২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

চরফ্যাশনের চর কচুয়াখালী দ্বীপ ॥ নিজভূমে পরবাসী


এ আর এম মামুন, চরফ্যাশন ॥ ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া নদীর তীরে দ্বীপ চর কচুয়াখালীর অবস্থান। এর প্রশাসনিক কার্যক্রম লালমোহন উপজেলার চরউম্মেদ ইউনিয়নে। এ দ্বীপ চরের ৬ হাজার মানুষ সরকারী, বেসরকারী সব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দ্বীপের শিশুরা বংশপরম্পরায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। মিলছে না টিকা। নেই নিরাপত্তা। উপজেলা সদর এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দূরত্ব, নদী ও স্থলপথে দূরবর্তী ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থাই দ্বীপবাসীর সব দুর্ভোগ ও বঞ্চনার কারণ বলে জানা গেছে। দ্বীপের জন্মলগ্ন থেকে ভুল প্রশাসনিক বিভাজনই দ্বীপবাসীর আজন্মের পাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাই চর কচুয়াখালীকে প্রশাসনিক বিভাজনের মাধ্যমে চরফ্যাশনের সঙ্গে একীভূত করে তাদের বঞ্চনার অবসানের দাবি তুলেছেন। জানা যায়, লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ্দ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের দূরবর্তী অংশ চর কচুয়াখালী। চর কচুয়াখালী থেকে লালমোহন উপজেলা সদরের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার এবং পশ্চিম চর উমেদ্দ ইউনিয়ন পরিষদের দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। অন্যদিকে, চরকচুয়াখালী থেকে চরফ্যাশন উপজেলা পরিষদের দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার এবং নীলকমল ইউনিয়ন পরিষদের দূরত্ব ২ কিলোমিটার। মাঝখানে বহমান তেঁতুলিয়ার পশ্চিম তীর ঘেঁষে চর কচুয়াখালী এবং পূর্ব তীর ঘেঁষে চরফ্যাশনের নীলকমল ইউনিয়ন। নিকটবর্তী অবস্থান এবং সহজ যোগাযোগের কারণে চর কচুয়ার মানুষ নীলকমল ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার। পশ্চিমে চর হাদি এবং তিন দিকে তেঁতুলিয়া আর শাখা নদীর বেষ্টনী। মাঝখানে তেঁতুলিয়ার পশ্চিমকূল ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণে ৮ কিলোমিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৫ কিলোমিটার বিস্তৃত চর কচুয়াখালীর জনসংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। ভোটার সংখ্যা সাড়ে ৯শ’।

চর কচুয়াখালীর প্রবীণ ব্যক্তি খোরশেদ আলম জানান, ১৯৭০ সনের জলোচ্ছ্বাসের আগেই চর কচুয়ায় চাষাবাদ শুরু হয়। কিন্তু সরকারীভাবে এই চরে প্রথম ২০০২ সনে গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থায়ী বসতির স্বীকৃতি দেয়া হয়। দূরত্বের ঝক্কি-ঝামেলার কারণে চর কচুয়াখালীর বেশির ভাগ ভোটার ভোট দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেন না। ঘন বসতিপূর্ণ এই দ্বীপ চরের বসতি ৬টি গুচ্ছগ্রাম ও তিনটি আবাসনকে কেন্দ্র করে ভিড়ে ঠাঁসা। এছাড়াও বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি মালিকানায় অনেক বাড়ি-ঘর চোখে পড়ে। প্রায় ৬ হাজার জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই চরে তিনটি মসজিদ ও একটি মক্তব আছে। রাস্তা নেই। কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই। নেই পল্লী চিকিৎসকও। আসে না স্বাস্থ্যকর্মীও। তিনটি আবাসন সংলগ্ন তিনটি ক্ষুদ্রাকৃতির মুদি দোকান দ্বীপবাসীর জরুরী চাহিদার যোগান দিচ্ছে। ওষুধ, মাছ তরকারির মতো জরুরী কেনা-কাটার প্রয়োজনে দ্বীপের মানুষ ত্রিশ মিনিটে তেঁতুলিয়ার পেটচিরে পশ্চিম থেকে পূর্ব পাড়ের চরফ্যাশনের নীলকমল ইউনিয়নের ঘোষেরহাট বা দুলারহাট বাজারে আসেন। জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজনে ছুটে যান ১৭ কিলোমিটার দূরের চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব ভেদ করে পরিষদ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পের কোন সুবিধাই এই দ্বীপ চরে পৌঁছে না। ফলে দ্বীপের কোন মানুষ ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতা, বিধাবা ভাতা কিংবা আপদকালীন জরুরী ত্রাণ কখনই পায়নি। দ্বীপের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আব্বাস উদ্দিন জানান, প্রায়ই দ্বীপে নৌ-ডাকাতরা হানা দেয়। ট্রলার বোঝাই করে চাউল, ডাল থেকে গোয়ালের গরু সব নিয়ে যায়। মোবাইল ফোনে থানা পুলিশকে জানালেও কোন কাজ হয় না। থানা থেকে জল ও স্থলপথে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বের কারণে তাৎক্ষণিক কোন পুলিশি সেবা আশাও করা যায় না। কেউ অপাঘাতে মারা গেলে লাশ নিয়ে ২ দিন বসে থাকতে হয়।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা সুমাইয়া বেগম জানান, কোন স্কুল না থাকায় তেঁতুলিয়া আবাসন প্রকল্প কেন্দ্রিক মক্তবে নিকটবর্তী শিশুরা কেবল আরবী শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। রাস্তাঘাট না থাকায় দ্বীপের সব শিশুর ওই মক্তব পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ নেই। ফলে দ্বীপের ৫ শতাধিক শিশু সব রকম শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত।