ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

একাত্তরের মার্চের পটভূমি

ড. আবদুল খালেক

প্রকাশিত: ২০:৪৩, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

একাত্তরের মার্চের পটভূমি

বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাস

বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রটির জন্মের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যাবে বছরের ১২ মাসের প্রতিটি দিনই ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তুলনামূলকভাবে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব একটু বেশি। ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগ নামের রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বে আমরা পাকিস্তান নামের নতুন একটি রাষ্ট্র পেয়েছিলাম, এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসী পাকিস্তানের পক্ষে ভোট প্রদান করেছিল, বিভিন্ন গবেষণায় সে সত্য প্রমাণিত।

পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র লাভের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করেছিল ব্রিটিশদের শাসনকাল শেষ হয়ে গেছে। এরপর তারা স্বাধীনভাবে দেশটিকে শাসন করতে পারবে। অর্থাৎ তারা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান নিয়ে এ দেশের মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তারিখে অনুষ্ঠিত রমনার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ স্পষ্ট জানিয়ে দেন- ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’

রাষ্ট্রভাষার বিষয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র এই কঠোর অবস্থান দেখে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ অনুমান করতে পারে তারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন রাষ্ট্র পায়নি। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালানো হয়। শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেক ছাত্র এবং পথচারী। 
বাঙালি জাতি প্রকৃত অর্থে একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করেই সে বাঙালি। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ যে অঞ্চলে বসবাস করে সেটাই তার মাতৃভূমি বাংলাদেশ। নানা কারণে যুগ যুগ ধরে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বাংলাদেশটি বিদেশীদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। শাসকদের ভাষা এ দেশের রাষ্ট্রভাষা হয়েছে, জীবিকার প্রয়োজনে এ দেশের মানুষকে বিদেশী ভাষা শিখতে হয়েছে, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে নিজের মাতৃভাষা বাংলাকে কখনো এ জাতি বিসর্জন দেয়নি।

যার ফলে যুগ যুগ ধরে বিদেশীদের শাসনকালেও নিজের জাতীয়তা বাঙালি পরিচয় দিতে এ দেশের মানুষের মধ্যে কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে এ দেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়ের সংকট দেখা দেয়। হাজার বছরের বাঙালি জাতি বলে যার পরিচিতি পাকিস্তান রাষ্ট্রে তার পরিচিতি হয়ে যায় পাকিস্তানি জাতি হিসেবে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের রক্ত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে জাতি হিসেবে আমরা ‘বাঙালি’। বাংলা আমার মাতৃভাষা। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে জাতি অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে থাকে। বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন ভাষা আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে হলে পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিপরীতে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা অপরিহার্য।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৪৯ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের একটি রাজনৈতিক সংগঠন। ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে শেখ মুজিব তখন জেলখানায় বন্দি। শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী মুসলিগ লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধের জন্য বাঙালি জাতির মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে দেশে প্রাদেশিক পরিষদ এবং জাতীয় পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী মুসলিম লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীদের কাছে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বলা যেতে পারে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের কোমর ভেঙে যায়।

সেই ভাঙা কোমর নিয়ে মুসলিম লীগ আর কখনো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী ফলাফল পাকিস্তান সরকার মেনে নিতে পারেনি, নানারকম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছে, কিন্তু তার ফল ভালো হয়নি। বাঙালি জাতি একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের প্রদর্শিত পথে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। 
সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া কোনো আন্দোলন কখনো সফল হয় না।

পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশক পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক সংগঠনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ছয় দফা নিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। ছয় দফার আন্দোলন দিন দিন বেগবান হয়ে উঠতে থাকে। দিশেহারা পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে হত্যার লক্ষ্যে দায়ের করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা। তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান ভেবে নিয়েছিলেন ১৯৬৮ সালের আগরতলা মামলার মাধ্যমে শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে লটকিয়ে দিতে পারলেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জেনারেল আইয়ুব খানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে পারেনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দেশজুড়ে এই হত্যাকা-ের প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী ছাত্রদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তারিখে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের খ্যাতনামা শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা।

ড. জোহার মৃত্যুর খবর প্রচার হওয়ার পরপরই দেশে ঘটে যায় এক গণঅভ্যুত্থান। পতন ঘটে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। সব ঘটনা ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ঘটে যায়। আর এসব ঘটনার মাধ্যমে শেখ মুজিব তখন হয়ে উঠেন ‘বঙ্গবন্ধু’।
মুজিব তখন সমগ্র পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা। তাঁকে উপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি তখন নতুন সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ছিল না। বাধ্য হয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খান দেশে একটি সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে। নির্বাচনী ফলাফল একচেটিয়া আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যাবে পাকিস্তানের নতুন শাসকবর্গ এমনটি ভাবতে পারেনি। ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শুরু হয় নতুন ষড়যন্ত্র। ১৯৭১ সলের জানুয়ারি মাস থেকেই তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ষড়যন্ত্রের ডানা নানাভাবে বিস্তার লাভ করতে থাকে।
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতিকে সব সময় পথ দেখিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। ১৯৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে জাতি শেখ মুজিবের কাছ থেকে যে পথনির্দেশনা পেয়েছিল সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে।
একুশে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব শহীদ মিনারে পুষ্পমালা অর্পণ করে শপথ উচ্চারণে বলেন- ‘বাঙালিকে পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখার শক্তি পৃথিবীতে কারোর নেই। যারা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বাধিকারের দাবি বানচালের জন্য বাঙালিকে ভিখারি বানিয়ে ক্রীতদাস করে রাখছে তাদের উদ্দেশ্য যে কোনো মূল্যে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে।’ (দৈনিক পাকিস্তান, ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১)। শেখ মুজিব অশ্রুভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন- ‘ভাইয়েরা আমার, বোনেরা আমারÑ সামনে আমাদের কঠিন দিন।

আমি হয়তো আপনাদের মাঝে নাও থাকতে পারি। মানুষকে মরতেই হয়। জানি না আবার কবে আপনাদের সামনে এসে দাঁড়াতে পারব। তাই আজ আমি আপনাদের এবং বাংলার সকল মানুষকে ডেকে বলছি- চরম ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হোন। বাংলার মানুষ যেন শোষিত না হয়, বঞ্চিত না হয়, লাঞ্ছিত-অপমানিত না হয়। দেখবেন শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়।

যতদিন বাংলার আকাশ, বাতাস, মাঠ, নদী থাকবে, ততদিন শহীদরা অমর হয়ে থাকবেন। বীর শহীদদের অতৃপ্ত আত্মা আজ দুয়ারে দুয়ারে ফিরছে, বাঙালি তোমরা কাপুরুষ হইও না, চরম ত্যাগের বিনিময়ে হলেও অধিকার আদায় কর। বাংলার মানুষের প্রতি আমার আহ্বানÑ প্রস্তুত হোন, স্বাধিকার আমরা আদায় করব।’ (দৈনিক পাকিস্তান, ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১)
১৯৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এবং ১ মার্চ, ব্যবধান মাত্র এক সপ্তাহের। ফেব্রুয়ারির সিঁড়ি বেয়েই বাঙালি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পদার্পণ করেছে। স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা দুটি উচ্চারণই শেখ মুজিবের কণ্ঠে উচ্চারণ হয়েছে। ১৯৭১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে যে শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধিকারের কথা বলেছেন সেই শেখ মুজিবের কণ্ঠেই ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারণ হয়েছে।

১৯৭১ সালে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে শেখ মুজিব বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ২৬ মার্চ তারিখে এসে শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ী ২৬ মার্চ তারিখ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে চিহ্নিত।
১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মদিন। বলা হয়ে থাকে শেখ মুজিবের জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতো না। কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, হাজার বছরের একটি পরাধীন দেশকে তিনি স্বাধীন করতে সমর্থ হয়েছিলেন, যা অন্য কোনো নেতা করতে পারেননি। কাজেই বলতে দ্বিধা নেই মার্চ মাস আমাদের জাতীয় জীবনের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাস। এই মার্চ মাসেই জাতির পিতার জন্মদিন, পাশাপাশি এই মার্চ মাসেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মদিন। আসুন আমরা সবাই মিলে ঐতিহাসিক মার্চ মাসকে গভীর ভালোবাসা দিয়ে স্বাগত জানাই।

লেখক : অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী

×