ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতিবিদ

ফনিন্দ্র সরকার

প্রকাশিত: ২১:২৮, ২৭ মে ২০২৪

ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতিবিদ

সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলেও ব্যবসায়ী তোয়াক্কা করে না

জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা আমাদের সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলেও ব্যবসায়ী আইন প্রণেতাগণ তার তোয়াক্কা করে না। নিজেদের সুবিধানুযায়ী শাসনতন্ত্রে সংশোধনী নিয়ে আসে। রাষ্ট্রের অর্থ পাচারকারী, সীমাহীন ঋণখেলাপি দাপিয়ে বেড়ায় সমাজের অভ্যন্তরে। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি-গাড়ির সুযোগ-সুবিধা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কারও কাছে তাদের জবাবদিহি নেই। দুর্নীতিবাজরা যখন শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত হন তখন সৎ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা মুখ লুকিয়ে হাসেন

‘রাজনীতি একটি বহুমুখী শব্দ। শব্দটি প্রায়োগিক দিক থেকে খুবই তাৎপর্য বহন করে। কেননা, গোটা বিশে^র অতলান্তে এর গুরুত্ব রয়েছে। সামাজিক জীবনধারার ক্ষেত্রে রাজনীতি হচ্ছে অন্যতম অনুষঙ্গ। সে জন্যই সমগ্র মানব জাতির প্রায় কেউই রাজনীতির বাইরে নন। মানুষ রাজনীতির বাইরে না থাকলেও সকলে কিন্তু রাজনীতিবিদ নন। রাজনীতিবিদ হতে গেলে আগে রাজনীতি জিনিসটা কী সেটা বোঝা খুবই জরুরি। যিনি রাজনীতি করবেন বা রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবেন তিনিই ধীরে ধীরে রাজনীতিবিদ হয়ে উঠবেন। রাজনীতিবিদ এমন একজন ব্যক্তি যার রয়েছে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষমতা। সে লক্ষ্য হতে হবে জনগণের কল্যাণে নির্ধারত ও নির্দিষ্ট।

রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি বা রাজগতি কিংবা রাজবুদ্ধি হলো দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ক কর্মকা-ের সমষ্টি। সম্পদের সুষম বণ্টন হচ্ছে এমন একটি কর্মকা-। রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নকে রাজনীতি বিজ্ঞান বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাজনীতির গবেষণালব্ধ ফসল। রাজনীতিতে নানা ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।

যার মধ্যে রয়েছে কারও নিজস্ব অভিমত মানুষের মাঝে প্রচার করা, অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে মতবিনিময়, আইন প্রণয়ন এবং বল প্রয়োগের চর্চ করা- যার মধ্যে আছে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বাকযুদ্ধ বা লড়াই। সেই লড়াই আদর্শগত লড়াই। 
সামাজিক বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত পরিসরে রাজনীতির চর্চা করা হয়। ঐতিহ্যবাহী সমাজ ব্যবস্থাসমূহের গোত্র, গোষ্ঠী থেকে শুরু করে, আধুনিক স্থানীয় সরকার, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলোতে মানুষ প্রায়ই নিজস্ব মতবাদ তুলে ধরতে রাজনৈতিক দল গঠন করে। রাজনৈতিক দলই একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করে।

আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে দল এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনাটা একটা সামষ্টিক ব্যাপার। তবে পৃথিবীতে এমন অনেক রাষ্ট্র আছে যেগুলো রাজনৈতিক দল নয়, ব্যক্তিবিশেষের শাসনব্যবস্থা চালু রয়েছে। সে বিষয়ে আজকের লেখনিতে আলোচনা করতে চাই না। আজকের বিষয় হচ্ছে ব্যবসায়ীরা যখন রাজনীতিবিদ হন।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গণতন্ত্রে সকল মানুষের রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। ব্যবসায়ী, পেশাজীবী প্রত্যেকেই নিজ অবস্থান থেকে রাজনৈতিক চর্চা করতে পারেন। তবে সে চর্চায় ভিশন থাকতে হবে। মানুষের কল্যাণে, দেশের উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনীতি করতে হবে। রাজনৈতিক ব্যবস্থা কোনো কাঠামো বা কোনো সমাজের মধ্যকার গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পদ্ধতিসমূহকে সংজ্ঞায়িত করে।

রাজনৈতিক চিন্তার প্রাচীন ইতিহাসে প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটলের রাজনীতি, চাণক্যর অর্থশাস্ত্র ও চাণক্যনীতি (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) এবং কনফুসিয়াসের লেখার ন্যায় দিগন্ত উন্মোচনকারী বিষয়গুলো পাওয়া যায়।
রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় লক্ষণীয় যে, পৃথিবীর খুব কম দেশেই ব্যবসায়ীদের রাজনীতিক হতে দেখা গেছে। সমাজ চিন্তক ও সমাজ অনুশীলনকারীরাই রাজনৈতিক মতবাদ প্রচারের জন্য দল করেছেন।

এই দল গঠনে ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক যোগান দিয়ে ভূমিকা রেখেছেন। উল্লেখ্য, সাধারণ মানুষের কল্যাণই রাজনীতিকদের মৌলিক কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সময়ের বিবর্তনে রাজনীতির চেহারা বদলে গেছে। মানুষের কল্যাণচিন্তা মুখে মুখে থাকলেও বস্তুত রাজনীতিটা হয়ে উঠেছে ব্যবসাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আধুনিক রাজনীতির বিষয়টি তুলে ধরতেই উপরোক্ত শিরোনামটি ব্যবহার করেছি।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে। যিনি সারা জীবন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। একটি মহৎ আদর্শ সামনে রেখেই জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বের সফল পরিণতি হচ্ছে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়।

১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। রাজনীতিটা চলে যায় অপশক্তির হাতে। সুষ্ঠু, স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি পথ হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনুশীলনকারীরা চলে যান রাজনীতির আড়ালে।

রাজনীতির নামে হত্যা-ক্যুর সংস্কৃতি চালু হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। সেই থেকে রাজনীতি আর সুস্থ ধারায় ফিরে যেতে পারেনি। রাজনীতিকদের সীমাহীন ব্যর্থতা ও দুর্বলতার সুযোগে ব্যবসায়ী, সামরিক, বেসামরিক, আমলারা রাজনীতির নেতৃত্বে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জনগণের কল্যাণ চিন্তার রাজনীতিকগণ হারিয়ে যেতে থাকেন। 
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাজনীতির নানা ঘটন পরম্পরায় রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে পারেননি। তিনিও ব্যবসায়ী ও আমলাদের কাছে অসহায়। অবশ্য তিনি চেষ্টার ত্রুটি করেননি। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি মোকাবিলার জন্যে আমলা-ব্যবসায়ীদেরই প্রাধান্য দিয়েছেন নেতৃত্বে।

বর্তমানে সংসদে ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যে কারণে গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রায় গতিহারা হয়ে পড়েছে। কোটিপতি ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে মনুষত্ব বিকাশের পথকে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। টাকা ছাড়া এখন রাজনৈতিক কর্মীরাও কিছু বুঝতে চায় না। আদর্শ বলতে কিছু নেই। 
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা চতুর্থ দফা আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়েছে। বিগত ১৫ বছরে দেশে দৃশ্যমান ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বটে, কিন্তু রাজনীতির উন্নয়ন হয়নি। বিগত তিনটি সংসদে ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছিল আধিপত্য। দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও এর ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদেও প্রকৃত রাজনৈতিক নেতার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। যে কারণে বর্তমান রাজনীতি ও নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ রাজনীতিকদের সামনা সামনি সম্মান দেখালেও অন্তরে বিদ্বেষ প্রকটিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জনগণের কল্যাণের চাইতে ব্যবসাকেই বড় করে দেখে। রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে রাজনীতিকে ব্যবসা প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এখন রাজনীতি ব্যবসার মূলধন ছাড়া আর কিছু নয়। 
রাজনীতি যখন ব্যবসার পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন গণতন্ত্রও অর্থহীন হয়ে পড়ে। জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা আমাদের সংবিধানে লিপিবদ্ধ থাকলেও ব্যবসায়ী আইন প্রণেতাগণ তার তোয়াক্কা করে না। নিজেদের সুবিধানুযায়ী শাসনতন্ত্রে সংশোধনী নিয়ে আসে। রাষ্ট্রের অর্থ পাচারকারী, সীমাহীন ঋণখেলাপি দাপিয়ে বেড়ায় সমাজের অভ্যন্তরে।

ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়ি-গাড়ির সুযোগ-সুবিধা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কারও কাছে তাদের জবাবদিহি নেই। দুর্নীতিবাজরা যখন শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত হন তখন সৎ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তারা মুখ লুকিয়ে হাসেন। দেশে এখনো অনেক সৎ দেশপ্রেমিক সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক আছেন।

তারা সংখ্যায় বেশি হলেও ঐক্যবদ্ধ নন। যার জন্য ক্ষমতাকেন্দ্রিক জায়গায় প্রায় অনুপস্থিত। তাই ঘনিয়ে আসছে প্রায় অন্ধকার। তবে অন্ধকারের পরে স্বাভাবিকভাবেই আলোর দেখা মেলে- সে প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে আছে জনগণ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

×