ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৪ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১

প্রসঙ্গ ইসলাম

হজ এবং কুরবানি ॥ ইতিহাসে অনুভবে

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২০:৫৮, ১৩ জুন ২০২৪

হজ এবং কুরবানি ॥ ইতিহাসে অনুভবে

আরবী ভাষায় ‘হজ’ শব্দের অর্থ জিয়ারতের সংকল্প করা

আরবী ভাষায় ‘হজ’ শব্দের অর্থ জিয়ারতের সংকল্প করা। যেহেতু খানায়ে-কা’বা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে তাবৎ প্রেমিক-ভক্তগণ পৃথিবীর চারিদিক হতে পঙ্গপালের মতো এসে পবিত্র মক্কা নগরীতে জমায়েত হয়, তাই এর নাম রাখা হয়েছে হজ। কখন কিভাবে হজ সূচনা হয়েছিল এবং যুগে যুগে এ হজব্রত পালনের প্রকৃতি কেমন ছিল, সে ইতিহাস অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এবং শিক্ষাপ্রদ।
হজ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। পবিত্রস্থান সমূহ দর্শন এবং সে স্থানগুলোতে বিশেষ রীতিনীতি শিষ্টাচারের সঙ্গে অনুষ্ঠান পালনের প্রথা প্রাচীনকাল থেকে চালু রয়েছে। 
সকল ধর্মের অনুসারীদের নিকট কোনো না কোনো স্থান রয়েছে, যেগুলোকে তারা পবিত্র বলে মনে করে থাকেন। সে সকল স্থানে গিয়ে তারা নিজ নিজ আকিদা ও বিশ্বাস অনুসারে ধর্মীয় অনুষ্ঠান সমূহ পালন করে থাকেন। না হলে কিতাবের মাঝে ইহুদিদের মধ্যে পবিত্র স্থানসমূহের জিয়ারতের প্রথা পূর্বেও চালু ছিল। তারা বায়তুল মুকাদ্দাস কেন্দ্রিক বছরে তিনবার হাজির হয়ে এ অনুষ্ঠান পালন করত।

খ্রিস্টানরা অনুরূপ অনুষ্ঠান পালন করত বায়তুল মুকাদ্দাস কেন্দ্রিক। সেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই বায়তুল মুকাদ্দাস তাদের তীর্থ উপাসনার শ্রেষ্ঠতম স্থানরূপে বিবেচিত। এভাবে হিন্দু-বৌদ্ধ ও অন্যান্য জাতির মাঝেও তীর্থ যাত্রার ইতিহাস বলছে যে, দুনিয়ার প্রথম মানুষ আদি পিতা হজরত আদম আলাইস সালামই সর্বপ্রথম নিষ্কলুষ হজ অনুষ্ঠানের শুভ-উদ্বোধন করেন।
নবী আদমকে (আ.) যখন ধরাধামে প্রেরণ করা হয় এবং যখন তিনি মহান আল্লাহর দরবারে ফেরেস্তাদের প্রার্থনার শব্দ শুনতে না পাওয়ার অভিযোগ আনেন। এরপর আল্লাহ তাকে ‘বায়তুল্লাহ’ নির্মাণ করতঃ এর তাওয়াফ করার হুকুম দেন। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা বর্ণনা করেন যে, ‘হজরত আদম হজ করেছেন এবং হজের সব অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছেন।

তারপর আরজ করলেন : হে আল্লাহ, প্রত্যেক সৎকর্মশীল ব্যক্তি প্রতিদান পায়; আমার প্রতিদান কি ? আল্লাহ বললেন, হে আদম আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তোমার বংশধরদের মধ্যে যে এ ঘরে এসে গুণাহের জন্য তওবা করবে, আমি তাকেও ক্ষমা করে দেব।’-(বাইহাকী)
এরপর থেকে হযরত নূহ (আ.) -এর জামানার মহাপ্লাবনের সময় পর্যন্ত আদম সন্তানরা পবিত্র কাবায় হজব্রত পালন করে।

মহাপ্লাবনের সময় খানায়ে কাবাকে তুলে নেওয়া হলে মতান্তরে বিধ্বস্ত হলে এর পুনঃনির্মাণ ও পুনঃ সংস্কারের উদ্দেশ্যে মনোনিবেশ করেন সাইয়্যিদেনা ইব্রাহীম (আ.) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)। তারা মহান আল্লাহ তায়ালার যুগল প্রচেষ্টায় সুনিপুণভাবে তিলে তিলে গড়ে উঠে ইসলামী জাহানের মহান প্রাণকেন্দ্র পূতপবিত্র অপার অনুগ্রহ ও সাহায্য প্রার্থনা করে এর নির্মাণ কাজে ব্রতী হন। পিতা পুত্রের স্থান ও মুসলিম ঐক্য ও গুনাহমাফির কেন্দ্র বিন্দু ‘খানায়ে কাবা’। দু’নবী সেদিন অশ্রুর বারি দিয়ে মরুর বালি সিক্ত করে তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন।
‘পরওয়ার দিগার! আমাদের এ চেষ্টা কবুল কর। তুমি সব জান এবং সবই শুনতে পাও। পরওয়ার দিগার! তুমি আমাদের দুজনকেই মুসলিম অর্থাৎ তোমার অনুগত কর এবং আমাদের বংশাবলি হতে এমন একটি জাতি তৈরি কর, যারা একান্তভাবে তোমারই অনুগত হবে। আমাদের তোমার ইবাদত করার পন্থা বলে দাও। আমাদের প্রতি ক্ষমার দৃষ্টি নিক্ষেপ কর, তুমি বড়ই ক্ষমাশীল ও দয়াময়।

প্রভুহে! তুমি সে জাতির প্রতি তাদের মধ্য হতে এমন একজন রাসুল পাঠাও, যিনি তাদের তোমার বাণী পড়িয়ে শুনাবে। তাদের কিতাব ও বিজ্ঞানের শিক্ষা দেবে। এবং তাদের চরিত্র সংশোধন করবে। নিশ্চয় তুমি সার্বভৌম এবং বিজ্ঞ।-(বাকারা ১২৭-১২৯)
এভাবে আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাঈল (আ.) কর্তৃক প্রদর্শিত পন্থায় দু’সম্মানিত নবী সেদিন হজ পালন করেন। তারপর থেকে মুসলিম উম্মাহ সে নিয়ম-রীতির অনুকরণে হজ পালন করে আসছে। তখন ইব্রাহীমের (আ.) প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো : এবং মানুষের প্রতি আপনি হজ পালনের প্রকাশ্য আহ্বান জানান, তারা যে আপনার নিকট আসে হেঁটে কিংবা দূরবর্তী স্থান হতে কৃশ উটের পিঠে চড়ে আসুক। এখানে এসে তারা যেন দেখতে পায় তাদের জন্য দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণের কত সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে........।’ (হজ-২৬)
জাতির পিতা ইব্রাহীমের (আঃ) ডাকে সাড়া দিয়ে মানবকূলের এক বিরাট অংশ তৌহিদের নির্মল আলোয় উদ্ভাসিত হলো। তার পরবর্তী সকল নবীও স্ব স্ব উম্মতরা হযরত ইব্রাহীমের (আ.) প্রদর্শিত দ্বীনকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন, ইসলামী ভাবগম্ভীর পরিবেশে আদায় করতেন পবিত্র হজ।
কিন্তু পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তারা সে পূর্ববর্তী মহাপুরুষদের শিক্ষা ও প্রদর্শিত পথ ভুলে গিয়েছিল এবং অন্যান্য জাহেল জাতির ন্যায় সর্বপ্রকার গুমরাহী ও পাপ প্রথার প্রচলন করে ছিল। যে কাবাঘরকে কেন্দ্র করে এককালে এক আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত ও প্রচার শুরু হয়েছিল সে কাবা ঘরে জাহেলরা অবতারণা করল নানা আজব ও বিকৃত কর্মকাণ্ডের। নৈতিকতা ও প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধ নির্বাসিত হলো করা দখলদারদের থেকে।

তাই তারা সেখানে অহরহ খোদার নাফরমানিতে মত্ত থাকত। একশ্রেণি পুরোহিত, পাদ্রি সর্ব প্রকার কলাকুশল অবলম্বন করে আরবের বিভিন্ন স্থান হতে আসা লোকজন হতে নজর নিয়ায ও ভেট আদায় করত। শত শত নবীর স্মৃতি বিজড়িত, ইব্রাহীম-ইসমাঈলের (আ.) পবিত্র স্পর্শে ধন্য, পুণ্যভূমি মক্কায় শুরু হলো হজের নামে সীমাহীন বেহায়াপনা, নগ্নতা ও নোংরামিÑ যা শুনতেও গা ছমচছ করে।
সেখানে বসত বার্ষিক মেলা। আরবের বড় বড় বংশ ও গোত্রের লোকেরা তথায় দল বেঁধে আস্তানা তৈরি করতো। প্রত্যেক গোত্রের কবি ‘কথক’ নিজ নিজ গোত্রের খ্যাতি, বীরত্ব, শক্তি, সম্মান ও বদান্যতার প্রশংসায় আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলত। প্রত্যেক গোত্র-প্রধান নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্য ডেগ চড়াত এবং অন্যকে হেয় করার উদ্দেশ্যে উটের পর উট জবেহ করত।

এসব সম্মেলনে নাচ-গান, মদ্যপান, ব্যভিচার এবং সকল প্রকার নির্লজ্জ কাজকর্মের অনুষ্ঠান বিশেষ জাঁক-জমকের সঙ্গে সম্পন্ন হতো। কাবা ঘরের চতুর্দিকে তাওয়াফ করত। কিন্তু তার পদ্ধতি এত বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে, নারী-পুরুষ সকলেই উলঙ্গ হয়ে একত্রে ঘুরত আর বলত : আমরা আল্লাহর সামনে এমনাবস্থায় যাব, যেমন অবস্থায় আমাদের মা আমাদের প্রসব করেছে।’

হযরত ইব্রাহীমের (আ.) প্রতিষ্ঠিত মসজিদে ‘ইবাদত’ (?) করা হতো এ কথা ঠিক; কিন্তু কিভাবে? খুব জোরছে হাততালি দেওয়া হতো, বাঁশি বাজান হতো, দেওয়া হতো শিংগায় ফুৎকার। আল্লাহর নামও যে সেখানে নেওয়া হতো না, এমন নয়। কিন্তু কি রূপে? তারা বলত-‘আমি এসেছি, আমি এসেছি হে আল্লাহ। আমি এসেছি, তোমার কেউ শরিক নেই : কিন্তু যে তোমার আপন, সে তোমার অংশীদার।

তুমি তারও মালিক এবং তার মালিকানারও মালিক।’ আল্লাহর নামে সেখানে কুরবানিও দেওয়া হতো। কিন্তু তার পন্থা ছিল কত নিকৃষ্ট ঔদ্ধত্যপূর্ণ! কুরবানির রক্ত কাবা ঘরের দুয়ারে ফেলে রাখত। কারণ, তাদের ধারণা মতে, আল্লাহ এসব রক্ত ও গোস্ত তাদের কাছ থেকে কবুল করেছেন (নাউজুবিল্লাহ)।
আরেকটি বাড়াবাড়ি এই ছিল যে, কোনো কোনো লোক হজ যাত্রা করলে কথাবার্তা পর্যন্ত বন্ধ করে দিত। এর নাম ছিল ‘হজে মুছমত’ বা ‘বোবা হজ’। এভাবে আরও যে কত প্রকার ভ্রান্ত ও কুপ্রথার প্রচলন ছিল তার ইয়াত্তা নেই।
এরূপ ঘোর অন্ধকারচ্ছন্ন অবস্থা কমবেশি দু’হাজার বছর পর্যন্ত ছিল। এ দীর্ঘ সময়ে আরব দেশে কোনো নবীর আর্বিভাব হয়নি। আর কোনো নবীর প্রকৃত শিক্ষাও সে দেশে পৌঁছায়নি। অবশেষে সাইয়্যিদেনা হজরত ইব্রাহীমের (আ.)  দোয়া পূর্ণ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসল। তিনি কাবা ঘর প্রতিষ্ঠার সময় আল্লাহর নিকট দোয়া করেছিলেন :  হে আল্লাহ!

এদেশে একজন নবী এ জাতির মধ্য হতেই প্রেরণ কর, যে এসে তাদের তোমার বাণী শুনাবে; জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দেবে এবং সংশোধন করবে তাদের নৈতিক চরিত্র।’-এ দোয়া আল্লাহর নিকট মঞ্জুর হয়েছিল, তাই তারই অধস্তন পুরুষে একজন ‘কামেল ইনসান’ আবির্ভূত হলেন, যার পাক নাম মুহাম্মদ (সা.) ইবনে আবদুল্লাহ।
তিনি এসে হজরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহর মতো সমস্ত কুসংস্কারে করলেন কুঠারঘাত। নির্ঝঞ্ঝাট ও নিষ্কলুষ ইব্রাহীমী নীতিতে হজ অনুষ্ঠানকে পুনঃ দাঁড় করালেন দুনিয়াবাসীর সামনে। তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিলেন : (আল্লাহর স্মরণ এবং ইবাদত করার) যে পন্থা আল্লাহ তোমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, ঠিক সে অনুযায়ী আল্লাহর স্মরণ (ও ইবাদত) কর।

যদিও এর পূর্বে তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে (অর্থাৎ স্মরণ ও ইবাদত করার সঠিক পন্থা জানতে না)। বাকারাঃ ১৯৮। সকল অন্যায় ও বাজে কর্মতৎপরতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। হজ উপলক্ষে কোনোরূপ ব্যভিচার অশ্লীলতা, আল্লাহদ্রোহিতা, ফাসেকি কাজ এবং ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ করা যাবে না।’-বাকারা ১৯৭। কাব্য আর কবিত্বের বহর নিয়ে প্রতিযোগিতা, পূর্ব পুরুষদের কাজকর্মের কথা নিয়ে গৌরব, অহংকার এবং পরের দোষত্রুটি প্রচার করা বা গালমন্দ করা চলবে না।

কুরবানির পশুর রক্ত খানায়ে কাবার দেওয়ালে মর্দন করা এবং গোস্ত নিক্ষেপ করার কুপ্রথা বন্ধ কর। পরিষ্কার বলে দেয়া হলো : ‘এসব পশুর রক্ত বা গোস্ত আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না, তোমাদের তাকওয়া এবং পরহেজগারিই আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে।’- (হজ ৩৭)। 
শিরক-কুফরের কালিমামুক্ত হজরত ইব্রাহীম (আ.)-ইসমাঈল (আ.)-মুহাম্মদের (সা.) প্রবর্তিত পাক পবিত্র হজ পালনের মানসে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পার হয়ে আজো প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মক্কা নগরীতে লাব্বায়কা আল্লাহুমা লাব্বায়কার সুমধুর গুঞ্জন ধ্বনি ও মর্মস্পর্শী সুরে মরুর আরব বেহেস্তী সৌরভ বিতরণ করে থাকে। কতই না সুন্দর সে আকুল করা-ব্যাকুল করা দৃশ্য!

লেখক :  অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

[email protected]

×