১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

পারিবারিক সহিংসতা


পরিবার হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। যেখানে সব সদ্যস্যের অধিকার সমান। সাধারণ বিবেচনায় পরিবার হচ্ছে সমাজের মৌলিক প্রতিষ্ঠান, মৌলিক অর্থনৈতিক একক। পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুটিই বড় হয়ে একদিন সমাজে নির্ধারিত ভূমিকা রাখে। সুস্থ স্বাভাবিক পারিবারিক পরিম-ল তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত একটি জরিপে পরিবারে শিশুর ওপর মা-বাবার মানসিক চাপ ও শারীরিক পীড়নের যে চিত্র উঠে এসেছে তা খুবই উদ্বেগজনক। দেখা যাচ্ছে দুই-তৃতীয়াংশ শিশুকে মারধর করেন মা-বাবা। প্রতি তিনজন মায়ের মধ্যে একজন বিশ্বাস করেন নিয়মকানুন শেখাতে সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। অথচ শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও শারীরিক শাস্তি শিশুর মনোজগতের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা তাদের ভেতর ভবিষ্যতে অপরাধ করার প্রবণতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

বলা হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত মায়ের বিকল্প নেই। শিক্ষিত মা-ই পারে একটি সুস্থ জাতি উপহার দিতে। কথাটা ভুল নয়। কিন্তু সন্তানের ভালোর জন্য একজন মা যদি অসচেতনতাবশত সন্তানের ওপর নির্যাতন চালান তবে হিতে বিপরীত হওয়াটাই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে এ কথাও বলা জরুরী যে, পরিবারে একজন মা, অর্থাৎ একজন গৃহিণীও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হন। পারিবারিক সহিংসতার ব্যাপ্তি অনেক বেশি। ‘নির্যাতন’ শব্দটা আমাদের কাছে অনেকটাই শারীরিক। কিন্তু মানসিক নির্যাতন, ভয় দেখানো, অসম্মানজনক আচরণ, হেয় করা, হুমকি-ধমকি দেয়া, অকারণে দোষারোপ করা, কোন কাজে জোরজবরদস্তি করা, শারীরিক বা মানসিক আঘাত ইতাদিও ‘নির্যাতন’ বোঝায়। বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরো পরিচালিত এক সার্ভেতে (বিবিএস, ২০১১) উঠে এসেছিল বিভীষিকাময় সব তথ্য। বিবাহিত জীবনে ৮৭% নারী কোন না কোন সময়ে স্বামীদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন এবং জরিপের আগের এক বছরে এই সংখ্যা ৭৭% ছিল। এর মধ্যে মানসিক নির্যাতন বেশি ছিল শারীরিক নির্যাতনের (৬৫%) তুলনায়। একই সংস্থার ২০১১ সালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, উত্তরদাতাদের মধ্যে ১২৬ জন জানিয়েছেন তাদের পরিবারের কোন না কোন সদস্য আত্মহত্যা করেছে পারিবারিক সহিংসতার কারণে। সমাজে নারীরা এগিয়ে চলেছেন সাধারণভাবে এ কথা আমরা বলে থাকি। বিগত বছরগুলোয় নারীর অবস্থা ও অবস্থানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে বলেও আমরা মাঝে-মধ্যে আত্মশ্লাঘা অনুভব করে থাকি। অথচ হঠাৎ হঠাৎ এমন সব নারী নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় যেগুলোর প্রকৃতি ও অন্তর্নিহিত নির্মমতার পরিচয় পেয়ে আমাদের বিবেক যেন বিবশ হয়ে পড়ে।

নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে হলে সবার আগে পুরুষের মনমানসিকতার পরিবর্তন দরকার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এখনও মনে করে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা স্বামীর অধিকার। এ মানসিকতার পরিবর্তন করলেই সমাজের বহু নারী নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু আইন দিয়ে সমাজের এই অন্যায়-অনাচার দূর করা সম্ভব নয়। এছাড়া পরিবারে শিশুদের সঙ্গে আচরণে কৌশলী ও সহিষ্ণু হতে হবে। মারধর করে শিশুর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক সুফল হয়ত পাওয়া অসম্ভব নয়। যদিও এতে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে দীর্ঘস্থায়ী। তাই অভিভাবকদের সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরী। গণমাধ্যমও এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে পারে। মনে রাখা চাই, সহিংস পরিবার সুষ্ঠু সমাজ নির্মাণে বড় অন্তরায়।