২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অভিমত ॥ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা


বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোন দেশ এখন একা চলতে পারে না। তাই উন্নয়ন, অবকাঠামোসহ সামগ্রিক ক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহযোগিতা। বিশেষ করে আর্থিক, কারিগরি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তদুপরি জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রসমূহের শান্তি, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ নানা বিষয়ে পরামর্শ এবং আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা দিয়ে থাকে। জতিসংঘের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হয়।

২০০০ সালে বাংলাদেশসহ অপরাপর সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে ‘এমডিজি’ তথা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা ও তা বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা দেয় জাতিসংঘ। বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের আগেই এমডিজির অধিকাংশ এজেন্ডা সঠিক ও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে জাতিসংঘসহ বিশ্ব পরিম-লে প্রশংসিত হয়েছে। বর্তমানে পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়নের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এখন শুধু উন্নয়ন করলেই চলবে না তা হতে হবে ‘টেকসই’। আর সে কারণে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মহাসচিব বান কি মুন বিশ্বের ১৯৭টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সর্বসম্মতিক্রমে ঘোষণা করেন ‘এসডিজি’ বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল। তারই আলোকে বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও এসডিজি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে জনগণ, দেশ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন চাহিদায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। মানুষের ভোগবাদিতার ক্ষেত্রে যেমন পরিবর্তন এসেছে তেমনি জীবনযাত্রায়ও এসেছে বৈচিত্র্য। এটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য। এর সঙ্গে এখন বড় বাধা ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানবপাচার প্রভৃতি। এসব বিষয় মোকাবেলা করাটাও বৈশ্বিক ও স্থানীয়ভাবে প্রতিটি দেশ ও জনগণের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীকে এসব মোকাবেলার পাশাপাশি বৈশ্বিক উন্নয়ন চাহিদা পূরণে কাজ করে যেতে হচ্ছে।

এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ২০১৫ এর ২৫ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতোমধ্যেই এসডিজি লক্ষ্যসমূহের মধ্যে কোন্টি কোন্ মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বাস্তবায়ন করবে এবং কোন্ মন্ত্রণালয় লিড এজেন্সি হিসেবে কাজ করবে এর একটি খসড়া ম্যাপিং তৈরি করেছে। ম্যাপিংয়ে লিড, কো-লিড এবং এ্যাসোসিয়েট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নির্ধারণ করে খসড়া তৈরির কাজ শেষ করা হয়েছে। এর পরই তৈরি হবে এসডিজি বাস্তবায়নের মূল এ্যাকশন প্ল্যান।

এসডিজিতে প্রণীত ১৭টি অভীষ্ট হচ্ছে- ১. সব রকমের দারিদ্র্যের অবসান; ২. ক্ষুধার অবসান এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি লক্ষ্য অর্জন; ৩. সব বয়সীদের উন্নত জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ; ৪. সবার জন্য সার্বিক ও ন্যায়সঙ্গত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও আজীবন শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি; ৫. লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং মহিলা ও কন্যা সন্তানের ক্ষমতায়ন; ৬. সবার জন্য পানি ও স¦াস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ; ৭. সবার জন্য নির্ভরযোগ্য, ব্যয়ভার বহনযোগ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ¦ালানি প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি; ৮. সার্বিক ও টেকসই আর্থিক উন্নতি বিধান, সবার জন্য উৎপাদনশীল ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান; ৯. টেকসই ও স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন এবং উদ্ভাবনকে লালন করা; ১০. নিজ দেশে এবং অন্য দেশের সঙ্গে বৈষম্য হ্রাস; ১১. শহর ও মানব বসতিগুলোকে পূর্ণাঙ্গ, নিরাপদ এবং স্থিতিস্থাপক ও টেকসইরূপে গড়ে তোলা; ১২. উৎপাদন ও ভোগের টেকসই কাঠামো গঠন; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ; ১৪. সাগর-মহাসগর সংরক্ষণ এবং সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন; ১৫. বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ, ভূমিক্ষয় ও জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি রোধ; ১৬. পূর্ণাঙ্গ ও শাস্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান ও সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ১৭. টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও তার বাস্তবায়নে অবদান রাখা।

॥ দুই ॥

জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ অর্জনে সফল হয়েছে বাংলাদেশ। ‘মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস : এ্যান্ড-পিরিয়ড স্টকটেকিং এ্যান্ড ফাইনাল ইভালুয়েশন রিপোর্ট (২০০০-২০১৫)’ শীর্ষক চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটটি লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ২১টি টার্গেটের মধ্যে ১৩টি নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশ এসব ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও আফগানিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য সুখবর। এমডিজির প্রায় নিরানব্বই ভাগ সফল বাস্তবায়ন হওয়ায় জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমাদের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এসডিজি বাস্তবায়নে গৃহীত কর্মপরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা-ভাবনা নিয়ে প্রণয়ন করা দরকার। কারণ, বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও সমস্যা সঙ্কুল দেশে জমি, সম্পদ, সময় প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়ন এজেন্ডা তথা উন্নয়ন কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরী। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বহু অর্থ ও সময় ব্যয় করে কোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার পর তার প্রয়োজনীয়তা বা সুফল ঠিক ততটা মানুষ পায় না, অথবা পেলেও তা হয় স্বল্পস্থায়ী। এবার এসডিজির উন্নয়ন এজেন্ডা প্রণয়নে সেই বিষয়টি গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই সত্যিকার অর্থে প্রকল্পসমূহের যৌক্তিকতা নির্ণয়ে সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা ও দর্শন থাকতে হবে। তাহলেই ‘এমডিজির’ মতো ‘এসডিজি’র সুফলও ভোগ করবে দেশের জনগণ ও তাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম।

motaherbd123@gmail.com