২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ঢাকার দিনরাত


শীতের জন্য যাদের হাহাকার ছিল, তারা সন্তুষ্ট। ঢাকায় ভালই শীত পড়তে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে তাপমাত্রা তেরো থেকে দশে নামতে সময় লাগবে না। আমাদের এই গ্রীষ্মপ্রধান দেশটির রাজধানীতে শীত আরও উপভোগ্য হতে পারত যদি ধোঁয়া ধুলো আর কুয়াশা দাপট না দেখাত। এই তিনটির সঙ্গে রাতে অদৃশ্য শিশির-বৃষ্টি শীতকাতুরেদের জন্য অবশ্য কিছুটা বিপদই ডেকে আনে। আর যারা ফ্যাশনদুরস্ত, তারা কোট-ব্লেজার, কার্ডিগান আর বাহারি চাদর পরার দারুণ সুযোগ পান বটে।

যা হোক, রাজধানীর সাধারণ সমস্যা, বা বলা ভাল, নাজেহালকারী বিষয় হচ্ছে যানজট। তা যে ছুটির দিন শুক্র-শনিবারকেও ছাড় দেয় নাÑ তার প্রমাণ মিলল গত সপ্তাহে। বিজয় দিবসের ছুটিতে যারা ঢাকার বাইরে গিয়েছিলেন তারা ফিরে আসেন সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রবিবারের আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার। ঈদ উপলক্ষে দেশে তিন দিনের ছুটি থাকে। সরকারী চাকরি যারা করেন তারা বছরের বিভিন্ন সময়ে তিন দিনের ছুটি পেয়ে যান শুক্র-শনির সঙ্গে আগে বা পরে কোন নির্ধারিত ছুটি যোগ হলে। এই ছুটি চার দিন হয়ে যায় অধিকাংশের কাছেই, যদি সরকারী ছুটিটি বুধ কিংবা সোমবারে পড়ে। এবার যেমন বুধবারে পড়েছিল বিজয় দিবস। ফলে ওই সাধারণ ছুটিকে কাজে লাগিয়ে বৃহস্পতিবার কোনক্রমে ম্যানেজ করে অনেকেই চারদিনের ছুটি ভোগের পরিকল্পনা করে ফেলেন। বলছিলাম যানজটের কথা। বুধবার ছুটি শুরুর আগের সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে মাত্রাতিরিক্ত গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ায় ঢাকার যানজট গিয়ে পড়ে টাঙ্গাইল মহাসড়কে। তাই মঙ্গলবার রাত থেকে পরদিন বিকেল পর্যন্ত ওই মহাসড়কে দুঃসহ যানজট বিরাজ করেছে।

বিজয় দিবস উদযাপন নিয়ে বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে শুধু সামান্য যোগ করব। বিজয় দিবসের আগের সন্ধ্যায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখতে পেয়েছি বিপণিবিতান শুধু নয়, নামী-দামী রেস্তোরাঁ ও কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারে মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্রমালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। আর বিভিন্ন সড়ক, সড়ক দ্বীপ ও ভবনে শোভা পাচ্ছিল বর্ণিল আলোকসজ্জা। আলো দিয়ে তৈরি করা হয় প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা। মতিঝিল এলাকায় ভবনের বর্ণিল রূপ, সঙ্গে আলোর খেলায় বিজয়ের ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়। সত্যিই প্রশংসনীয় কাজ।

আকাশপ্রদীপ

ঢাকায় ছোট বড় প্রচুর সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। সংস্কৃতিচর্চার ভেতর দিয়ে এক ঝাঁক সমমনা, শিল্পমনা মানুষ নানা উপলক্ষে মিলিত হন, আনন্দসৃষ্টি আর আনন্দ উপভোগে যুক্ত হন। এভাবেই সামাজিক মানুষ জীবনকে অর্থবহ করে তোলেন। নিজ ভাষা, নিজ দেশের সাহিত্য, গান প্রভৃতিতে বেগ সঞ্চার করেন। রাজধানীর শত শত সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভেতর ‘আকাশপ্রদীপ’ একটি। তার প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কবিতাপাঠ ও আড্ডার পাশাপাশি একজন গীতিকারের একগুচ্ছ গান পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। গীতিকার গোলাম মোর্শেদ, যিনি এই সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, তার গানের মুখ্য শিল্পী ছিলেন ফাহমিদা নবী। গত সপ্তাহেরই দুটি দিন ছিল এই শিল্পীর বাবা ষাটের দশকে চলচ্চিত্রের গানের জনপ্রিয় শিল্পী মাহমুদুন্নবীর জন্ম-মৃত্যুবার্ষিকী (১৬ ও ২০ ডিসেম্বর)। শুক্রবার দুপুরে একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলে তাঁর গানগুলো দু’তিনঘণ্টা ধরে শুনিয়েছেন দুই কন্যা ফাহমিদা ও সামিনা। সেটি ছিল লাইভ প্রোগ্রাম। স্টুডিও থেকে ফাহমিদা সরাসরি চলে এসেছিলেন ধানমন্ডিতে আকাশপ্রদীপের অনুষ্ঠানে। গোলাম মোর্শেদের গানের সুরকারদের মধ্যে আছেন লাকী আখন্দ, বাপ্পা মজুমদারসহ অনেকেই। ফাহমিদা এই গীতিকারের গান প্রথম রেকর্ড করেছিলেন ২০০০ সালে। সহশিল্পী ছিলেন নিপো, যিনি একই গীতিকারের অনেক গানেরই সুরস্রষ্টা। তিনিও ছিলেন অনুষ্ঠানে। আরও ছিলেন তিন তরুণ মিউজিশিয়ানÑ তমাল, তরুণ ও সজীব। এরাও গোলাম মোর্শেদের গানে সুরারোপ করেছেন। ফাহমিদা ও নিপো একেকটা গান গাইতে শুরু করলে শ্রোতারা সব নড়েচড়ে বসলেন। রোমান্টিক গান, তাতে প্রেম ও বিরহ হাত ধরাধরি করে রয়েছে। শব্দ, উপমা, চিত্রকল্প কখনও কখনও আধুনিক কবিতার সহোদর যেন। আর কী দরদ মিশিয়েই না দু’জন গান করেন। ফাহমিদা শোনালেন গানের পেছনের কিছু কথাও। একবার আমেরিকায় তিনি এক একাকী নারীর সাক্ষাত পেয়েছিলেন যিনি তার গাওয়া এই গীতিকারের একটি গান বার বার শোনেন যখন খুব নিঃসঙ্গতা আর আশাহীনতা এসে তার জীবনে ভর করে। সত্যিই তো! মানুষ গানের কাছে এসে আশ্রয় এবং নির্ভরতাও পায়।

শ্রোতাদের পেট চোঁ চোঁ করছে, কিন্তু এই দুই গানের পাখি ব্রেক নিতে রাজি নন। অগত্যা লাগাতার পরিবেশনা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো রাত বারোটায়। ভোজন শেষে শিল্পী-যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীরা ঘন হয়ে বসলেন। ছোট একটা পরিবার যেন। গীতিকার গোলাম মোর্শেদ তার ফাইল থেকে একের পর এক গানের লিরিক-লেখা কাগজ তুলে দিতে থাকলেন ফাহমিদার হাতে। স্বাভাবিকভাবেই শিল্পী কিছুটা ক্লান্ত, কিন্তু হৃদয়ে ও কণ্ঠে সেই ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। গেয়ে চললেন গান, তিন নবীন সুরকারও নিজেদের দুয়েকটা গান শোনালেন। কোথা দিয়ে আরো দু’ঘণ্টা পার হয়ে গেল কে জানে!

রাজধানীর দুই বাস্তবতা

গত সপ্তাহে ঢাকার দুটি বাস্তবতা ঢাকাবাসীদের বিশেষ গোচরে এসেছে। একটি ঢাকার বাতাসে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড বৃদ্ধির হার এবং অপরটি ঢাকার বস্তিতে বাসকারী মানুষের হিসাব। মঙ্গলবার এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের উদ্যোগে এক স্মারক বক্তৃতা দেন নগরবিদ নজরুল ইসলাম। ‘নগরায়ণ এবং নগরের দরিদ্রতা : অসমতা, অধিকার এবং বঞ্চিতকরণ’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ঢাকা শহরে মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ বস্তিতে বসবাস করে। যদিও সরকারী হিসেবে এই সংখ্যা আট লাখ। অথচ শুধু কড়াইল বস্তির ৭৪ একর জমিতে এক লাখ মানুষ বসবাস করে।

বিশ্বের ১৯৫টি শহরের মধ্যে ঢাকার বাতাসে সবচেয়ে বেশি নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত শহরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা বলেছে। বাতাসে যে ক’টি উপাদান রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকারক ও অপ্রয়োজনীয় উপাদান হচ্ছে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড। বাতাসে এর পরিমাণ বেড়ে গেলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে আসে। নিশ্বাসের সঙ্গে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড শরীরে গেলে তা নানা ধরনের রোগব্যাধি তৈরি করা ছাড়াও শরীরে অক্সিজেন প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড বেশি আছে এমন এলাকার মানুষের গড় আয়ু কমে যায়।

ক্রিসমাসে বিরল পূর্ণিমা

দরোজায় কড়া নাড়ছে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব বড়দিন, মেরি ক্রিসমাস। পঁচিশে ডিসেম্বর শুভ বড়দিনে দিনভর প্রার্থনা, আর আনন্দ আয়োজন চলবে। ইউরোপে বড়দিনের তিন মাস আগে থেকেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ঢাকায় ডিসেম্বর মাস না আসা পর্যন্ত ঠিক উৎসবের আমেজ আসে না। গির্জা কর্তৃপক্ষ এবং খ্রীস্টান বিভিন্ন যুব সংগঠনের উদ্যোগে সন্ধ্যায় বড়দিনের কীর্তন আয়োজন করা হয়। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা শীতকে অগ্রাহ্য করে শহরময় বাড়ি বাড়ি ঘুরে নেচে গেয়ে কীর্তন পরিবেশন করে বড়দিনকে স্বাগত জানান। ঢাকার সবচেয়ে বড় খ্রীস্টান কমিউনিটি মিরপুর এলাকায়। বিগত দুই দশক ধরে মিরপুর আন্তঃমাণ্ডলিক বড়দিন উদযাপন কমিটি ২৫ ডিসেম্বরের আগে বিশেষ আনন্দ উৎসবের আয়োজন করে থাকে। ১৮ ডিসেম্বর মিরপুরের ব্যাপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলে এবারও অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। এই ক্রিসমাসে আকাশে দেখা মিলবে বিরল পূর্ণিমার। এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। এর আগে এমন পূর্ণিমা দেখা গিয়েছিল ১৯৭৭ সালে। এর পরেরটি দেখা যাবে ২০৩৪ সালে। এটাকে বলা হচ্ছে ‘ফুল কোল্ড মুন’। ২৫ ডিসেম্বর চাঁদকে আরও জ্বলজ্বলে মনে হবে। পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকেই এই চাঁদ দেখা যাবে।

অপরাজেয় বাংলা নেপথ্যের ইতিহাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে নির্মিত ভাস্কর্য অপরাজেয় বাংলা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। সেখানে কিছু তথ্য নিয়ে খটকা লাগায় এ বিষয়ে অনুসন্ধান করার এক পর্যায়ে তৎকালীন ডাকসু নেতা ম হামিদের একটি সাক্ষাতকার পেয়ে গেলাম। এটি প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক আযাদীতে ২০১৩ সালের ২০ জুন। চুম্বক অংশ তুলে দিচ্ছি আজকের প্রজন্মের তরুণদের জন্য।

ম. হামিদ বলছেন, ‘অপরাজেয় বাংলা (তখন অবশ্য এর অন্য নাম ছিল) এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তখন সে জায়গাটার নাম ছিল বটতলা। আমরা সবদিক বিবেচনা করে বটতলায় ভাস্কর্য নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা ডাকসুর নেতারা তখন কিভাবে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা যায় তা নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলছি। মতবিনিময় করছি। সে সময় কবি রফিক নওশাদ একদিন আমাকে বললেন, বুলবুল ললিতকলার একজন ভাস্কর্য শিল্পী আবদুল লতিফের কাছে একটি ভাস্কর্য আছে। তার ছবি দেখে আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। আবদুল লতিফের ভাস্কর্য ছিল পাঁচ ফিট উঁচু। আমরা সেটা এনে বটতলার ওখানে বসিয়ে দিলাম। চার ফুট বাই চার ফুট বেদি বানিয়ে দিলাম। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেটার উদ্বোধন করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী। ভাস্কর্যটা বসানোর পর অনেকে তাদের মত প্রকাশ করে জানালেন, আমরা যে রকম উদ্দীপনাময় ভাস্কর্য চেয়েছিলাম এটা ঠিক সে রকম নয়। আরও উদ্দীপ্তময় ভাস্কর্য স্থাপন করলে ভাল হয়। আমাদের মধ্যেও তখন রিপ্লেস করার চিন্তাভাবনা কাজ করছে। ভাস্কর্যের ডিজাইনের জন্য অনেকের কাছে গেলাম। শিল্পী নিতুন কুণ্ডু, ভাষা সংগ্রামী ইমদাদ হোসেনসহ আরও অনেকে আমাদের নানা পরামর্শ দিচ্ছিলেন। একদিন জানলাম চারুকলার সিরামিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রধান মীর মোস্তফার একজন ছাত্র আছে, যার নাম আবদুল্লাহ খালিদ। খুব ভাল কাজ করে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এর মধ্যে আরও একজনের নাম জানলাম। তার নাম আনোয়ারা জাহান। আমরা দু’জনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। তারা যেন আমাদের ডিজাইন করে দেখায়। আমরা পূর্ব কথামতো চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে গেলাম। আবদুল্লাহ খালিদ উপস্থিত ছিল। আমি তার সঙ্গে কথা বললাম। এর আধা ঘণ্টা পর এলেন আনোয়ারা জাহান। কিন্তু আমরা ইতোমধ্যে আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে চূড়ান্ত কথাবার্তা বলে ফেলেছি। আনোয়ারা জাহানের মন খারাপ হয়ে গেল। তার এই মন খারাপের কথা সে আমাকে সব সময়ই বলত। আনোয়ারা জাহান মারা যাওয়ার তিন মাস আগেও আক্ষেপ করে আমাকে বলেছে, মাত্র আধা ঘণ্টা দেরি করার জন্য অপরাজেয় বাংলার মডেলটা করতে পারলাম না।

সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের সঙ্গে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পর মডেল হওয়ার জন্য কাকে কাকে নেয়া যায় তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন এলিফ্যান্ট রোডে কামপালা বিল্ডিং বলে একটা ভবন ছিল। সেখানে কবি-সাহিত্যিক শিল্পীরা থাকত। মডেল ঠিক করা হলো বদরুল আলম বেনু, সৈয়দ ফজলে হামিদ আর হাসিনা আহমেদকে। ইউওটিসি থেকে রাইফেল ও হেভারসেক নিয়ে দিলাম। আমার মধ্যে তখন চরম উত্তেজনা কাজ করছে। দু’দফায় দেড়শ’ টাকা করে রায়েরবাজার কুমোরপাড়া থেকে ৩শ’ টাকার মাটি কিনে আনলাম। উদ্দেশ্য ভাস্কর্যের মডেল বানানো হবে। রাতদিন ভাস্কর্যের মডেলের কাজ হবে। অবশ্য এর মধ্যে ভাস্কর্য নিয়ে ডাকসুর সঙ্গে উপাচার্য অধ্যাপক মতিন চৌধুরীর বৈঠক হলো। উপাচার্য জানতে চাইলেন, ভাস্কর্য নির্মাণের বাজেট কত হবে? আমরা তখন জানালাম, পঞ্চাশ হাজার টাকা। টাকার সংস্থান কোত্থেকে হবে? উপাচার্য জানতে চাইলে আমরা জানালাম, ভাস্কর্য নির্মাণের অর্ধেক ডাকসু দেবে আর অর্ধেক দেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের কথায় উপাচার্য রাজি হয়ে গেলেন।

উপাচার্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে দিলেন যার সদস্য হলেন ড. বেলায়েত উদ্দিন, অধ্যাপক কে এম সাদউদ্দিন ও আমি। ভাস্কর্যের কাজ শুরু হলো। সে সময় দেশে সিমেন্টের খুব ক্রাইসিস চলছে। তখন এএইচএম কামারুজ্জামান বাণিজ্যমন্ত্রী। সিমেন্টের জন্য আমরা তার কাছে গেলাম তিনি তখন বিশেষভাবে উদ্যোগ নিয়ে আমাদের জন্য সিমেন্টের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ভাস্কর্যের স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের জন্য আমরা তখন শরণাপন্ন হলাম প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ সাহেবের কাছে। বেদির নকশা করে দিলেন কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন। এর মধ্যে অসাবধানতাবশত একবার ভাস্কর্যটির পুরো মডেল ভেঙ্গে গিয়েছিল। আবার কাজ শুরু হলো। আমরা যেভাবে দিনরাত ভাস্কর্যের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম তাতে আমাদের আশা ছিল পঁচাত্তর সালের ডিসেম্বরের ষোলো তারিখ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দিয়ে এর উদ্বোধন করাতে পারব। কিন্তু এর মধ্যে বড় ধরনের আঘাতে আমরা সবাই বিপর্যস্ত হয়ে গেলাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমাদের সব কিছুকে স্তব্ধ করে দিল। ১৫ আগস্টের কালরাত্রির পর অলিখিত এক আদেশে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে গেল। আমরা ভেঙ্গে পড়লাম।’...

পরে ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘অপরাজেয় বাংলা’র উদ্বোধন হয়।

সংবর্ধিত দুই কবি

ষাট ও সত্তর দশকের দুই বিশিষ্ট কবি পৃথক পৃথকভাবে সংবর্ধিত হলেন আনন্দঘন পরিবেশে। ষোলোই ডিসেম্বর ছিল কবি হায়াৎ সাইফের ৭৪তম জন্মদিন। সেদিন জাদুঘরে ‘লেখা’ সাহিত্য পত্রিকার আয়োজনে সাড়ম্বরে জন্মদিন পালিত হয়। এর দু’দিন পর ঘাসফুলের উদ্যোগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে কবি মাশুক চৌধুরীকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। উভয় অনুষ্ঠানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কবি-সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন।

উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বেলায় একটা বিষয় সমাজে লক্ষণীয়। যত ভালোই লিখুন না কেন তার সঠিক মূল্যায়ণ হয় না। কবি হায়াৎ সাইফের বেলায়ও এমনটা হয়েছে। অথচ ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ে পা-িত্যসম্পন্ন এই সাহিত্যিক কবিতা ও প্রবন্ধ দুটোতেই উচ্চমানের স্বাক্ষর রেখেছেন। আর কবি মাশুক চৌধুরী নিভৃতচারী আদ্যোপান্ত একজন ভালো মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু কবিতা লিখেছেন যা পাঠকদের হৃদয় স্পর্শ করেছে। বাকপরিমিতি ও ছন্দোজ্ঞান তার কবিতার বৈশিষ্ট্য। দুই দশকের এই দুই গুণী কবির সম্মাননা প্রাপ্তি কবিসমাজের জন্যে আনন্দ সংবাদ।

২১ ডিসেম্বর ২০১৫

marufraihan71@gmail.com