২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিষের পসরা


মুখরোচক খাবার দেখে জিভে বড়দেরই জল আসে, শিশুদের দোষারোপ করার সুযোগ নেই। তাছাড়া পথে-ঘাটের খাবার খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে একথা জেনেও প্রাপ্তবয়স্করা অনেক সময় লোভ সংবরণ করতে পারেন না। আর শিশুরা তো এসব বিষয়ে অনেকটাই অসচেতন। ফলে না বুঝেই তারা এইসব খাবার খায় এবং রোগ বাঁধিয়ে ফেলে। স্কুলের সামনের ঝালমুড়ি, ফুচকা, আচারসহ নানা মুখরোচক খাবার বিক্রি হয়ে থাকে অবাধে। রাজধানীর ৪৬টি থানায় অবস্থিত স্কুলের সামনে থেকে ৪৬টি ঝালমুড়ি, ৩০টি ফুচকা, ১৬টি ভেলপুরি ও ৪২টি আচারের নমুনা সংগ্রহ করা হয় পরীক্ষার জন্য। এগুলো জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। সেসব পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় শনিবার, যা গণমাধ্যমে আসে। সেই ফল দেখে যে কারুরই আঁৎকে ওঠার কথা। এসব খাবারে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিস রোগের জীবাণু পাওয়া গেছে। তার সোজা অর্থ হলো স্কুলগামী শিশুদের চোখের সামনে বিষের পসরা সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। আর তারা অজ্ঞতাবশত সেসব খাচ্ছে এবং রোগাক্রান্ত হচ্ছে।

খুব সহজেই যে কেউ বলে দিতে পারে, এইসব খাবার-বিক্রেতাকে স্কুলের চৌহদ্দি থেকে তাড়িয়ে দিলেই তো হয়। তাহলে আর ঝুটঝামেলা থাকে না। কিন্তু বিষয়টি কি এতই সরল? একটি স্কুলের শিক্ষিকা বলেছেন, স্কুলের সীমানার বাইরে তাদের সরিয়ে দিলেও তারা এলাকা ছেড়ে যায়নি। খানিকটা দূরে গিয়ে বসেছে আর শিশুরাও সেখানে গিয়ে লোভনীয় খাবারগুলো কিনে খাচ্ছে। অবশ্য চিকিৎসকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা শিশুদের সচেতন করার জন্য অভিভাববকদের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন। রোগ হওয়ার আগে প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে এটি মন্দ নয়। কিন্তু উপদেশ দিয়ে কি শিশুদের ওইসব জীবাণুযুক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে! সেটা কি বাস্তবসম্মত? এক্ষেত্রে স্ব স্ব এলাকার সমাজকর্মী বা স্কুলের পক্ষ থেকে কয়েকজন গিয়ে ওইসব খাবার বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি খাবার সংগ্রহ ও পরিবেশনার জন্য অনুরোধ করতে পারেন। কিন্তু এই অনুরোধে কতটুকু কাজ হবে? আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় উদ্যোগের কথাও অভিভাবকরা বলবেন হয়ত। এসবই সাময়িক ব্যবস্থা অল্প ক’দিন পর গণমাধ্যমে লেখালেখি বন্ধ হয়ে গেলে আবার পূর্বেকার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে চলে যেতে পারে বিষয়টি। স্কুলে স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন থাকলেও পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। যদি সত্যি সত্যি অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার হাত থেকে আমাদের শিশুকে বাঁচাতে চাই তাহলে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতেই হবে। এক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি ও আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ কাজে আসতে পারে।

তাছাড়া শুধু স্কুলের সামনে তো নয়, পুরো ঢাকা শহরেই পথের খাবারের ছড়াছড়ি। ২০১৫ সালে আইসিডিডিআরবির সঙ্গে এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকায় ১০ হাজারেরও বেশি স্ট্রিট ফুড বা পথখাবার বিক্রেতা ছিল। এখন সন্দেহাতীতভাবে সংখ্যাটি বেড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকায় দুই বছরের মধ্যে পথখাবারে জীবাণুর সংক্রমণ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ-আইসিডিডিআরবির গবেষণায় পথখাবারে জীবাণুর হার দেখা গিয়েছিল ৫৫ শতাংশ। আর গত শনিবার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে তা উঠে গেছে প্রায় ৯০ শতাংশে। যেখানে বেশির ভাগই পাওয়া গেছে স্কুলের সামনের পথখাবারে।

পথখাবার তৈরি ও বিক্রির ওপর নির্ভরশীল ঢাকার হাজার হাজার পরিবার। তাদের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসাটাই হবে নিরাপদ পথখাবার সংস্কৃতির প্রাথমিক কাজ। সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে তাদের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হলে পরিস্থিতিরি যে উন্নতি হবে, এটা সাধারণভাবে বলা যায়। আমাদের শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যত গড়ার কাজে কোন অবহেলা কাম্য নয়।