মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ অমর কবি শাহাদৎ হোসেন

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৬
  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কবি শাহাদৎ হোসেন একাধারে ছিলেন কবি, প্রবন্ধ লেখক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, অনুবাদক, শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক, আবৃত্তিকারক। জীবনের পরতে পরতে তিনি আপন ভুবন অবলোকন করেছেন দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে তাঁর কাব্য প্রতিভা তাঁকে মহীয়ান করে তুলেছে, নির্মমভাবে তিনি অবহেলার শিকারও হয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িক এই মহান কবি নজরুল রবীন্দ্র বলয় অতিক্রম করে নিজস্বতার সৌরভ ছড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে ভারতের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার দেগঙ্গা থানার অন্তর্গত প-িতপোল গ্রামের এক রক্ষণশীল দরিদ্র পরিবারে। পিতা বাহারউদ্দীন আহম্মদের ছয় সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন তিনি। তাঁদের বাড়ির দহলিজের মক্তবে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। মক্তবের ওস্তাদের কড়া শাসনে তাঁর রুচি-মন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তিনি মক্তব্যে খাওয়া বন্ধ করে দেন। তাঁর পিতা পুত্রের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত পীর গোড়াচাঁদ মাইনর স্কুলে ভর্তি করে দেন। তখন শাহাদৎ হোসেনের বয়স মাত্র ৭ বছর। এই সময় তাঁর কবিতা আবৃত্তিকারক হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর দরাজ কণ্ঠের আবৃত্তি শুনে সবাই মুগ্ধ হতো। তিনি তখন থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন। ইংরেজী, গণিত ও বাংলা বিষয়ে প্রজ্ঞাধর ছিলেন। কিন্তু পড়াশোনায় তাঁর মন বসত না। স্কুল পাল্টাতে পাল্টাতে হুগলী কলেজিয়েট স্কুলে এসে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করে তাঁর গতানুগতিক বিদ্যালয় জীবনের অবসান ঘটে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত শাহাদৎ হোসেন রুজি-রোজগারে মনোনিবেশ করেন। প্রথমে তিনি গোড়াচাঁদ মাইনর স্কুলে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ব্যাকরণের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর পা-িত্যের কথা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তিনি লুডালো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক হন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে বশিরহাট মহকুমা শহরের বাসিন্দা পল্লীবাণী পত্রিকার সম্পাদক কবি ভুজঙ্গধর রায় চৌধুরীর উদ্যোগে বাণী সম্মেলনী নামে এক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ২২ বছরের ও যৌবনদীপ্ত শাহাদাৎ হোসেন দরাজ কণ্ঠে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। এ জন্য তিনি ভুয়সী প্রশংসা অর্জন করেন এবং পদকপ্রাপ্ত হন। এই সম্মিলনের প্রতিবেদন তিনি উপস্থাপন করেন। এটাই তাঁর প্রথম রচনা। তিনি ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি গঠিত হলে এর প্রধান সম্পাদক হন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁর এলাকার কবিসত্তা শাহাদৎ হোসেনকে চার বছর পর কলকাতায় ডেকে এনে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির লাইব্রেরিয়ান পদে নিয়োগ দান করেন। ১৩২৫ বাংলা সনের বৈশাখ মাসে সমিতির মুখপত্র হিসেবে বের হয় ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা। এর সম্পাদক হন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও জাতীয় মঙ্গলের কবি মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। এই পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যার প্রকাশক ছিলেন শাহাদৎ হোসেন। এই পত্রিকার তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয় কুণ্ঠিত শীর্ষক তাঁর রচিত কবিতা। ওই একই বছরের অগ্রহায়ণ মাসে মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন বের করেন মাসিক সওগাত। এর সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন নিজে। শাহাদৎ হোসেনকে এই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক করা হয়। সওগাতের প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় কবি শাহাদৎ হোসেনের তিনটি লেখা ছাপা হয়। তা হচ্ছে বর্তমান নাট্যসাহিত্য, ভ্রাতৃআবাহন কবিতা, অতীত যুগের মোসলেম রমণী (প্রবন্ধ)। মাসিক সত্তাগাত ছাড়াও তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সঙ্গে জড়িত হন।

১৩৮২ সনের মাঘ মাসে কলকাতা হতে প্রকাশিত মাসিক সহচর পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হন। পরে তিনি এই পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত দৈনিক সুলতান পত্রিকার সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। দৈনিক সুলতানের সম্পাদক ছিলেন ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ১৩৩০ সনে মোহাম্মদী পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। কিছু দিন এখানে দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তিনি সাপ্তাহিক খাদেম পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। মাসিক মোহাম্মদী নব পর্যায়ে প্রকাশিত হয় ১৩৩৪ সনের কার্তিক মাসে। মাওলানা আকরম খাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক মোহাম্মদীর প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় কবি শাহাদৎ হোসেনের মহাপয়গাম শীর্ষক কবিতা বের করেন। প্রিয় নবী (সা)- এর আবির্ভাবের বর্ণনা এতে প্রস্ফুটিত হয় যা পাঠক মহলে নবী প্রেম জাগ্রত করে তোলে। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে কাটাফুল নামে তাঁর লেখা উপন্যাস পাঠক মহলে সমাদৃত হয়।

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার মির্জাপুর পার্কে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের এক আইন অমান্য বিরাট সমাবেশে তিনি জ্বালাময়ী ভাষণ দেন, যে কারণে তিনি গ্রেফতার হন এবং চার মাস কারাদ- ভোগ করেন। দেশ ভাগের পর তিনিও ঢাকা আসেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মে ঢাকা রেডিওতে যোগদান করেন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট ঢাকা রেডিওর অনুষ্ঠান পত্রিকা এলান প্রকাশিত হলে তাঁকে এলান পত্রিকার সম্পাদক করা হয়। ঢাকা রেডিওতে ছোটদের আসর পরিচালনা করতেন। তাঁর প্রযোজনায় বহু নাটক সম্প্রচারিত হয়। তিনি অধিকাংশ নাটকের রচয়িতা ছিলেন। কিন্তু তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে রেডিওর চাকরি হারান। মনের দুঃখে ভারতে চলে যান। এই মহান কবি অভাব অনটনের মধ্যে দিন গুজরান করেন। হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। একদম নিঃসঙ্গ অবস্থায় তিনি চলে যান। তাঁর লাশ গ্রহণ করার মতো কেউই কাছে ছিল না। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাঁকে দাফন করার খবর পেয়ে কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক হাসপাতালে ছুটে যান এবং তাঁর লাশ গ্রহণ করেন। তাঁর জানাজার সালাতে শরিক হন কাজী আবদুল ওদুদ, খায়রুল আনম খাঁসহ অনেক কবি-সাহিত্যিক-সম্পাদক। তাঁকে দাফন করা হয় কলকাতার গোবরা গোরস্তানে। ঢাকায় তাঁর ইন্তেকালের খবর পৌঁছলে এখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয়তে লেখা হয় মাইকেলের করুণ মৃত্যু হিন্দু বাংলাকে যেমন সচেতন করেছিল, শাহাদৎ হোসেনের শোচনীয় মৃত্যু মোছলেম বাংলাকে সচেতন করে তুলুক।

কবি শাহাদৎ হোসেন ছিলেন প্যান ইসলামইজমে বিশ্বাসী। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক মিলে তাঁর ১২২টি রচনার সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ

উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা)

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৬

১৩/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: