২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

গ্রামের মানুষ নিজেরাই পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে


আরাফাত মুন্না, রাজশাহী থেকে ফিরে ॥ শিলমারিয়া বাজারে এখন সড়কবাতি থাকায় সন্ধ্যার পরও বাজার জমজমাট। আগে সন্ধ্যার পর অন্ধকারের কারণে বাজারে আসতে খুব একটা আগ্রহী হতাম না। ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সভায় সড়কবাতি নির্মাণ করার জন্য আমরাই প্রস্তাব করেছিলাম, রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলার শিলমারিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইদুর রহমান জনকণ্ঠের কাছে তার অনুভূতির কথা এভাবেই ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, শিলমারিয়া ইউনিয়ন পাখিদের একটি অভয় আশ্রম এবং দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ এখানে পাখি দেখতে আসেন। তাই জনগণের প্রস্তাবের আলোকে ইউনিয়ন পরিষদ এলজিএসপি-২ এর বরাদ্দ থেকে পাখি দেখার জন্য এলাকায় একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার স্থাপন করেছে। শিলমারিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সুপারভিশন কমিটির সভাপতি কার্তিক চন্দ্র প্রামানিক জনকণ্ঠকে বলেন, বাজারে সৌর বিদ্যুত চালিত স্ট্রিট লাইট স্থাপন সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা আমি তদারক করেছি। কাজের মান যথাযথ হয়েছে বলে আমরা ইউনিয়ন পরিষদকে লিখিত সুপারিশ করার পরই কেবল সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বিল পেয়ে থাকেন।

একই উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের শাহাবাজপুর হাইস্কুলের বাউন্ডারি ওয়াল না থাকায় স্কুলের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হতো। ইউনিয়নের ওয়ার্ড পরিকল্পনা সভায় আমরা এ স্কুলে একটি সীমানা প্রাচীর তৈরি করার জন্য এলজিএসপি-২ এর বরাদ্দ থেকে একটি দেয়াল নির্মাণের প্রস্তাব করি। সভায় সর্বসস্মতভাবে এ স্কিমটি অগ্রাধিকার পাওয়ার ফলে এ ওয়ালটি নির্মাণ করা সম্বব হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দা খলিলুর রহমান জনকণ্ঠকে এ তথ্য জানান।

বানেশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সুলতান আলী জনকণ্ঠকে বলেন, এলজিএসপি-২ এর আওতায় ইউনিয়ন পরিষদের যেসব কাজ হয়, তার সবগুলোতেই জনগণের পুরোপুরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমি প্রায় বিশ বছর ধরে চেয়ারম্যান। তবে এর আগে যখন কোন প্রকল্প গ্রহণ করতাম, তখন মেম্বারদের ডেকে প্রকল্প তৈরি করে সেটা পাঠাতাম ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী অফিসার) অফিসে। সেখান থেকে প্রকল্প পাস করলে কাজ করতে পারতাম। বর্তমান কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন ওয়ার্ড সভায় সাধারণ জনগণ কাজের চাহিদা দেয়। পরে উন্মুক্ত বাজেট সভার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্কিম তৈরি করা হয়। এর পর বাজেট চূড়ান্তকরণ মিটিংয়ে বাজেট অনুমোদন দেয়ার পর বাজেটের একটি কপি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পর্যালোচনা ও মতামতের জন্য প্রেরণ করা হয়। উপজেলায় ব্লকগ্রান্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটির মতামত ও পর্যবেক্ষণ পাওয়ার পর স্কিমসমূহ বাস্তবায়ন করে থাকি।

তিনি বলেন, স্কিম বাস্তবায়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড কমিটিতে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধি থাকে। আর স্কিমের কাজ যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে স্কিম তত্ত্বাবধান কমিটি কাজ করে। এভাবেই স্কিম পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে স্থানীয় জনগণ সরাসরি যুক্ত থাকেন। ফলে কাজের গুণগতমান অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সম্পদের অপচয় রোধ হচ্ছে।

শিলমারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল জনকণ্ঠকে বলেন, এলজিএসপি-২ চালু হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের কাজে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। আগের তুলনায় ইউনিয়ন পরিষদের কাজও অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, এখন কাজের চাহিদা জনগণের মাধ্যমেই আসে, আবার কাজের তত্ত্বাবধানও জনগণই করে। ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক এ্যাকাউন্টে সরাসরি অর্থ ছাড় দেয়ার কারণে এখন টাকা পেতেও কোন সমস্যা হয় না বলে জানান শিলমারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তিনি দাবি করেন, শুধু তার ইউনিয়নই নয়, এলজিএসপি-২ এর আওতায় সারাদেশের সকল ইউনিয়নে এভাবেই উন্নয়ন কাজ এগিয়ে চলছে।

ওয়ার্ড সভার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের সদস্য আলমগীর হোসেন আলম জনকণ্ঠকে বলেন, ওয়ার্ডের মোট ভোটারের কমপক্ষে ৫ শতাংশকে ওয়ার্ড সভায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানাই। এ সভায় উপস্থিত জনগণ এলাকায় কি কি স্কিম গ্রহণ করা যায় সে বিষয়ে প্রস্তাব আহ্বান করেন। তখন এলাকার মানুষ বিভিন্ন স্কিমের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, স্থানীয়দের চাহিদা পাওয়ার পর আমরা চাহিদাগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিরিয়াল করি। পরে উন্মুক্ত বাজেট সভায় এসব চাহিদা ফেস্টুন করে টানিয়ে রাখা হয়। বাজেট সভা থেকেই কোন কাজগুলো করা হবে তা চূড়ান্ত করা হয়ে থাকে।

তিনি আরও বলেন, এলজিএসপি-২ এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়ন কাজ করায় এখন সাধারণ জনগণ তাদের চাহিদার আলোকে স্কিম গ্রহণ করতে পারছেন। এর ফলে এলাকার উন্নয়ন কাজ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলেও মনে করেন এই ইউপি সদস্য। শিলমারিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মোঃ গোলাম রসুলও প্রায় একইভাবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনিও বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ীই তারা সকল কাজ করে থাকেন। এমনকি কাজের তদারকিও সাধারণ জনগণই করে।

বানেশ্বর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও স্কিম সুপারভিশন কমিটির সদস্য শিরিন আক্তার জনকণ্ঠকে বলেন, বানেশ্বর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে পাঁচটি টিউবওয়েল দেয়া হয়েছে। এ স্কিমটি আমি তদারকি করেছি। টিউবওয়েলগুলো সঠিক জায়গায় গেল কি না, বসানো সঠিকভাবে হয়েছে কিনা, গোড়া পাকা করা হয়েছে কি না, সব কিছুই দেখেছি। তিনি বলেন, ২নং ওয়ার্ডের একটি রাস্তা তৈরির কাজও তদারকি করেছি। এলাকার একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার কাছে খুবই ভাল লাগে, এখন ইউনিয়নে কোন কাজ হলে সাধারণ জনগণ সব কিছু জানতে পারছে, কিভাবে কাজ হচ্ছে তাও তারাই তদারকি করছে। এখন ইউনিয়ন পরিষদে আমাদের কথা বলার সুযোগ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শিরিন আক্তার।

এলজিএসপি সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জনসাধারণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে এবং ইউনিয়ন পরিষদকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে এলজিএসপি-২ অন্যতম একটি প্রকল্প। ২০০০ সালে সিরাজগঞ্জে গৃহীত পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে স্থানীয় সরকার বিভাগ ২০০৬ সালের জুলাই থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত লোকাল গবর্নেন্স সাপোর্ট প্রজেক্ট (এলজিএসপি) বাস্তবায়ন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের জুলাই থেকে নবেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত এলজিএসপি-২ বাস্তবায়ন করছে।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদকে সরাসরি থোক বরাদ্দ দেয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় জনগণ সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের অগ্রাধিকার অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এলজিএসপি-২ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের ফলে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ওয়ার্ড পর্যায়ে, প্রকাশ্য সভায় সকলের অংশগ্রহণে ওয়ার্ড কমিটি এবং স্কিম তত্ত্বাবধান কমিটি গঠন করা হয়। সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্যরা কমপক্ষে তিনটি ওয়ার্ড কমিটির আহ্বায়ক হয়ে থাকেন। একজন মহিলা সদস্য, তার নির্বাচনী এলাকায় পালাক্রমে তিনটি ওয়ার্ড কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় পর্যায়ে জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ পল্লী অঞ্চলে দারিদ্র্য দূরীকরণে এলজিএসপি-২ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পেরেছে। তাছাড়া ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদকে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে এলজিএসপি-২ ইতোমধ্যেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করেন বানেশ্বর ও শিলমারিয়া দুই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: