ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

অবিস্মরণীয় জয় টাইগারদের

মো. মামুন রশীদ

প্রকাশিত: ০০:০৪, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

অবিস্মরণীয় জয় টাইগারদের

বাংলাদেশের জয়ের অন্যতম নায়ক তাইজুল ইসলাম

মাউন্ট মঙ্গানুই থেকে পুণ্যভূমি সিলেট। একই প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডকে ঘরে ও বাইরের এ দুই ভেন্যুতে হারিয়েছে বাংলাদেশ। মাঝে দুই টেস্ট ভিন্ন দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জিতেছে টাইগাররা। ৩৬০ আউলিয়ার চায়ের দেশ সিলেটে লাক্কাতুরা টিলার পাদদেশে অবস্থিত অপরূপ সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ১৫০ রানে শক্তিশালী নিউজিল্যান্ডকে সিরিজের প্রথম টেস্টে হারিয়েছে বাংলাদেশ। এটি তৃতীয় চক্রের আইসিসি বিশ^ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচ উভয় দলের। সেখানে তাইজুল ইসলামের ঘূর্ণি দাপটে নাজেহাল কিউইরা হেরে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে গেছে।

৩৩২ রানের লক্ষ্যে নেমে শনিবার ম্যাচের পঞ্চম ও শেষদিনে বাকি ৩ উইকেট হারিয়ে আরও ৬৮ রান যোগ করতেই গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮১ রানে শেষ হয় তাদের এবং তাইজুল একাই নেন ৬ উইকেট। এবার আরও উন্নতি করে মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্ট জিতে সিরিজের ট্রফি হাতে তোলার লক্ষ্য অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই জেতা দেশের চতুর্থ অধিনায়ক তিনি। কিউই অধিনায়ক টিম সাউদি উন্নতি দেখতে পেয়েছেন বাংলাদেশ। তিনি পরের টেস্টে ভালো কিছু করার প্রত্যয় জানিয়েছেন।
মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে খেলেন শান্ত, ৬৪ রান করেন প্রথম ইনিংসে। ঐতিহাসিক একটি জয় পায় সেখানে বাংলাদেশ। পরের টেস্টে হেরে যায় এবং সিরিজটি ১-১ সমতায় শেষ হয়। প্রায় দুই বছর হতে চলেছে, এবার উভয় দলের অধিনায়ক বদলেছে। শান্তর নেতৃত্বে এবার সিলেটে মুখোমুখি টিম সাউদির নিউজিল্যান্ড। এই ভেন্যুতে একটাই মাত্র টেস্ট ২০১৮ সালে খেলে জিম্বাবুয়ের কাছে ১৫১ রানে হেরে যায় বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে এর আগে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও মিরপুরে খেলে ৬ টেস্টে জয়ের দেখা পায়নি স্বাগতিকরা।

৩টি করে হার ও ড্র দেখেছে তারা। অবশ্য ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাওয়া জয়ের পরে আর দেশে কিউইদের টেস্টে মোকাবিলা করেনি বাংলাদেশ। ১০ বছর পর এবার বাংলাদেশের মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেছে। সেটিও আবার অপরিচিত ভেন্যু সিলেটে। বাংলাদেশ দলের জন্যও খুব একটা পরিচিত মাঠ নয় এটি। তা ছাড়া দলে নেই অপরিহার্য সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, লিটন কুমার দাস, এবাদত হোসেন চৌধুরী ও তাসকিন আহমেদ। সম্প্রতি এশিয়া কাপ ও বিশ^কাপে চরম ভরাডুবিতে ও নানাবিধ বিতর্কিত ঘটনা-সমালোচনায় বিপর্যস্ত দল বাংলাদেশ।

এতকিছু পেছনে ফেলে প্রথম দিন থেকে দুর্দান্ত খেলেছে বাংলাদেশ সিলেট টেস্টে। উভয় ইনিংসে কিউইদের বিপক্ষে প্রথমবার ৩ শতাধিক রান করেছে। সিলেটের উইকেটে স্পিনারদের জন্য বাড়তি সহায়তা থাকলেও একেবারে স্পিন স্বর্গ ছিল না। পেসাররাও এখানে সুবিধা আদায় করে নিতে পেরেছেন। এমনকি ব্যাটাররাও ভালো করেছেন যারা সুস্থির হয়ে দেখেশুনে ব্যাট চালিয়েছেন। এর প্রমাণ বাংলাদেশ দল এবং শান্ত ও কেন উইলিয়ামসনের সেঞ্চুরি। 
৩৩২ রানের জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নেমে চতুর্থ দিনেই পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে নিউজিল্যান্ড তাইজুলের ভয়াল স্পিনে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেটে ১১৩ রান নিয়ে দিন শেষ করে নিউজিল্যান্ড। তখনো তাদের জয়ের জন্য ২১৯ রান প্রয়োজন আর বাংলাদেশের দরকার মাত্র ৩ উইকেট। আগের দিন ৪ উইকেট নেওয়া তাইজুল পঞ্চম দিনে আরও দুই উইকেট তুলে নিয়েছেন। যদিও ৪৪ রানে অপরাজিত ড্যারিল মিচেল অর্ধশতক পেয়েছেন। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।

অফস্পিনার নাঈম হাসানের বলে দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নিয়ে তাইজুল ফিরিয়েছেন ১২০ বলে ৭ চারে ৫৮ রান করা মিচেলকে। প্রথম ইনিংসে উইলিয়ামসনের সহজ ক্যাচ ছেড়ে দেন তাইজুল, কিন্তু উভয় ইনিংসে তার উইকেট শিকার করেন। এবার দারুণ ক্যাচ নিয়ে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন। তবে ইশ সোধি ও সাউদি নবম উইকেটে প্রতিরোধ গড়ে ৪৬ রানের জুটি গড়েন। প্রায় সোয়া ১ ঘণ্টা টিকে থাকা সেই জুটি ভেঙেছেন তাইজুল। ২৪ বলে ১ চার, ২ ছক্কায় ৩৪ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে বিদায় নেন সাউদি। টেস্ট ক্যারিয়ারে ১২তম বারের মতো তিনি ৫ উইকেটের দেখা পান।

এরপর বাংলাদেশের জয় পাওয়াটা সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সোধি সলিড ব্যাটারের মতো দেখেশুনে খেলছিলেন। ৯১ বলে ২ চারে মাত্র ২২ রান করে তিনিও তাইজুলের শিকার হয়েছেন। ফলে পঞ্চম দিন ২২.১ ওভারে আরও ৬৮ রান যোগ করে ৩ উইকেট খুঁইয়েছে কিউইরা। ১৮১ রানে তারা গুটিয়ে গেলে ১৫০ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। সোধি, এজাজ প্যাটেল, নাঈম ও মিরাজের মতো স্পিনাররা যেখানে দাপট দেখাতে পারেননি সেখানেই তাইজুল ছিলেন দুর্বার। প্রথম ইনিংসে ১০৯ রানে ৪ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৫ রানে ৬ উইকেট নিয়েছেন। এতেই বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট হার দেখেছে নিউজিল্যান্ড। 
বাংলাদেশ ১৩৯ টেস্টে মাত্র ১৯ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে একাধিক জয় পেয়েছে শুধু ৩টি দলের বিপক্ষে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৮টি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪টি এবং আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১টি করে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জিততে পারেনি ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে। বড় কোনো দলের বিপক্ষে একাধিক জয় শুধু (খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাদে) নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই পেয়েছে বাংলাদেশ। তাদের বিপক্ষে খেলা সর্বশেষ ৩ টেস্টের দুটিতেই জয় পেয়েছে টাইগাররা। তাই অবিস্মরণীয় এক জয়ই এসেছে তাইজুল-শান্তর হাত ধরে।

নেতৃত্বের অভিষেকে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে সেঞ্চুরি করেছেন শান্ত, তাইজুল পেয়েছেন ১০ উইকেট। মাশরাফি বিন মর্তুজা, সাকিব আল হাসান ও লিটন কুমার দাস অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচেই টেস্ট জয় পান। শান্তর নাম সে তালিকায় যোগ হয়েছে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে জয় দিয়ে শুরু করা বাংলাদেশ ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। এখন মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে হার ঠেকালেই সিরিজ জয়। সেদিকে খেয়াল রেখে শান্ত বলেছেন,‘আবারও পাঁচ দিন কষ্ট করা লাগবে। চেষ্টা করব পরের ম্যাচে কীভাবে আরও উন্নতি করে জিততে পারি।’ সিরিজ জয়ের প্রত্যয় আগে থেকেই ছিল। এখন প্রথম টেস্ট জিতে নিজেদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে শান্ত বলছেন, ‘যে কোনো দলের বিপক্ষে জিততেই ভালো লাগে।

দুই বছর আগে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম চক্রের চ্যাম্পিয়ন ছিল। এমন দলকে হারালে খেলোয়াড়দের মধ্যে আত্মবিশ্বাসটা বাড়ে। এ ধরনের ম্যাচগুলো যদি আমরা না ভুলি, কী কী ঠিক করেছিলাম এসব নিয়ে যদি ভবিষ্যতে এগোতে পারি, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে আমরা এগিয়ে যাব।’ তবে কিউই অধিনায়ক সাউদি ভুল শোধরাতে চান মিরপুরে। তিনি বলেছেন, ‘ঢাকার জন্য আমাদের এখনো ২/৩ দিন সময় আছে কিছু ব্যাপারে কাজ করতে হবে। সেখানে ভিন্নরকম মাঠ থাকবে। সবাই উন্মুখ নিজেদের খেলার উন্নতি করতে, সেটাই আমরা ছেলেদের কাছ থেকে চাই।’

×