২০ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

নানা আয়োজনে শেষ হলো ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ’১৯

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৯

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নানা আয়োজনে শেষ হলো সাহিত্যের আন্তর্জাতিক মহাযজ্ঞ ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৯’। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সৃষ্ট নিম্নচাপের শীতল জলধারাকে উপেক্ষা করেই মনের টানে ছুটে এসেছেন সাহিত্যপ্রেমীরা। বন্ধুদের আড্ডা, পারিবারিক বিনোদন আর সাহিত্যের আকর্ষণের কাছে নিম্নচাপ আর ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাকে তুচ্ছ প্রমাণ করে শনিবার মুখরিত হয়ে ছিল বাংলা একাডেমির উৎসব প্রাঙ্গণ। তিন দিনব্যাপী এবারের উৎসবে পাঁচ মহাদেশের ১৮ দেশ থেকে প্রায় তিন শ’ লেখক-সাহিত্যিক-চিন্তাবিদ অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ লেখিকা মনিকা আলী ছাড়াও এবারের ঢাকা লিট ফেস্টের নবম আসর আলোকিত করছেন ভারতীয় রাজনীতিক শশী থারুর, ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ড্যালরিম্পল, দুই বাংলার জনপ্রিয় লেখক জহর সেনমজুমদার, মৃদুল দাশগুপ্তসহ অনেকে। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শাহীন আখতার, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, আসাদ চৌধুরী, রুবী রহমান, সেলিনা হোসেন প্রমুখ। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাহিত্যপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত ছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ।

ঢাকা লিট ফেস্টের তৃতীয় ও শেষদিন শনিবার সকাল শুরু হয় ভজনের সুরে। বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে লন চত্বরে ভজন ও কীর্তন করেন ইস্কনের সঙ্গীত দল।

সকালে নজরুল মঞ্চে নাজিয়া জেবীনের ‘সাগর তীরে’ নামের শিশুতোষ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়।

‘রিভাইভিং দ্য আর্ট অব স্টোরিটেলিং’ শীর্ষক শিশুতোষ আলোচনায় মাদিহা মোরশেদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ চিত্রকর ও এ্যানিমেটর কার্টিস জবলিং, চাইল্ড স্পেশালিস্ট ফ্রান হুরলি, নিউরোসায়েন্টিস্ট নাইলা জামান খান এবং সাজিয়া জামান। এ সময় কার্টিস জবলিং বলেন, একমাত্র পরিবারই শিশুকে গল্প শুনিয়ে আনন্দময় শিক্ষা দিতে পারে যা তার সঠিক মানসিক বুদ্ধিবৃত্তিতে সাহায্য করবে। শিশুদের গৎবাঁধা বই হাতে ধরিয়ে না দিয়ে, খেলাচ্ছলে কল্পনানির্ভর শিক্ষা দেয়া উচিত। একমত হয়ে ফ্রান হুরলি বলেন, প্রযুক্তি নয়, পরিবার শিশুশিক্ষার প্রধান মাধ্যম। তিনটি সেশেনেই শিশুদের উপস্থিতি ছিল সাড়া জাগানোর মতো।

একাডেমির কসমিক টেন্টে ‘পাওয়ার অব পিকচার’ সেশনে উপস্থিত ছিলেন গ্রাফিক নভেলিস্ট ও কার্টুনিস্ট ফাহিম আঞ্জুম, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা আবরার আখতার। আলোচকরা বলেন, সচল হোক কিংবা স্থির, সেটা মুহূর্তেই প্রকাশ করতে পারে লাখও ভাবনা।

একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ অডিটোরিয়ামে পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জেফরি গেটেলম্যান তার ‘লাভ আফ্রিকা : আ মেমোয়ার অব রোমান্স, ওয়ার এ্যান্ড সারভাইভাল’ বইটি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। তিনি বলেন, আফ্রিকা থাকাকালীন তার দশ বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস এই বই। তিনি বলেন, চাইলেই শুধু পত্রিকায় স্টোরি করে ১০ বছর পার করে দিতে পারতাম, কিন্তু এই ১০ বছর সময়কে উপভোগ করেছি, আফ্রিকাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি।

শেষদিন দুপুরে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘ইন্ডিয়া এগেইনস্ট ইটসেলফ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও লোকসভার সদস্য শশী থারুর।

‘ইমাজিন’ শীর্ষক সেশনে মালয়েশিয়ান সাংবাদিক শরদ কুতটানের সঞ্চালনায় উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক, হিপহপ আর্টিস্ট ও কবি জোহাব জি খান। কবিতায় হাতেখড়ি তার মায়ের কাছে। তিনি বলেন, কোন কাজই ছোট নয়। স্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটলে সাফল্য আসবেই। দর্শক সারি থেকে একজন জানতে চান জোহাবের এই সাফল্যমণ্ডিত জীবনের রহস্য। উত্তরে তিনি বলেন, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায় অর্থাৎ সুশৃঙ্খল জীবনই সাফল্য বয়ে আনতে পারে। সেশনের শেষে তিনি তার ‘ইমাজিন’ কবিতা হিপহপ স্টাইলে আবৃত্তি করে দর্শক মুগ্ধ করেন।

চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বলেছেন, শুধু অসাম্প্রদায়িক নয়, ভাষা নিরপেক্ষ জাতি গঠন প্রয়োজন। শেষ দিন ‘সেলিব্রেটিং দ্য ইয়ার অব ইনডিজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজেস’ শীর্ষক সেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। একাডেমির কবি শামসুর রহমান সেমিনার রুমে অনুষ্ঠিত সেশনটি সঞ্চালনা করেন গবেষক মুক্তশ্রী চাকমা।

‘অন দ্য রোড : ট্রাভেল রাইটিং উইথ উইলিয়াম ড্যালরিম্পল’ শীর্ষক সেশনে আলোচনায় অংশ নেন স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও সমালোচক উইলিয়াম ড্যালরিম্পল। গত শতকের নব্বইয়ের দশক এবং একুশ শতকের গোড়ার দিকে প্রায় ২৫ বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের পর এখাকার মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈচিত্র্য তাকে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এই উপলব্ধির কথা জানিয়ে স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও সমালোচক উইলিয়াম ড্যালরিম্পল বললেন, এই উপমহাদেশে যত বেশি সময় কাটান তিনি, তত বেশি রহস্যময়তা ঘিরে ধরে তাকে; অন্বেষণের খিদে বাড়তে থাকে। লেখক অন্তরা গাঙ্গুলীর সঞ্চালনায় ড্যালরিম্পল তার বহুল পঠিত ‘সিটি অব জিনস’, ‘নাইন লিভস: ইন সার্চ অব দ্য স্যাক্রেড ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’ এবং ‘দ্য এজ অব কালি: ট্রাভেলস এ্যান্ড এনকাউন্টারস ইন ইন্ডিয়া’ থেকে নির্বাচিত অংশ পড়ে শোনান। পার্সি-উর্দু সংস্কৃতির মানুষের যাপিতজীবন, মধ্যপ্রাচ্যে অতীত আভিজাত্যে অভ্যস্ত মানুষগুলোর বর্তমান ভোগান্তি, অষ্টাদশ শতকে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মানুষের ধর্মীয় আচার ও জীবনযাপনের ধরন নিয়েও কথা বললেন এই ইতিহাসবিদ।

‘সাহিত্য ও সাংবাদিকতা: দ্বৈতসত্তার মিল-অমিল’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত, কবি সাজ্জাদ শরীফ ও কবি মুস্তাফিজ শফি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শাহনাজ মুন্নী। আলোচনায় মৃদুল দাশগুপ্ত বলেন, আমি কবিতাকে কিছুতেই জড়াই না সাংবাদিকতার সঙ্গে। আমি মাথা দিয়ে সাংবাদিকতা করি এবং বুক ও মাথা দিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করি। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গে যারা লেখালেখি করে তাদের একবার হলেও বাংলাদেশে ঘুরে যাওয়া উচিত। আর বাংলাদেশের যারা লেখালেখি করে তাদেরও পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলোতে ঘুরে আসা উচিত। বাংলাদেশ কবিতার আবাদক্ষেত্র।

মুনীর চৌধুরীর ‘রক্তকরবী’ নাটকে কাজ করতে গিয়ে তাদের প্রথম পরিচয়। সেই পরিচয় প্রণয়ে গড়াতে সময় নেয়নি। এরপর বিয়ে। তবে বিয়ের পরও নাটকের প্রতি, মঞ্চের প্রতি ভালবাসা এতটুকু ম্লান হয়নি তাদের, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সে কারণেই বুঝি নাটক ও সংসার দুই জীবনেই অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন এই দম্পতি। তারা হলেনÑ রামেন্দু মজুমদার ও ফেরসৌসী মজুমদার। সফল এই জুটি তাদের গল্প শোনালেন ঢাকা লিট ফেস্টে। একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘মঞ্চের জুটি, জীবনের জুটি’ শীর্ষক সেশনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের থিয়েটার জগতের এই দুই দিকপাল।

একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ সেশনের মধ্যদিয়ে শেষ হয় ঢাকা লিট ফেস্টের এ আয়োজন। এতে আলোচনায় অংশ নেন ভারতের লেখক মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। যার ডাক নাম শঙ্কর। সঙ্গে ছিলেন লেখক ইমদাদুল হক মিলন। সব শেষে ছিল সঙ্গীতশিল্পী চন্দনা মজুমদারের লোকগান পরিবেশনা।

প্রকাশিত : ১০ নভেম্বর ২০১৯

১০/১১/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: