২৪ জানুয়ারী ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৬, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

রাজনীতিতে বণিকায়ন ও দুর্বৃত্তায়ন রোধে প্রধানমন্ত্রীর লড়াই

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯
  • দীপক চৌধুরী

গুজব সমাজ ও রাষ্ট্রের ভীষণ ক্ষতি করে থাকে। রাজনীতিতে বণিকায়ন, দুর্বৃত্তায়ন রোধ করার পাশাপাশি গুজবের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণে মাথা দরকার, লবণের দাম নিয়ে গুজব, ছেলেধরা গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির পরও গুজব ছড়ানো হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে চাঁদে কারও মুখ দেখার গুজবে প্রাণ হারিয়েছে বহু মানুষ, আবার মোবাইল ফোনে পোস্টের কারণে (সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে) বৌদ্ধবিহারে চলেছে হামলা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রংপুর বা ভোলায় গুজব ছড়ানোর পরবর্তী সর্বনাশ আমরা জানি। ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে বহু কিশোর ও নারীর প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়েছে। রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় স্কুলে বাচ্চা ভর্তির তথ্য জানতে গিয়ে রেনু বেগমও ছেলেধরা গুজবের শিকার হয়ে প্রাণ খুইয়েছেন। আমরা অনেকেই জানি, বহু দেশ মানুষের নিরাপত্তার জন্য ইন্টারনেট পর্যন্ত সাময়িক বন্ধ করে দিয়েছিল, অনেক দেশ বন্ধও রেখেছে। সে দেশের নাগরিকরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তা মেনে নিয়েছেন। সেসব দেশের সাংবাদিকরাও তা মেনে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষ টুঁ-শব্দটি করেননি। হয়ত তারা যা ভাবছেন আমরা এখনও তা ভাবতে পারিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটার আগে-পরের বিষয় নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত সরকারই নেবে। প্রয়োজনে এটা কি সাময়িক বন্ধ রাখা দরকার কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকেই। শুধু এটুকু চিন্তায় থাকা দরকার যে, শুঁটকির চৌকিদার যেন বিড়াল না হতে পারে। দুর্নীতি এক নম্বর ব্যাধি এটা আজ মুখে মুখে। যারা দুর্নীতির বিচার করার অধিকার রাখে তারাও কেউ কেউ ভক্ষকের ভূমিকায় নেমে গেছে। এটাই ভয়ের বিষয়।

৩০ নবেম্বর রাজধানীর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে কেউ পার পাবে না। সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, মাদক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।’ টাকা বানানোর নেশাকে রোগ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসলে টাকা বানানো একটা রোগ, এটাও একটা ব্যাধি, এটা একটা অসুস্থতা। একবার যে টাকা বানাতে থাকে তার শুধু টাকা বানাতেই ইচ্ছে করে। কিন্তু ওই টাকার ফলে ছেলেমেয়ে বিপথে যাবে।’

দুর্নীতির বিষয়ে তাঁর সরকারের স্পষ্ট অবস্থানের কথা জানাতে গিয়ে বিভিন্ন সময় তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক, এমন কি ব্যক্তিগত কর্মকা-েও দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান দেখতে পাই। দুর্নীতি দমনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দেশের অর্থনীতিতে অপ্রতিরোধ্য গতি সঞ্চার করাই তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও এটি। সীমাহীন বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের গণতন্ত্রের সংগ্রাম। এটিই বাঙালী জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কুশীলবরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় পিছিয়ে দিতে কাজ শুরু করে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সরকার দুর্নীতি করা ও পুঁজি লুণ্ঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের অবস্থানে চলে যায়। সত্যিটা হলো, জিয়ার আমলেই রাজনীতিকে চরিত্রহীন করা হয়। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হয়। রাজনীতিতে বণিকায়ন ও দুর্বৃত্তায়ন ঘটান জিয়া। লুটপাট, দুর্নীতি আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস জাতিকে কলঙ্কিত করে। জিয়াউর রহমানের পর আবার স্বৈরাচারী এইচ এম এরশাদের আমল থেকে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক উভয় প্রকারের দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অর্থনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর চার বছর দুর্নীতির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ বাংলাদেশের কলঙ্কতিলক হিসেবে অক্ষুণ্ণ ছিল। ২০০৭-০৮ সালে আমরা অনেক কিছ্ ুদেখেছি। অতএব, আগামী চার বছর ক্ষমতাসীন থাকার মেয়াদে যদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সত্যি সত্যিই সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন তা হলে ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ক্ষমতাসীন সরকারের অনেক সুখ্যাতি ও সুকৃতি জনগণের কাছে সমাদৃত হবে, যদি সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারের কঠোর অভিযান চালায়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে জনগণের কাছে মনে হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ‘দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।’ এবারই কোন রাজনৈতিক দল এত সুনির্দিষ্ট ও কঠিনভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি দমনের অঙ্গীকার করল। নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়ার পর তিনি তাঁর প্রতিটি বক্তৃতায় এই অঙ্গীকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছেন। সময়ের প্রয়োজনেই শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছেন। আমাদেরও অভিজ্ঞতা আছে অতীত নিয়ে।

রাজনীতিতে বণিকায়ন ও দুর্বৃত্তায়ন রোধে আমাদের সংগ্রাম ছিল বিভিন্ন সময়। জিয়াউর রহমানের আমল বা স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের কথা কী ভুলে যাবার? টগবগ করা রক্ত ছিল শরীরে। শুধু আমি কেন, স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমার মতো লাখো তরুণ-যুবক তখন রাজপথে মিছিলে ছিলেন, গলা ছেড়ে স্লোগান দিয়েছেন। রাত জেগে পোস্টারিং, রাজপথে আল্পনা আঁকা, বড় বড় দেয়ালে নিশাচর প্রাণীর মতো ‘চিকা’ মারার কাজ করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের সড়কে আমরা যেভাবে পা দিয়েছি তা কিন্তু এত সহজে অর্জিত হয়নি। এদেশের জনগণ শান্তি চায়, অশান্তি নয়। জনগণ চায় রথী-মহারথীদের কোন আসুরিক শক্তি সরকারী কাজে বাধা দিয়ে যেন রেহাই না পায়। আমরা জানি, যে কোন দেশের উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধরা হয় মানবসম্পদ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মানবসম্পদ সূচকে দেখা গেছে বিশ্বের ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬ নম্বরে। আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ১১৫তম আর পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৪তম। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন আজ বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, সংসদের উপনেতা, বিরোধীদলীয় নেতা আজ নারী। জাতীয় সংসদে সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা ২২, যা অতীতে কল্পনাও করা যেত না। নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মা ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তি, রাষ্ট্রনায়করা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ রফতানি করেছে প্রায় তিন হাজার সাত শ’ কোটি ডলারের পণ্য। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪তম। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান ৬২, পাকিস্তানের ৫২ ও শ্রীলঙ্কার ৪০। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর। বিশ্বব্যাপী প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জঙ্গী ও সন্ত্রাস দমন ইস্যু। দেশে জঙ্গী সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে সরকার।

আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে দলের এমপি-মন্ত্রীকে জেলে যেতে হয়েছে। প্রভাবশালী ব্যক্তি, এমপি, সাবেক মন্ত্রী, বিশিষ্ট ব্যাংকার দুর্নীতি দমন কমিশনে হাজিরা দিতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থের উৎস জানাতে না পারলে জেলেও গেছেন। তবে এটা ঠিক যে, মানুষ ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মতো ‘এ্যাকশন’ দেখতে চায়। বুয়েটের ছাত্ররাজনীতি ও র‌্যাগিংয়ের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান কঠোর। আমরা জানি, দলের কারও মাধ্যমে কোন সেক্টরের দুর্নীতি, অপরাধ, অপকর্ম তথা অনিয়ম প্রধানমন্ত্রীকেই মোকাবেলা করতে হয়। আম-জনতা জানে, সবকিছুর জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং কঠিন না হলে সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

১১/১২/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: