২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

থ্যালাসিমিয়া


সোমা একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি করে। সুজন সোমার স্বামী, ভীষণ সুখী তারা। সন্তান সাদিদ একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা ডাক্তারের কাছে যায়। বাচ্চার শরীর ফ্যাকাশে দেখে ডাক্তার রক্তশূন্যতা মনে করে সাদিদকে ভিটামিন ওষুধ খেতে দেয়। কয়েকদিন ওষুধ সেবনের পরও উন্নতি না হলে তারা আবারও ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। তিনি রোগটি ধরতে পারেননি। পরবর্তীতে সোমা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপককে দেখালে উনি সাদিদকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে রেফার করেন।

সুজন, সোমা এবং সাদিদকে ডাক্তার হিমোগ্লোবিন-ইলেকট্রোফোরেসিস ((Hb-Electrophoresis) টেস্ট করতে বলে। তিনজনেরই ইষড়ড়ফ ঞবংঃ জবঢ়ড়ৎঃ থেকে জানা যায় সোমা এবং সুজন দু’জনই থ্যালাসিমিয়ার বাহক। আর বাবা এবং মা দু’জনের (বাহকের) মাধ্যমে জন্ম হয়েছে সাদিদের মেজর থ্যালাসিমিয়া। সাদিদকে বাঁচাতে হলে নিয়মিত রক্ত দিতে হবে।

থ্যালাসিমিয়া এমন একটি বংশগত রোগ যে রোগে রক্তে হিমোগ্লোবিন সংশ্লেষণ কমে যায়। হিমোগ্লোবিন হলো রক্তের এমন উপাদান যা অক্সিজেনকে শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয়। প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রী চায় তাদের সন্তান সুস্থ থাকুক। কিন্তু কেউ চিন্তা করে না বিয়ের আগে তাদের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। ফলে অনেকের সংসারে আসছে জন্মগত রোগে আক্রান্ত শিশু। আমাদের দেশে থ্যালাসিমিয়া একটি মারাত্মক জন্মগত রক্তরোগ। হিমোগ্লোবিন ডিসঅর্ডারজনিত একটি বংশগত রোগ যা মাতা-পিতা থেকে জিনের (এবহব) মাধ্যমে সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে।

যারা থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক তাদের কোন উপসর্গ নেই, তারা কিছু বুঝতে পারে না। এটি কোন যৌন বা ছোঁয়াচে রোগ নয় যে পরস্পরের সংস্পর্শে সংঘটিত হয়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে বাহক হলে তাদের সন্তান থ্যালাসিমিয়া রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে। একজন বাহক হলে কোন সমস্যা নেই। তবে সন্তানও বাহক হতে পারে।

অসচেতনতার কারণে দেশে থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর এ রোগে আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। দেশে প্রতি বছর থ্যালাসিমিয়া রোগ নিয়ে জন্ম নিচ্ছে প্রায় আট হাজার শিশু। সারাদেশে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখেরও বেশি। দেশে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ থ্যালাসিমিয়া রোগের জীবাণু বহন করছে (তথ্য সূত্র: দৈনিক জনতা, ৪ জুন ২০১২)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৪ দশমিক ১ ভাগ মানুষ বিটা থ্যালাসিমিয়ার বাহক। থ্যালাসিমিয়া অনেক ধরনের আছে, কিন্তু আমাদের দেশে দুই ধরনের থ্যালাসিমিয়া বেশি দেখা যায়, তা হলো বিটা থ্যালাসিমিয়া মেজর (ইবঃধ ঞযধষধংংধবসরধ গধলড়ৎ) এবং হিমোগ্লোবিন-ই-বিটা থ্যালাসিমিয়া (ঐন ঊ নবঃধ ঞযধষধংংধবসরধ)। এই দুটির মধ্যে আবার হিমোগ্লোবিন-ই-বিটা থ্যালাসিমিয়া রোগীর সংখ্যা বেশি। থ্যালাসিমিয়া রোগীকে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। প্রতি ব্যাগ রক্তের সঙ্গে জমা হয় ২০০ মিলিগ্রাম করে আয়রন। এই আয়রন ধীরে ধীরে লিভার প্যানক্রিয়াসের প্রতিটি কোষ ধ্বংস করে দেয়। ফলে ডায়াবেটিস, সিরোসিসসহ অনেক রোগের উৎপত্তি হয়। থ্যালাসিমিয়া রোগীর জীবনকাল ২০-৩০ বছর স্থায়ী হয়। এই স্বল্পকালীন জীবনে রোগীর নিজের ও পরিবারের যে মানসিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এখন সাদিদকে বাঁচাতে হলে একমাত্র উপায় তার অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (ইড়হব গধৎৎড়ি ঞৎধহংঢ়ষধহঃধঃরড়হ)। কিন্তু এ চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই এর প্রয়োগ সম্ভব হয়ে উঠেনি। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন সফলও হয় না। যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই থ্যালাসিমিয়ার বাহক হয় এবং স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয় সেক্ষেত্রে ‘প্রি নেটাল ডায়াগনোসিস’ (চৎব ঘধঃধষ উরধমহড়ংরং) করলে বোঝা যায়, সন্তান সুস্থ না-কি অসুস্থ? এই পরীক্ষার ফলে যদি দেখা যায় যে, সন্তান অসুস্থ তাহলে তার মারাত্মক পরিণতির কথা চিন্তা করে তা (ঞযবৎধঢ়বঁঃরপ অনড়ৎঃরড়হ) নষ্ট করার সুযোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। ‘প্রি নেটাল ডায়াগনোসিস’-এর ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। এটি প্রতিবেশী দেশ ভারতে করা সম্ভব।

সাইপ্রাসে প্রথম থ্যালাসিমিয়া ধরা পড়ে। সঠিক প্রচার এবং প্রতিরোধের ফলে সাইপ্রাসে আজ প্রায় থ্যালাসিমিয়া শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে অবাধ তথ্যপ্রবাহ থাকার পরও আমরা থ্যালাসিমিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ। থ্যালাসিমিয়া রোগীর সঙ্গে খেলে, ঘুমালে, চলাফেরা করলে থ্যালাসিমিয়া হয় না। স্বামী-স্ত্রী একজন বাহক হলে এবং অন্যজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ হলে থ্যালাসিমিয়া শিশুর জন্ম হয় না। যারা বাহক কিংবা হিমোগ্লোবিন-ই এর বাহক তারা সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ, তাদের কোন চিকিৎসাও প্রয়োজন হয় না এবং এদের কোন উপসর্গ থাকে না। তাই রক্ত পরীক্ষা না করা পর্যন্ত বলা যাবে না কারা বাহক।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের থ্যালাসিমিয়া সেন্টারে শুধু নয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফরম, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খোলার ফরম, বিভিন্ন পরিচয় পত্র, নানা রকমের ফরমে বিয়ের আগে, সরকারী চাকরিতে প্রবেশের সময় অবশ্যই হিমোগ্লোবিন-ই ইলেকট্রোফোরেসিস (ঐন- ঊষবপঃৎড়ঢ়যড়ৎবংরং) টেস্ট এবং কেরিয়ার কি-না ইত্যাদি তথ্য লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে এ রোগের বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জরুরী ভিত্তিতে আগ্রহী, পরিশ্রমী ও কর্মঠ কর্মী বাহিনী সম্পর্কিত কর্মসূচী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সাইপ্রাসের মতো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, অফিস-আদালতে থ্যালাসিমিয়ার জেনেটিক কাউন্সিলিং এবং রোগ সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার করতে পারলে আমরাও থ্যালাসিমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারব। আসুন সবাই মিলে থ্যালাসিমিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ি।