ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ

প্রণব সাহা

প্রকাশিত: ২১:৩৭, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা

প্রায় ৩০ বছর আগের একটা ছবি আমি প্রায় দেখি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কয়েকজন সাংবাদিক দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। মনে পড়ে এটা রাস্তার পাশে। আমরা ফিরছিলাম তিন বিঘা করিডর থেকে। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষকে সাহায্য দেওয়ার জন্য নেমেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এখন শুধু রোহিঙ্গা নয়, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই বিরোধী দলে থেকেও নানা মানবিক আচরণে তার অগ্রসরতা খুব কাছে থেকে দেখেছি। আর যে ছবিটির কথা বললাম তা জননেত্রী শেখ হাসিনার সাংবাদিক প্রীতির উদাহরণ। এখনো তাই অনেকেই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘আপা’ বলে সম্বোধন করতে পারেন। শেখ হাসিনাও কাছে পেলে সাংবাদিকদের ‘সাংঘাতিক’ বলতে ছাড়েন না। 
১৯৮১ সালে যে পরিস্থিতিতে বাবা-মা ভাই হারা শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন, এখন দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতাও সে সময়ের দুঃসময়কে অনুধাবন করতে পারবেন না। শুধু আশির দশক নয়, ১৯৯৪ সালেও কুখ্যাত মাগুড়া উপনির্বাচনের সময়ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হওয়া সত্ত্বেও, যিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদা ভোগ করতেন তাকেও কিন্তু সরকারি সার্কিট হাউজ ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। ১৭ মার্চ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন পালন করে সেখান থেকেই মাগুরা চলে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। উপনির্বাচনের ভোট ছিল ২০ মার্চ। সরকারি কোনো স্থাপনা না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ছিলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামানের বাসায়। যার মৃত্যুতে মাগুরা-২ আসন শূন্য হয়েছিল।

বর্তমান সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখরের বাবা। তার বড়ভাই শফিকুজ্জামান বাচ্চু উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সেই নির্বাচন কাভার করতে গিয়েও শেখ হাসিনাকে পেয়েছিলাম সংবেদনশীল রাজনীতিক হিসেবে। তখন বিটিভি ছাড়া কোনো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না, কিন্তু দেশী-বিদেশী অনেক পত্রিকা এবং বার্তা সংস্থার সাংবাদিকরা ভিড় জমিয়েছিলেন ছোট্ট জেলা শহর মাগুরায়। এমনকি সাংবাদিকদের সবার থাকার মতো আবাসিক  হোটেলেও ছিল না। আমি নিজেও ভোরের কাগজের জেলা প্রতিনিধির বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। 
মাগুরার উপনির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতি তথা নির্বাচনী ইতিহাসের একটি টার্নিং পয়েন্ট। একটি উপনির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তখনকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার-সিইসি বিচারপতি আব্দুর রউফ নিজে মাগুরায় গিয়েছিলেন। ভোটের আগেই এলাকার পরিবেশ আভাস দিচ্ছিল সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা খুব কম। মাগুরা তখনকার পানিসম্পদমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাজেদুল হকের নিজ জেলা। স্থানীয়ভাবে ‘মেজদা’ হিসেবে তিনি মরিয়া ছিলেন সেই আসনটি বিএনপিকে উপহার দেওয়ার জন্য। বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ইকোনো বলপেনের মালিক কাজী সেলিমুল হক কামাল ওরফে কাজী কামাল।

ভোটের আগের দিন সিইসি সার্কিট হাউজকে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় ঘোষণা করে বৈঠকে বসেছিলেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। দুপুরের খাবারের বিরতির আগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল দুই দলের নেতা এবং নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় পর্যবেক্ষণ কমিটি হবে। দুপুরের খাবারের বিরতির পর বৈঠকটি আর হয়নি। বিচারপতি রউফের গাড়ি তেল আনতে পেট্রোল পাম্পে গেলে দুষ্কৃতকারীরা তাতে হামলা করেছিল। আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছিল কাজটি করেছে বিএনপির কর্মীরা। যাই হোক আমরা মনে করেছিলাম সিইসি উপনির্বাচন বাতিল করবেন। কারণ দুপুরের পরে গিয়ে সাংবাদিকরা দেখেছিল সার্কিট হাউজের সামনে নির্বাচন কমিশন লেখা নামফলকটিও ‘গায়েব’ হয়ে গেছে। এসব ঘটনার বিস্তারিত সংবাদ লিখেছিলাম ভোরের কাগজে। আর ভোটের দিন ধান খেতে ব্যালট পেপার পরে থাকার ছবিও তুলেছিলেন ভোরের কাগজের ফটো সাংবাদিক শামসুল হক টেংকু। ভোরের কাগজে তাও ছাপা হয়েছিল। 
আসলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন যে সম্ভব নয় তা সেই উপনির্বাচনে প্রমাণ হওয়ায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে সামনে এনেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশ ঘুরে যে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলে দাবি আদায়ে সফল হয়েছিলেন, তার জন্য দেশজুড়ে ঘুরে বেড়িয়ে যে পরিশ্রম করেছিলেন সেটাও প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ হয়েছিল সাংবাদিক হিসেবে। ১৯৮১ সালে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে শেখ হাসিনা চরম দুঃসময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালের দুটি জাতীয় নির্বাচনে পরাজয়ের শিক্ষা থেকে তিনি একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গেলেন ১৯৯৪-৯৬ সালে। আর দেশ চষে বেড়িয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করলেন সফল আন্দোলনের মাধ্যমে। বিএনপি সরকার বাধ্য হয়েছিল আওয়ামী লীগের দাবি সংবিধানে সংযুক্ত করতে।

আর এজন্য আন্দোলন তুঙ্গে থাকলেও শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করলেও বানচাল বা প্রতিরোধ করেননি। এটা তার ২১ বছর পরে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার চূড়ান্ত কৌশলের অংশ। ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর পদত্যাগ করার পর তা সংসদে গৃহীত না হলেও নিজে ২৯ মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন ছেড়ে ধানম-ির সুধা সদনে উঠেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায়ে দেশের প্রায় সব জেলায় গিয়েছেন। সেই আন্দোলন এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনী প্রচারের তথ্য সংগ্রহে আমি নিজে তার সঙ্গে ৩৭৪ উপজেলায় গিয়েছি। এটা একজন মাঠের রিপোর্টার হিসেবে রাজনৈতিক রিপোর্ট ও নির্বাচনী প্রচার কাভারের এক বড় অভিজ্ঞতা। ২০১৯ সালের গণভবনে সুযোগ হয়েছিল সেই সব সফরের কথা বলার, শুনে শেখ হাসিনা বলেছিলেন বই লিখ। 
এখনকার প্রধানমন্ত্রী আর সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রীর রাজনৈতিক তৎপরতা কাভারের সুযোগে অনেক ব্যক্তিগত স্মৃতি নিজের মানসকে সমৃদ্ধ করেছে বলে আমি বিশ্বাস করি। ঠাকুরগাঁওয়ের জনসভা শেষে নিজে ডেকে খাওয়ানো বা রাজশাহীতে গিয়ে রাত হওয়ায় যে এরোবেঙ্গলের ছোট্ট বিমানে ঢাকায় ফিরতে না পারার ঘটনা, পরের দিন ভোরে দ্রুত প্লেনে ওঠার জন্য মেরি বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খেয়ে সময় বাঁচানোর পরামর্শ চিরদিন মনে থাকবে একজন মমতাময়ী বড় বোনের স্নেহ সম্পদ হিসেবে। ’৭৫’এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর দলকে আবারও ক্ষমতায় আনা।

২০০১ সালে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার সরকার ও জাতীয় সংসদের মেয়াদ পূরণের কৃতিত্ব থেকে শেখ হাসিনাকে বঞ্চিত করবেন কীভাবে? আবার পরপর তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার হ্যাটট্রিকের জন্য হাততালি না দিলেও তো তান মানতেই হবে। হ্যাঁ ঝুঁকি নিয়েছিলেন বটে ২০১৪ সালে। সফল হয়েছিলেন ২০১৮ নির্বাচনের আগে বিএনপিকেও গণভবনে ডেকে সংলাপে বসাতে। এই দুটি নির্বাচনের জন্যই এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আগে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি চারবারের সফল প্রধানমন্ত্রী। এবারের সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে যখন আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর তার ৭৭তম জন্মদিন, তখন খুব ভেবে-চিন্তে পা ফেলতে হচ্ছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে। খুব ঘটা করে জন্মদিন তিনি কখনই পালন করেন না। অনেক সময় দেশের বাইরে থাকেন, এবারো  যেমন থাকবেন।

চাপ মোকাবিলায় সব সময় আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যেমন গত ২২ সেপ্টেম্বর যেদিন রাতে জাতিসংঘে ১৯ বারেরমতো ভাষণ দিয়েছেন, ঐদিনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের ভিসানীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সেলফি দেশবাসী বা আওয়ামী লীগকে যে স্বস্তি দিয়েছিল, তা নৈশভোজে জো বাইডেনের সপরিবারে ছবি তোলার পর আরও বেড়েছিল কিন্তু তখনি আলোচনা ছিল যে এসবের সঙ্গে ভিসানীতির সম্পর্ক নাই। শেখ হাসিনাকে কূটনেতিক কৌশল আর দেশের  ভেতরের রাজনীতিকে সামলে নিয়েই একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে হাঁটতে হবে। একই সঙ্গে এখন প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবেই শেখ হাসিনাকে দেশ-বিদেশ সামলাতে হচ্ছে। কিন্তু আমরা অবাক হচ্ছি পরিণত বয়সে শেখ হাসিনা অনেক  বেশি চাপ সামলাচ্ছেন অনেকটাই সাবলীলভাবে।

দলের যেকোনো নেতা বা এমপি মন্ত্রীর তুলনায় আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান মনে হয় শেখ হাসিনাকে। যদিও ডলার সংকট, নিত্যপণ্যের দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি তথা আকাশে উঠে যাওয়া মূল্যস্ফীতিকে মাটিতে নামানো না পারার সমালোচনা সইতে হচ্ছে চারবারের সরকার প্রধানকে। সবকিছুই এখন তার কাছে চাপছে, দলের নেতা-কর্মীরা বিশ্বাস করে ‘নেত্রী সব সামলে ফেলবেন ’। জন্মদিনে আমাদেরও একান্ত প্রার্থনা শেখ হাসিনা সামলে নিক, এগিয়ে যাক দেশ। যদিও আমরা তার সাইবার নিরাপত্তা আইন বা দুর্নীতির না কমার সমালোচনা করি, প্রশ্ন তুলি এতসব মেগা প্রজেক্টের কি সবই দরকারি ছিল? আর্থিক খাতের সংকট নিয়ে সমালোচনা করার পরও তাই বাক-স্বাধীনতা নেই এটা কি বলা যায়? আমরা জানি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে তাদের সব রকম প্রশ্নের জবাব দিতে কখনই দ্বিধান্বিত হন না শেখ হাসিনা।

কখনও আবার সাংবাদিকদের খোঁচা দিতে বা পাল্টা প্রশ্ন করে তাদের বিব্রত করতেও ছাড়েন না। হয়তো একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক হয়তো এমনই। কারণ সরকার পরিচালনায় একজন রাজনীতিক কখনই দোষ ত্রুটির উপরে উঠতে পারেন কমই। সমালোচনা সত্ত্বেও সর্বজনীন পেনশন স্কিমের মতো যুগান্তকারী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ঘোষণা, মেট্রো রেলের আধুনিকতায় রাজধানীবাসীকে স্বস্তি দেওয়া আর নিজে স্বপ্ন দেখে দেশের টাকায় পদ্মা সেতু তৈরি করে দেখিয়ে দেওয়ার মতো একজন রাষ্ট্রনায়ক আলোচনা-সমালোচনায় নিজে এগিয়ে দেশকে অগ্রসর করে নেবেন, শেখ হাসিনার ৭৭তম জন্মদিনে সেটাই কাম্য। শেষে বলব আপা আপনি ভালো থাকুন।  
লেখক : সাংবাদিক

×