ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

আত্মপ্রতিষ্ঠার বিজয়

ইফতেখার আহমেদ খান

প্রকাশিত: ২০:৫২, ১১ ডিসেম্বর ২০২৩

আত্মপ্রতিষ্ঠার বিজয়

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। এ মাসের ১৬ তারিখে সার্বভৌমসত্তা হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব সভ্যতায় তার উপস্থিতি ও অবস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। বস্তুতপক্ষে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় একটি ভাষাভিত্তিক পরিক্রমা। নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে বাঙালি সত্তাটি একটি উপ-সংস্কৃতির (ঝঁন-Culture) অবস্থানে আছে। তেমনি পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলা ছিল মূল জাতীয় সংস্কৃতির উপ-সংস্কৃতি। পাকিস্তানি শাসন ছিন্ন করে বাংলা আজ এক স্বাধীন সার্বভৌম মূল-সংস্কৃতি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে প্রথম বাঙালির শাসন বাঙালির হাতে আসে।

বাঙালি জাতির বিকাশ অনুসন্ধানে হাজার বছরের বাস্তবতায় এর আগে কখনো বাঙালি বাংলার শাসক হয়নি। বলা প্রয়োজন,  সিরাজ-উদ-দৌলা, মুঘল, তুর্কি, পাকিস্তানিÑ এ শাসকগণ কেউই বাঙালি ছিলেন না। তাই বাংলা ভাষার আত্মপ্রতিষ্ঠার আর এক নাম বাংলাদেশ। একটি ভাষা তার অন্তর্নিহিত শক্তিমূলে আবির্ভাব ঘটিয়েছে একটি রাষ্ট্রের, বাংলা ভাষার রাষ্ট্র বাংলাদেশ। দৃষ্টান্তটি বিশ্ব সভ্যতায় বিরল। উপনিবেশউত্তর আমলে বাংলাদেশই একমাত্র ভূখ- যেটি নৃতাত্ত্বিক ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। এর আগে এশিয়া, আফ্রিকা কিংবা সমগ্র লাতিন আমেরিকায়ও এই ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র হতে পারেনি। 
বাংলাদেশ একটি জাতিরাষ্ট্র (জাতিরাষ্ট্র নির্মাণ আধুনিকতার সূত্রে সমর্থিত, সারা ইউরোপ তার দৃষ্টান্ত Nation State)। ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নবাব আবদুল লতিফ বলেছিলেন- বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা হচ্ছে উর্দু। ছোটলোক যেগুলো আছে তাদের ভাষা বাংলা। এদের ধীরে ধীরে উর্দুতে কনভার্ট করতে হবে। এই ভয়াবহ রকমের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে বাঙালি সমাজ বিকশিত হয়েছে। ইতিহাসের সামান্য বিশ্লেষণে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় মুসলিম লীগের তত্ত্বাবধানে যে সব মুসলিম নেতৃত্বের অবস্থায় ছিলেন, তারা সকলেই ছিলেন উর্দুওয়ালা।

উর্দুভাষী মুসলমান। ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলেনে নেতৃস্থানীয় কেউ বাঙালি মুসলমান ছিলেন না। বাঙালি মুসলমানগণ সেই সময় উর্দুওয়ালা মুসলমান নেতৃত্বের আজ্ঞাবহ শ্রেণি হিসেবে ভূমিকা নিয়েছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষের কারণে। উল্লেখ জরুরি, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের বিষয়ে আমাদের বাংলার বাঘ কিছুই জানতেন না। তিনি কেবল সেই প্রস্তাব উত্থাপনকারী ছিলেন। ধর্মভীরুতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, রক্ষণশীলতা এবং ইংরেজদের কাছ থেকে সুবিধা পাওয়া হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষের কারণে এ দেশের বাঙালি মুসলমান মুসলিম লীগের ছায়াতলে আসে।

বাঙালি একটি জাতিরাষ্ট্র হলো সেই জাতির রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ- State is the political expression of a nation. 
আমাদের বিজয় দিবসের তাৎপর্য বুঝতে হলে জাতি হিসেবে বাঙালির বিকাশ প্রক্রিয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি দেখা দরকার। সমাজবিজ্ঞান শাস্ত্রের–Ethnic Group Mobili“ation Pattern, গোষ্ঠীগত অবস্থান থেকে জাতিরাষ্ট্র রূপায়ণের প্রকৃতি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিপাদ্য। সমাজবিজ্ঞানের এই সূত্র গবেষকের মনে, মানববিকাশ অনুসন্ধানকারীদের মনে এক নান্দনিক রোমান্টিক অবয়বের ছায়া ফেলে। প্রথমেই প্রশ্ন আসে, জাতি কী?

আমরা প্রায়ই জাতি এবং সম্প্রদায়- এই দুটি বিষয় গুলিয়ে ফেলি। মনে রাখা দরকার, জাতি আর সম্প্রদায় এক নয়। সম্প্রদায় জাতির একটি অংশ। যেমন-বাঙালি একটি জাতি। হিন্দু বাঙালি জাতির একটি সম্প্রদায়, মুসলমান তেমনি আরেকটি সম্প্রদায়। একদল জনগোষ্ঠী যাদের মধ্যে কিছু উপাদানের অভিন্নতা দেখা যায় এবং যেসব উপাদানের সমষ্টিতে অভিন্ন জীবনব্যবস্থা গড়ে ওঠে । সেই একদল জনসমষ্টি হলো একটি জাতি। উপাদানগুলো হলো- ভাষা, অর্থনীতি, উৎপাদন পদ্ধতি, খাদ্য, পোশাক, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, মূল্যবোধ, সংগীত, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, প্রথা সর্বোপরি সামগ্রিক জীবনধারা।

এসব বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে একদল মানুষকে একটি জাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যেমন- বাঙালি একটি জাতি। বাঙালি জাতির এসব উপাদান ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, উপাদানে অন্তর্ভুক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় মাপের কোনো ভিন্নতা নেই। যেমন- বাঙালির ভাষা বাংলা, অর্থনীতি কৃষি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য, সংগীত, চিন্তা-চেতনা সার্বিক জীবনাচরণ ইত্যাদি প্রায় একই রকম। অর্থাৎ জাতি গঠনের অপরিহার্য উপাদানের ভিত্তিতে বাঙালি একটি জাতি। বাঙালি জাতির একটি সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ভারতবর্ষ একটি প্রাচীন সভ্যতা।

এখানে হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী পরস্পর বসবাস করে আসছে। যেমন- বাঙালি, বিহারি, সিন্ধি, তামিল, গুজরাটি আরও অনেক। এখানে বাঙালি জাতিও এথনিক অবস্থা থেকে বিকশিত হতে হতে এই অবস্থায় এসেছে। জাতি গঠনের সব ক’টি উপাদানের উপস্থিতি এখানে লক্ষ্য করা যায়- তার মধ্যে ভাষা অন্যতম। বাঙালির রাষ্ট্র গঠনের প্রেক্ষাপটে ১৯৫২ এবং তার পরবর্তী ঘটনাসমূহ জাতীয়তাবাদ বিকাশের আধুনিক পর্যায় বলা যেতে পেরে। 
এপার বাংলা ওপার বাংলায় ত্রিশ কোটির বেশি বাঙালি রয়েছে। শুরুতে এই সংখ্যা এত ছিল না। সংখ্যায় আরও কম ছিল। তখন তারা প্রাচীন জনপদ যেমন- গৌর, বঙ্গ, সমতট, হরিকেল, বরেন্দ্র ইত্যাদি স্থানে বসবাস করত। মিশ্র রক্তে গড়ে ওঠা বাঙালির আদিরূপ বা প্রাথমিক অবস্থাকে বলা হয় এথনিক। বাঙালি জাতি এই অবস্থা থেকে বিকাশ লাভ করে এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বাঙালি রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করেছে। এর মধ্যে পার হয়েছে হাজার বছর। যখন একটি জনগোষ্ঠী উপরিল্লিখিত উপাদানের ভিত্তিতে নিজেদের স্বতন্ত্রসত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন তারা একটি জাতিতে পরিণত হয়। এই জাতীয়তার অনুভূতি হলো জাতীয়তাবাদ। জাতীয়তার ভিত্তিতে উদ্বুদ্ধ জনগোষ্ঠী রাষ্ট্র গঠনের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এটাই এথনিক গ্রুপের বিকাশের ধরন।
বাঙালি জাতি নির্মাণ করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র গঠনের যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, তার পুরোটার নেতৃত্ব এসেছে জাতির পিতা শেখ মুজিবের কাছ থেকে। শেখ মুজিব সাত কোটি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বাঙালির রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করেন। বাঙালির হাজার বছরের যে ইতিহাস, তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই প্রথম ব্যক্তি যিনি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সার্বভৌম ক্ষমতা এনে দেন। এ জন্য তাকে বলা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে নোবেল পেয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছেন।

জাতির পিতা শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে সাত কোটি বাঙালি নিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটিয়েছেন। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে কখনোই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অর্জন করেনি। জাতি জীবন্তসত্তা আর রাষ্ট্র বিমূর্ত বিষয়। বাঙালিরা আগে পরিণত জাতি হয়েছে। তারপর গঠন করেছে স্বাধীন রাষ্ট্র। জাতিত্বই কোনো জাতির মৌলিক পরিচয়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সেই ঐতিহাসিক দিন, যেদিন সার্বভৌমসত্তা হিসেবে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। 

লেখক : উন্নয়নকর্মী, কথাশিল্পী

[email protected]

×