ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১

তোমাকে ভালোবাসি

আফরোজা পারভীন

প্রকাশিত: ০১:৪৯, ১৪ জুন ২০২৪

তোমাকে ভালোবাসি

মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে যায় মৌলির

মাঝরাতে আচমকা ঘুম ভেঙে যায় মৌলির। বড় সাধনার এ ঘুম। ওষুধ খাওয়ার পরও ছটফট করে বেশ কয়েক ঘণ্টা, তারপর খানিকটা সময় ঘুমায়। সেই ঘুম যদি ভেঙে যায় বড় কষ্ট হয়। মৌলিরও হলো। ওর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। চোখ ঝাপসা। টলোমলো পায়ে তমসা চোখে বিছানা থেকে নামল। আলো জ্বালবে। নামামাত্র পায়ে লেগে কী যেন একটা গড়িয়ে দূরে চলে গেল। ও বুঝতে পারল না। তারপর খাবি খেতে খেতে স্যান্ডেল খুঁজে পেল একসময়। আলো জ্বালতে পারল কষ্টে।

বাথরুম সেরে চোখ মুখে পানি দিয়ে খানিকটা সুস্থির লাগল। ঘরে ফিরে শুনতে পেল ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ। এত জোরে বৃষ্টি নেমেছে অথচ এতক্ষণ কেন শুনতে পায়নি বুঝতে না পেরে অবাক হলো। এ শহরে মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। নামলে বোঝা যায় না। মুষলধারে নামলেই কেবল কখনও রিনিঝিনি কখনও ঝমঝম কখনও কিনিকিনি শব্দ ওঠে।

আজকেরটা ঝমঝম। জানালা কাঁচে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির দানা। শব্দে বোঝা যাচ্ছে সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি তুষারও আছে। ছেলেবেলা এমন তুষার পড়লে খোলা ছাদ থেকে কুড়িয়ে তুষের মধ্যে ভরে রেখে দিত। তখন তো এত বরফ আইসক্রিম এসব ছিল না। ওই জমা তুষারে চিনি মিশিয়ে খাওয়াতে ছিল পরম আনন্দে। এসব ভাবতে ভাবতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল মৌলি। ঘুম যখন আসবে না বৃষ্টি দেখাই বরং ভালো।

জানালায় যেতে যেতে ওর মনে পড়ল পায়ে ধাক্কা লেগে কী যেন একটা গড়িয়ে গেছে খাটের নিচে। কি গড়িয়ে গেছে দেখা দরকার। এখনই যে দেখতে হবে এমন নয়। কিন্তু মৌলির এই এক বাজে অভ্যাস, একবার কিছু মাথায় ঢুকলে সেটা না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। ও নিচু হয়ে খাটের নিচে তাকালো। ঘরে বড় বড় দুটো টিউব জ্বললেও খাটের নিচে আলো অপর্যাপ্ত। প্রথমে কিছুই চোখে পড়ল না, তারপর অন্ধকার চোখে সয়ে এলে দেখতে পেল বলটা। বলটাই গড়িয়ে গেছে।

দিন কয়েক আগে কিছু ওষুধ কিনতে গিয়ে বলটা কিনেছিল কব্জির জোর বাড়াবে বলে। ওই কেনা পর্যন্তই। একদিনও ব্যবহার করা হয়নি। টেবিলের উপর ছিল। কখন যেন গড়িয়ে নিচে পড়েছে। গোল জিনিস গড়াবেই। এখন পায়ের ধাক্কায় খাটের একদম কিনারে। ওখানে থেকে বের করা অসম্ভব। থাক পরে বের করা যাবে। 
স্বামী জাভেদ পাশের ঘরে ঘুমে অচেতন। কোনো সমস্যা নেই তাদের মাঝে। বয়স হয়েছে দুজনের। এটা ওদের সমঝোতা। ইচ্ছে হলেই এ ওর কাছে যায়। এতে প্রাইভেসি থাকে। 
মৌলি জানালায় দাঁড়ায়। ভাবে গ্লাস খুলবে। পরক্ষণে চিন্তাটা বাতিল করে। পানির ঢল এসে ঘর তো ভিজাবেই তাকেও আমূল ভিজিয়ে দেবে। ঘর ভিজালে অসুবিধা নেই। ঘরের তো অসুখ-বিসুখ হয় না। ও তিন-চার দিন কমপক্ষে জ্বর আর কাশিতে ভুগবে। থাক দরকার নেই। ও পর্দা সরায়। চোখের সামনে উন্মোচিত হয় অনেকটা দূর। স্ট্রিট লাইটে দেখা যায় দুই একটা গাড়ি আর ঘুমন্ত শহর, ঝমঝম বৃষ্টি, গাছের পাতার নাচন আর মুক্তোর মতো বৃষ্টিদানা। এখানে কচুপাতা নেই, ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ নেই, নালা দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির স্রোতে নারোলি মাছ নেই। ওসব কিছু নেই। তবু যে বৃষ্টি আছে সেটাই ঢের। 
খানিকটা দূরে একটা বাড়ি। মফস্বলে মৌলিদের বাড়িটা ছিল দোতলা। দোতলা বাড়ি বলে সমাজে ওদের বিশেষ খাতির ছিল। তখন শহরের অধিকাংশ বাড়িই ছিল টিনের। তাতে তাদের দোতলা বাড়ি আর সে বাড়িতে বিশাল একটা খোলা ছাদ সবার নজর কাড়ত। কাঠের কড়ি বরগা ছিল। অজ¯্র চড়ুই কবুতর থাকত ওদের সঙ্গে এক বাড়িতে।

পাশের বাড়িটাও ছিল দোতলা। সে বাড়ির জানালায় মাঝে মাঝে যে ছেলেটি দাঁড়াত সেও মৌলির বয়সী। একদিন ছেলেটি জানালা দিয়ে একটা বল ছুড়ে বলল, ‘ক্যাচ ধরো, ক্যাচ’। মৌলি ধরল। এরপর বলল, ‘তুমি ছোড়ো আমি ক্যাচ ধরি’। দিনের পর দিন ক্যাচ ধরাধরি চলল। তারপর একদিন মৌলি ক্যাচ ধরতে গিয়ে নিচে পড়ে গেল বল। বন্ধ হলো বল ছোড়া। এরপর একদিন ছেলেটি একটা এরোপ্লেন বানিয়ে ছুড়ল। মৌলিও ছুড়ল ওর দিকে ফিরতি এরোপ্লেন। কিছুদিন পর সে এরোপ্লেন খুলে মৌলি দেখল, ওতে লেখা তোমাকে ভালোবাসি।

এবার মৌলি কী করে! ও তো এরোপ্লেন বানাতে জানে না। বড় আপার কাছে ঘুর ঘুর করল কয়েকদিন। তারপর এরোপ্লেন বানানো শিখে ও ছুড়ল। তাতে লেখা, আমিও তোমাকে। এরোপ্লেন ছুড়তে ছুড়তে ওদের কলেজ জীবন পার হলো। মুখোমুখি দেখা, দুই চারটে কথা হয়েছে বারকয়েক। ওই কথা পর্যন্ত। মা-বাবা ভীষণ কড়া। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা বারণ। তাতে ও আবার হিন্দু। হিন্দু বলে নয়, ছেলে বলেই মেশামিশি বারণ। মেয়ে বড় হয়েছে। কলেজ শেষ করেছে। 
ওদের কথা দেখা মেশা সব হলো ঢাকা এসে ভার্সিটি জীবনে। হাত ধরে টিএসসিকে বসা, সোহরাওয়ার্দীতে কোলে মাথা রেখে শোয়া, মহিলা সমিতি মঞ্চে একসঙ্গে নাটক দেখা, হুড খোলা রিকশায় তুমুল ঘোরা সব ওই ঢাকাতেই। কতদিন যে ওরা হাঁটতে হাঁটতে, রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে ভিজে একসার হয়েছে, ওদের সারা শরীর গড়িয়ে পানি নেমেছে তার ইয়ত্তা নেই। ওড়না দিয়ে শরীর পেঁচিয়ে হলে ঢোকা ছিল দুষ্কর।

হাউস টিউটরের সামনে পড়ে দুই একবার প্রচ- বকুনিও খেয়েছে। তখন দুজনই এমএ পড়ছে। হঠাৎ করে মৌলির বাড়ি থেকে আর্জেন্ট ডাক এলো। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। খুব ভালো বিয়ে। মেয়ের জোর কপাল! 
অসময়ে জগন্নাথ হলে ঢুকল মৌলি। ছেলেদের হলে মেয়েদের ঢোকা বারণ। কিন্তু উপায় যে নেই! বিমলকে সব খুলে বলল। 
বিমল বলল,
: চল পালাই 
: পালিয়ে কী করব আমরা? 
: কেন বিয়ে করব। 
: সে তো কঠিন ব্যাপার। আমাদের চাকরি-বাকরি নেই, টাকা পয়সা নেই। তুমি হিন্দু আমি মুসলিম। ধর্মের বেরিয়ার আছে। 
: তার মানে কী। হিন্দু বলে আমাকে বিয়ে করবে না তুমি? রীতিমতো রেগে গেল বিমল। 
: আরে তা না। হয় তোমাকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে না হয় আমাকে। 
: আমি ধর্ম ছাড়ব। তোমার জন্য আমি সব পারি।
: কিন্তু তোমার বাবা মা?
: তাদের আমি বোঝাবো। 
: খাবো কি? চলব কী করে?
: আগে তো পালাই। তারপর ব্যবস্থা একটা হবে। 
বাড়ি যাচ্ছে বলে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে বিমলের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে এক হোটেলে গিয়ে উঠল ওরা। হোটেলে যাবার পরই বুঝল জীবন অত সহজ নয়। প্রতিদিন হোটেল ভাড়া থাকা-খাওয়া অনেক টাকার ব্যাপার। এভাবে ক’দিন চলতে পারবে! বিয়ের কথা ভুলে গেল ওরা। আগে তো বাঁচতে হবে তারপর বিয়ে। প্রতি সকালে বিমল কাজ খুঁজতে বের হয় অর মৌলি ওর পথ চেয়ে বসে থাকে। আজ ঠিক একটা ভালো খবর নিয়ে আসবে। কিন্তু না, বিমল এলো না। এলো পুলিশ। সঙ্গে মৌলির ভাই। কোনো কথা শুনলো না তারা। মৌলিকে নিয়ে চলে এলো বাড়িতে। তারপর কঠোর প্রহরায় বেশ কিছুদিন। মৌলি বিমলকে জানাতেও পারল না কিছু। বিমলের কী হলো তাও জানলো না। কিছুদিন পর ভাই একজন উকিল ডেকে ডিভোর্স করাল। মৌলি মনে মনে হাসল, যে বিয়েই হয়নি তার আবার ডিভোর্স। ডিভোর্স করিয়ে শান্তি পেল বাড়ির লোকজন। ভাবল আর কোনো পিছুটান রইল না। কিন্তু পিছুটান যে রয়েই গেল তা বুঝল না কেউ। কাগজে কখনই পিছুটান তৈরি হয় না, ভাঙেও না । পিছুটান হয় আর ভাঙে মনে। 
 মৌলির বিয়ে হলো। ঢাকায় স্থায়ী হলো। সন্তান হলো। এক সময় ঢাকা ছেড়ে স্বামী পেট্রো ডলারের টানে পাড়ি জমাল আমেরিকা। ভার্জিনিয়ায় নিজের প্রাসাদোপম বাড়ি গাড়ি কি নেই তার। জীবনে কোনো অপূর্ণতা মৌলির নেই। ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে যার যার মতো চলে গেল। রয়ে গেল শুধু ওরা দুজন। স্বামীর তুমুল ব্যস্ততা। মৌলি ঘর সামলায়। তারপরও রোদেলা সকালে, অঝোর বৃষ্টিতে, অন্ধকার রাতে শ্রভ্র সকালে একটা এরোপ্লেন ওকে ডাকে। এ ডাক মৌলি উপভোগ করে। কাউকে বলে না, বলেনি কোনোদিন। 
একদিন অনেকগুলো বাজার হাতে নিয়ে ফিরছিল মৌলি। কাছের চেইনশপে গিয়েছিল বলে গাড়ি নেয়নি। প্রবাসের জীবনে এসব গা সওয়া। হঠাৎ বাতাসে উড়ে এসে ওর মাথায় ঠোক্কর খেয়ে নিচে পড়ল একটা কাগজের প্লেন। মৌলি আচমকা থমকে দাঁড়াল। দুই হাতে বাজার। তারপরও কষ্ট করে প্লেনটা উঠাল। চারদিক তাকাল। কাউকে দেখল না। নিশচয়ই কোনো বাচ্চা এটা ছুড়েছে। কিন্তু বাচ্চাটা গেল কোথায়? মৌলি প্লেনটা হাতে নিয়ে একটু এদিক-ওদিক দেখল তারপর রাস্তার পাশে রেখে হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ ওর মনে হলো কি যেন একটা লেখা প্লেনটার কাগজে। ও ফিরল। প্লেন তুলল। আশ্চর্য বাংলায় গোটা গোটা হরফে লেখা ‘তোমাকে ভালোবাসি’। এ লেখা মৌলির খুব চেনা। ও ফিরতি প্লেনে ‘আমিও তোমাকে’ লিখে পাঠাতে চাইল। কিন্তু কোথায় পাঠাবে, কোন জানালায়! মৌলি অনেক্ষণ ধরে আশপাশের জানালাগুলো দেখল, খুঁজল। পেল না। কোনো এক জানালার পাশ থেকে পুরু ফ্রেমের চশমা পরা এক ভদ্রলোক সরে গেল। তার দুচোখে দুফোঁটা পানি। মৌলি এরোপ্লেনটা বাসায় নিয়ে এলো। বার বার দেখল। বাক্সে লুকাল। সুগন্ধির মতো বের করে কখন শোকে কখনও দেখে। আর বার বার জানালায় দাঁড়িয়ে আশপাশের জানালগুলোয় একটা মুখ খোঁজে। আজও অঝোর বৃষ্টি ভেদ করে খুঁজতে লাগল সেই মুখ। 

×