২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

স্মার্টফোন ॥ ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবেশদ্বার


‘নগদ না থাকলেও সমস্যা হবে না। মোবাইল দিয়ে দাম নিয়ে নেব।’ রোজ চার রাস্তার মোড়ে ফুল নিয়ে বসে মেয়েটা। আসন পেতে বসে সামনে বিভিন্ন ফুলের পসরা নিয়ে। সকালবেলার পথ চলতি মানুষই তার ক্রেতা। সূর্য মধ্যগগনে যাওয়ার উপক্রম করলেই আসন গুটিয়ে, অবিক্রীত ফুল পাশে রাখা চটের থলেতে ভরে উঠে পড়ে সে। নিত্যদিন আসা-যাওয়ার পথে এই ফুলওয়ালীকে দেখি। কেমন যেন সকালের তরতাজা পরিবেশের সঙ্গে সে দিব্বি মানিয়ে গেছে।

সেদিন মোড়ের মাথায় ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে গেলাম। হঠাৎ দেখি ফুলওয়ালী তার মোবাইল বের করে বেশ জোরে জোরে কি যেন বলছে। কৌতূহলবশে গাড়ির কাঁচ নামাতেই কানে এলো কথাগুলো। চারদিকে গাড়ির আওয়াজের মধ্যেও দিব্বি তার রিনরিনে গলার চিৎকার স্পষ্ট শোনা গেল। সিগন্যালের রং সবুজ হওয়ায় তার বাকি কথা অবশ্য আর শোনা হয়নি। কিন্তু কথার রেশ রয়ে গেছে। যত দিন যাচ্ছে কথাগুলো যেন আরও বেশি করে চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

ভারত ডিজিটাল ইন্ডিয়া হওয়ার রাস্তায় নেমে পড়েছে যে। বস্তুত এ ডিজিটাল হওয়ার প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগেই। শহরের বড় বড় বিপণিতে গেলে নগদের পরিবর্তে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের ডেবিট অথবা ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার করা যাচ্ছিল। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে ট্রেন, বাস, বিমানের টিকেট কাটা যাচ্ছিল। অনলাইনে নাটক, চলচ্চিত্রের দর্শকাসন ও আগাম কেনা যাচ্ছিল। রেস্তরাঁতে, হাসপাতালেও কার্ড দিয়ে বিল মেটানো যাচ্ছিল। সবই হচ্ছিল; কিন্তু সবটাই হচ্ছিল ভারতের বড় বড় শহরে।

শহুরে পরিবেশ থেকে একটু বেরোলেই এই ডিজিটাল হাবভাবের ছবি উধাও। হাইওয়ের পেট্রোল পাম্প নগদ ছাড়া গাড়িতে জ্বালানি ভরবে না, ছোট-বড় কোন দোকানদারই কড়কড়ে নোট হাতে না গুঁজে দিলে জিনিস বিক্রি করবে না অর্থাৎ দেশজোড়া নগদের সাম্রাজ্যের মাঝে ডিজিটাল লেনদেন ছোট্ট দ্বীপের মতো।

আর শহরের চিত্রটা অদ্ভুত এক বৈপরীত্যে ভরা। বেশিরভাগ চাকরিজীবী আর বড়, মাঝারি ব্যবসায়ী তার ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্টের টাকা এটিএম থেকে তুলে নগদে কেনাবেচা করেন অর্থাৎ শহরাঞ্চলেও একটা আধা খেঁচড়া ডিজিটাল অর্থনীতি, যেখানে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা সেখানে অর্থনীতির কিছুটা লাগাম ব্যাঙ্কের হাতে। অন্যভাবে বললে, কেউ ব্যাঙ্ক থেকে কতটা টাকা তুলছে সেটা বোঝা গেলেও সেই টাকা অর্থনীতিতে কোথায় কিভাবে ঢুকছে তা পরিষ্কার নয়। অর্থনীতিবিদরা ঠিক এ জায়গাতেই কালো টাকা বা বেআইনী পদ্ধতিতে উপার্জিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশের আশঙ্কা করছেন।

বিষয়টা একটু বোঝানো যাক। ধরা যাক কারোর উপার্জন মাসে ১ হাজার টাকা। মাসের প্রথমে ব্যাঙ্কে জমা হয় সেই অর্থ অর্থাৎ আয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে নথিভুক্ত হলো। কিন্তু এরপর যখন সেই অর্থ মূলত এটিএম-এর মাধ্যমে তুলে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে তখন তার কোন পরিমাণ মাপা যাচ্ছে না।

এখানে টাকা তোলা বা জমা দেয়া বা চেক জমা দেয়া, বিদ্যুত, টেলিফোনের মতো কাজ করা অটোমেটেড টেলর মেশিনের (এটিএম) ব্যাপারে একটু আলোকপাত করা যাক। আজকের এই ডিজিটাল জমানায় ব্যাঙ্কের পরই এই যন্ত্রের মাহাত্ম্য। ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা যাচ্ছে স্কটিশ আবিষ্কারক জন শেফার্ড ব্যারনের তৈরি এটিএম ১৯৬৭ সালের ২৭ জুন লন্ডনের শহরতলীতে বার্কলেস ব্যাঙ্কের শাখায় বসানো হয়। জনশ্রুতি যে, বাথটাবে শুয়ে শুয়ে এটিএম-এর আইডিয়া জনের মাথায় আসে।

আবার এই জনের পারিবারিক ইতিহাস ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লতায়-পাতায়। জনের বাবা উইলফ্রেড শেফার্ড ব্যারন ছিলেন চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার্সের চীফ ইঞ্জিনিয়ার। উইলফ্রেড পরে পোর্ট অব লন্ডন অথরিটিরও চীফ ইঞ্জিনিয়ার হন। ১৯২৫ সালের ২৫ জুন শিলংয়ে জন জন্মগ্রহণ করেন। জনের মা ডোরোথিও কিছু কম যাননি। তখনকার দিনের দুনিয়া কাঁপানো মহিলা টেনিস খেলোয়াড়দের অন্যতম ছিলেন তিনি। অলিম্পিক খেলেছিলেন, মায় উইম্বলডনে মহিলাদের ডাবলসও জিতেছিলেন। জনের ব্যক্তিগত জীবনও কম চিত্তাকর্ষক ছিল না। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত ট্রিনিটি কলেজ থেকে অর্থনীতি নিয়ে পড়া জন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর ১৫৯ প্যারাসুট লাইট রেজিমেন্টের এয়ারবোর্ন ডিভিশনে ছিলেন।

তবে এখন যে পার্সোনাল আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (পিআইএন বা পিন) ব্যবহার করে এটিএম ব্যবহার করা হয় সেটা কিন্তু জনের উদ্ভাবিত যন্ত্রে ছিল না। জনের চেয়ে বছর বারোর ছোট আরেক স্কটিশ ইঞ্জিনিয়ার জেমস গুডফেলোর ডিজাইন করা মেশিনে ব্যাঙ্কের এ্যাকাউন্ট গ্রাহকরা চার সংখ্যার পিন ব্যবহার করে টাকা তুলতে পারতেন। জেমসের এই আবিষ্কারের পিছনে আবার অন্য কারণ রয়েছে। ব্রিটেনে সে সময় ব্যাঙ্কের টেলররা (যারা ব্যাঙ্কের গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেন বা গ্রাহকদের অর্থ দেন) যাতে শনিবার সকালটা নিজেদের কাজ করার জন্য ছুটি পান তার জন্য ব্যাঙ্কের কর্মী সংগঠনগুলো দাবি তুললেন। কিন্তু টেলররাই যদি না থাকেন তাহলে গ্রাহক পরিষেবা তো শিকেয় উঠবে। অতএব যন্ত্রের ভাবনা আর তা থেকেই ৪ সংখ্যার পিন দেয়া এটিএম আবিষ্কারের বীজ বপন। তবে জনের কাছে এটিএম-এর পিতৃত্বে¡র সরকারী স্বীকৃতি হারানোর যন্ত্রণা কিন্তু কাঁটার মতোই বিঁধেছিল। পরে আক্ষেপ করে তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘বন্ধু, বান্ধব, আত্মীয়রা এটিএমকে জনের টাকা যন্ত্র হিসেবেই জানে।’

আবার ডিজিটাল অর্থনীতিতে ফিরে আসি। স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে এটিএম আংশিকভাবে এতে সহায়তা করতে পারে। তাহলে রাস্তাটা কি পুরোপুরি ডিজিটাল হওয়ার? আপাতত দিল্লী নোট বাতিলকেই এই রাস্তায় এগোনোর কান্ডারি হিসেবে ধরছে। গত ৮ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদি রাত ৮টায় যখন সেই রাত ১২টার পরে ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ঘোষণা করলেন সারাদেশ কার্যত তারপর থেকেই এটিএম-এর লাইনে দাঁড়িয়ে গেল। তথ্য বলছে, ৮ নবেম্বরে দেশে ১৭.৯৭ লাখ কোটি টাকা বাজারে ছিল, যার মধ্যে ৮.৫৮ লাখ কোটি টাকা ৫০০ টাকার নোট আর ৬.৮৬ লাখ কোটি টাকা ছিল হাজার টাকার নোট। চলতি বছরের মার্চের শেষে ভারতের বাজারে রয়েছে ১৩.৩২ লাখ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু এটিএম থেকে তোলা অর্থ কোন্ খাতে কিভাবে ব্যয় হচ্ছে তার অনেকটাই অন্ধকারে, তাই প্রথমেই এটিএম-এ রাখা টাকার পরিমাণ কমানো হয়েছে। তথ্য বলছে, ২০১৬-এর নবেম্বরে যে অর্থ দেয়া হতো এটিএমগুলোকে এখন তার অর্ধেক দেয়া হচ্ছে। নবেম্বরে যেখানে দেশের হাজার পঞ্চাশেক এটিএম-এর প্রত্যেকটিতে গড়ে ১২ লাখ টাকা করে অর্থ যোগান দেয়া হতো, মার্চে সেই অঙ্কটা অর্ধেক হয়ে গেছে। এক ব্যাঙ্কের এটিএম কার্ড নিয়ে অন্য ব্যাঙ্কের এটিএম ব্যবহার করলে তাকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় আন্তঃব্যাঙ্ক এটিএম লেনদেন বা ইন্টার ব্যাঙ্ক এটিএম ট্রানজাকসন বলে (আইএটি)। অক্টোবরে ৩০ কোটিবার লেনদেন হয়েছে ১.১ লাখ কোটি টাকার অথচ নোট বাতিলের চাপে তা পরের মাসেই এ ধরনের লেনদেন হু হু করে কমেছে। ২০১৬ সালের নবেম্বরে ২৩ কোটি আইএটির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭ লাখ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের মার্চে এসে অবশ্য দেখা যাচ্ছে নোট বাতিলের ধাক্কাটা কিছুটা হলেও আমজনতা সামলিয়েছে। ওই মাসের শেষে দেখা যাচ্ছে ২৭ কোটিবার কার্ড ব্যবহার করে ১.০৮ লাখ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।

এই পর্যন্ত ঠিকই আছে। সমস্যাটা কিন্তু অন্যত্র। আদতে নোট বাতিল করা হয়েছিল হিসাবহীন আয়কে বন্দী করা বা সাদামাটা বাংলায় আমরা যাকে কালো টাকা বলি সেটাকে ধরার জন্য। সেই লক্ষ্য কতদূর সাধিত হয়েছে তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন রয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের যুক্তি, কেইনসীয় অর্থনীতি মডেলে (আধা খেঁচড়াভাবে যে মডেল দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অর্থ ব্যবস্থা অনুসরণ করে) কোন ব্যক্তির কাছে নগদ টাকা ছাড়াও ব্যাঙ্কের নানা ধরনের বন্ড ও বিভিন্ন সংস্থার শেয়ার, ডিবেঞ্চার থাকতে পারে। এশীয় অর্থনীতিতে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে সোনা, রুপার মতো মূল্যবান ধাতুও। এ ছাড়া বেআইনী পথে উপার্জনও ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ সরাসরি কালো টাকা আংশিকভাবে নগদ অর্থে আছে, পুরোটা নয়। তাই নোট বাতিল করে কালো টাকার বিরুদ্ধে অভিযানে কাক্সিক্ষত ফল নাও মিলতে পারে।

কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতি হওয়ার পক্ষে এটা যে বড়সড় পদক্ষেপ তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক ধাক্কায় খুচরো বিক্রির একটা বিশাল অংশ ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় চলে এসেছে।

ভারতে ডিজিটাল লেনদেনের একটা বড় অংশ হয় স্মার্টফোন মোবাইল (অর্থাৎ যেসব মোবাইল হ্যান্ডসেটের পর্দা তুলনামূলকভাবে বড় আর তাতে ইন্টারনেটের পরিষেবা পাওয়া যায়) হ্যান্ডসেটে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ আর ২০১৬ সালে ভারতে গড়ে ১০ কোটি স্মার্টফোন ঢুকেছে। ২০১৭ সালের প্রথম ৩ মাসেই ভারতে প্রায় ৩ কোটি স্মার্টফোন ঢুকেছে। মনে করা হচ্ছে ২০১৭ সালে ১৩ কোটি স্মার্টফোন আসবে ভারতে।

আরেক বিশেষজ্ঞ সংস্থার রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতে ২০১৪ সালে যেখানে ৫৮ কোটি মোবাইল গ্রাহকের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার করত, ২০১৬ সালের শেষে দেখা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৬৮ কোটি মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় সাড়ে বিশ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার করে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, চলতি বছরে দেশের ৭৩ কোটি মোবাইল গ্রাহকের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২৪ কোটি ছুঁতে পারে। ২০১৯ সালে দেশের সাড়ে ৮১ কোটি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৩২ কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারে।

এবার এসব স্মার্টফোনের মাধ্যমে কেনাবেচা (পরিভাষায় যাকে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস) ধরা যাক। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের নবেম্বর মাসে ৩ লাখবার বিক্রি হয়েছিল মোবাইলের মাধ্যমে। বিক্রির পরিমাণ ৯০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ মাসেই শুধু ৬২ লাখবার বিক্রি হয়েছে ২৩৯০ কোটি টাকার পণ্য।

একইভাবে বাংলাদেশেও হু হু করে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ কোটি মোবাইল গ্রাহক ছিল (ওই মাসে ৩১ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ২৯ লাখ)। পাঁচ বছর পরে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মোবাইল গ্রাহক বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ( ওই মাসে ৬ কোটি ৭২ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ৬ কোটি ৩১ লাখ ছিল মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী)। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে মোট মোবাইল গ্রাহকের মাত্র ৩ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে উত্তরণ হয়েছে বাংলাদেশের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের। পাঁচ বছরে বাংলাদেশে বেড়েছে ৬ কোটি মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

অন্য পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালে প্রায় ২২ কোটি ডলারের বিভিন্ন বিদেশী ব্র্যান্ডের মোবাইল হ্যান্ডসেট বাংলাদেশের বাজারে এসেছিল, যার মধ্যে স্মার্টফোন ছিল অতি নগণ্য। অথচ ২০১৬ সালে বাংলাদেশে যেখানে ১৭ কোটি ডলারের সাধারণ ফিচার মোবাইল হ্যান্ডসেট এসেছে, সেখানে স্মার্টফোন হ্যান্ডসেট এসেছে ৩৮ কোটি ডলারের। এই-ই শেষ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মোবাইল বাজারে যেখানে আসতে পারে ৬১ কোটি ডলারের বিভিন্ন বিদেশী ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন, সেখানে সাধারণ ফিচার ফোন আসতে পারে ১৪ কোটি ডলারের।

সমালোচকরা অনেক সময় স্মার্টফোনের সঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতির নিবিড় সম্পর্ককে অতিসরলীকরণ বলে আখ্যা দেন। তাদের যুক্তি, গ্রাহক মূলত ক্যামেরায় ছবি তোলা, গান শোনা, মোবাইল গেমস খেলা, বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ঘোরার জন্য স্মার্টফোনের জগতে ঢোকেন। ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে তাদের অত মাথাব্যথা নেই।

মূলত দুটি কারণে এ সমালোচনা ভ্রান্ত। প্রথমত. যে মুহূর্তে মোবাইলের মাধ্যমে নেট ব্যবহার শুরু করছেন সেই মুহূর্ত থেকে তিনি যেমন ছবি তুলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে পোস্ট করে ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ করছেন, তেমনি তিনি যতই নেট দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন ততই ডিজিটাল তথ্যের চাহিদা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত. তুলনামূলকভাবে সুলভে অনেক বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো যাবে বুঝতে পেরে ব্যাঙ্কসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ই-কমার্স সংস্থা, পরিবহন, বিনোদন, এমনকি হোটেল, হাসপাতালের মতো বিভিন্ন পরিষেবা সংস্থা তাদের পরিষেবার প্রবেশদ্বার হিসেবে স্মার্টফোনের পর্দাকে ব্যবহার করছে। গ্রাহকের যে এতে অনেক সময় আর অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে তাই নয়, ডিজিটাল অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতেও এটা পরোক্ষে সাহায্য করছে।

শুধু স্মার্টফোন দিয়ে কিছু বিল মেটানো, ব্যাঙ্কের কাজ করা, জিনিস কেনাকাটা করলেই যে সর্বতোভাবে ডিজিটাল অর্থনীতি চালু হয়ে যাবে না এটা যেমন সত্যি, তেমনি স্মার্টফোন ডিজিটাল অর্থনীতির ইঞ্জিন চালু করার অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি এটা আরও বড় সত্য। তাই সব মিলিয়ে শুধু যে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই টেলিযোগাযোগ হয়েছে তা নয়, দেশের মোবাইল ব্যবহারকারীদের কার্যত অর্ধেক স্মার্টফোন ব্যবহার করায় ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের প্লাটফর্মও আদতে প্রস্তুত।

নবেম্বরের নোট বাতিল ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির পথকে এক ধাক্কায় অনেক সচল করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দু’দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি অন্যদের কাছে রোল মডেল হতেই পারে।

লেখক : ভারতীয় সিনিয়র সাংবাদিক