। এতে আক্রান্ত হয়ে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। করুণাহীন করোনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অধিক জনসংখ্যার এই দেশটি। চীন ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। প্রতিদিনই করোনার উদ্বেগজনক খবর পত্রিকান্তরে ছাপা হচ্ছে। এতে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। তারপরও আতঙ্ক কাটছে না।

চীনের করোনা ভাইরাসে আতঙ্কিত বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্ব। করোনার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের এক নম্বর রফতানিকারক দেশ চীনে করোনা ভাইরাস যতই ছড়িয়ে পড়ছে, বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের কপালের ভাজ ততই বাড়ছে। চীন থেকে কাঁচামাল আর যন্ত্রাংশ আমদানি না করে শিল্প চালু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। এতে করে অর্থনীতিতে ক্ষতির সম্মুখীন বাংলাদেশ আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায়। গেল বছরের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা মোকাবেলা করে ক্লান্ত বাংলাদেশ তাই চিন্তিত।

গ্রিক শব্দ করোনে মানে মুকুট এবং ল্যাটিন শব্দ করোনা মানে মালাÑ থেকেই করোনা ভাইরাস পরিবারের নামটি এসেছে। ১৯৬০ সালে খুঁজে পাওয়া এই ভাইরাস পরিবারে দুই শতাধিক সদস্য আছে, তবে মানুষের ভেতর সংক্রমণের জন্য আগে ছয়টি ভাইরাস চিহ্নিত হয়েছিল। ২০১৯ সালে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোচিত এই ‘নোভেল করোনা ভাইরাস (২০১৯ এনসিওভি)’ হলো মানুষে সংক্রমিত হওয়া করোনার সপ্তম প্রজাতি। আর এ প্রজাতিই চীনসহ বাংলাদেশ ও বিশ্বকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রায় মুমূর্ষু অবস্থায় পতিত সদ্য গত হওয়া বছরটি সাবধানী সুর শুনিয়ে যাচ্ছে। তখন ডেঙ্গুবাহী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পাশাপাশি হাসপাতালমুখী হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। ভাইরাসবাহিত এ ব্যাধিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ঢাকাসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলা। ডেঙ্গুর রুগ্নদশা কাটিয়ে উঠা বাংলাদেশ বর্তমান করোনার করুণ খবরে তাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। চীন থেকে যেভাবে করোনার মরণঘাতী বাস্তবতার খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে চিন্তিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই ডেঙ্গু সদ্য সামাল দেয়া বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকা জরুরী।

চীন ফেরৎ বাংলাদেশীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি করোনা বিতাড়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব প্রয়োজন। দরকার হলে চীন বাংলাদেশ বিমান যোগাযোগ সাময়িক বন্ধের যে দাবি উঠছে তা আমলে নিতে হবে। যদিও এতে উন্নয়ন কর্মকা-সহ নানা ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দেবে তারপরও সময় থাকতে সাবধান হওয়াটা হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। কারণ ছোঁয়াচে ভাইরাস করোনা যদি কোন মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করতে পারে তাহলে দেশব্যাপী মড়ক সৃষ্টির শঙ্কা তৈরি করবে। প্রতিষেধকবিহীন এ ভাইরাসটি এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয় বিধায় মানুষের মধ্যে একটু বাড়তি আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই আতঙ্ক দূর করতে চীন ফেরত প্রবেশদ্বারটি যেভাবে সুরক্ষিত ও শঙ্কামুক্ত থাকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরী অবস্থা ঘোষণা করলেও ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনফেরত যাত্রীদের পরীক্ষায় শৈথিল্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রয়োজনের তুলনায় ডাক্তার কম থাকায় রাতের শিফটে কিছু যাত্রী পরীক্ষা ছাড়াই বেরিয়ে এসেছে। বিমানবন্দরের হেলথ ডেস্ক ফাঁকা থাকায় চীনফেরত এক যাত্রীর ফেসবুক লাইভের পর টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের। এমন সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

চীনে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস শুধু চীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা নয়, এশিয়াসহ সমগ্রবিশ্বে এর ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছে। মৃত্যুর পাশাপাশি চীন যেমন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তেমনি সেই আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে সারা বিশ্ব। এমন খবর পত্রিকান্তরে উঠে আসছে। খবরে বলা হয়, প্রাণঘাতী এ ভাইরাস ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে গেছে চীনের সব প্রদেশে। এসব শহরে যেমন বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন, রেল ও বিমান চলাচল তেমনি বন্ধ রয়েছে অনেক বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ভাইরাসটি চীন থেকে বিশ্বের ২৮টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে বিশ্ববাসী এখন ভুগছে মহামারীর আতঙ্কে। ফলে অন্য দেশগুলোও ক্রমেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক দেশ চীনে সরাসরি বিমান পরিচালনা বন্ধ করেছে। অনেক দেশ ঘোষণা দিয়েছে চীনা নাগরিকদের ভিসা না দেয়ার। এ্যাপলসহ বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠানও চীনে তাদের সব আউটলেট বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশ প্রত্যাহার করছে চীনা পণ্য আমদানির অর্ডার। ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ সবদিক থেকেই ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে এশিয়ান ইকোনমিক জায়ান্ট চীন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। আর্থিক ক্ষতি পৌঁছে যেতে পারে প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলারে। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের চলমান বাণিজ্য যুদ্ধেও অর্থনীতির এতটা ক্ষতি হয়নি, যতটা না করেছে করোনা। করোনার প্রভাবের কারণে অনেকটাই থমকে গেছে চীনের অটোমোবাইলসহ নির্মাণ শিল্পও। হুবে প্রদেশে গড়ে উঠা নিসান, হোন্ডা ও জেনারেল মোটরসসহ আরও বেশ কয়েকটি দামী ব্র্যান্ডের গাড়ির প্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। একই অবস্থা দেশটির আরেক লাভজনক খাত পোশাকশিল্পেও। তৈরি পোশাকশিল্পে অনেকদিন ধরেই চীন শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে এরই মধ্যে অনেক আমদানিকারক তাদের অর্ডার বাতিল ও স্থগিত করায় বিপাকে পড়েছেন গার্মেন্টস মালিকরা। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কার্যত ধস নেমেছে চীনের অর্থনীতির আরেক লাভজনক খাত পর্যটনেও। ইতোমধ্যেই দেশটির সব প্রদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়ায় অনেক শহর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে আতঙ্কে পর্যটকরা আর চীনমুখী হচ্ছেন না। এমনকি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে অভ্যন্তরীণ পর্যটনও। এর মধ্যেই প্রায় প্রতিদিনই একের পর এক বিমান পরিবহন সংস্থা চীনে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখার কথা জানাচ্ছে। ইতোমধ্যেই চীনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা বেড়েছে। চীনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আতঙ্কে ভুগছেন অনেক বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে প্রভাব পড়েছে অনেক বড় বড় প্রকল্পের কাজে। এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুডিস ইনভেস্টরস সার্ভিস বলেছে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোম্পানিতে চীনের প্রভাব থাকায় তাদের অর্থনীতির দুরবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিরও বিপদ ঘটাবে। করোনামুক্ত থাকতে বাংলাদেশকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। [সূত্র : আমাদের সময়, ০৬.০২.২০২০]

করোনা ভাইরাস যদি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তাতে শুধু প্রাণহানি ঘটবে তা নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশ। চীনের মতো বাংলাদেশ করোনাক্রান্ত হলে একদিকে যেমন মরণ যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হবে তেমনি বিদেশী বিনিয়োগসহ আমদানি-রফতানি থেমে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে অর্থনীতির চাকা। মৃত্যু ও অর্থনৈতিক সঙ্কট দুইয়ে মিলে এক দুর্বিষহ সময় পার করতে হবে বাংলাদেশকে। এছাড়া উন্নয়ন অগ্রগতির চলমান গতিটাও থেমে যাবে। সবকিছু বিবেচনায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। নইলে চরম বিপদের সম্মুখীন হবে দেশ আর অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হবে মানুষ। এ জন্য আগ থেকেই সতর্ক ও সাবধানতা অবলম্বন করা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে।

গত বছরের (২০১৯) মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব প্রবল আকার ধারণ করেছিল। এতে শতাধিক মানুষের প্রাণহানিসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে ডেঙ্গু সংক্রমিত মানুষের চাপে প্রচ- হিমশিম খেতে হয়েছে। দেশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর অবশেষে বশে আনা সম্ভব হয়েছিল ডেঙ্গু বহনকারী বিপজ্জনক ভাইরাসটিকে। সেই ডেঙ্গুর ভয় এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি মানুষ। ডেঙ্গুক্রান্ত মরণ যাতনা এখনও ছেড়ে যায়নি আপনজনহারা মানুষকে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই এবার চোখ রাঙাচ্ছে করোনা। চীনে চরম বিপর্যয় ডেকে আনা করোনা যদি আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে তাহলে বিপর্যয় ব্যাপকতা ছড়াবে এতে কোন সন্দেহ নেই। করোনাক্রান্ত চীনের অবস্থা পত্রিকান্তরে যেভাবে উঠে আসছে তাতে শুধু চিন্তাগ্রস্তই মনে হচ্ছে না, অজান্তে মারাত্মক আতঙ্কও কাজ করছে নিজের মাঝে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য সর্বক্ষেত্রে সতর্কতা, সাবধানতা ও সচেতনতা অপরিহার্য।

লেখক : সাংবাদিক

প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০

১৬/০২/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: