ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

বিপর্যস্ত পর্যটন

তৌফিক রহমান

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ১১ ডিসেম্বর ২০২৩

বিপর্যস্ত পর্যটন

দেশের পর্যটন শিল্পের এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা

দেশের পর্যটন শিল্পের এখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এখন পর্যটনের ভরা মৌসুম। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত আমাদের পর্যটনের প্রধান মৌসুম। এই সময়েই ডমেস্টিক, আউটবাউন্ড এবং ইনবাউন্ড পর্যটকরা ভ্রমণের সময় নির্ধারণ করে। দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে নভেম্বর-ডিসেম্বরে ছুটি হয়ে যায় বিধায় দেশীয় পর্যটকরা তখন দেশে অথবা দেশের বাইরে বেড়াতে পছন্দ করে। বিদেশী পর্যটকরা এই সময়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকে বিধায় অন্য দেশে বেড়াতে বের হয়। এমনিতেই করোনা মানুষের বেড়ানোর সহজাত প্রবৃত্তিকে থামিয়ে দিয়েছে। করোনা পরবর্তী একটু একটু করে যখন দেশের পর্যটন শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর পথে ঠিক সেই সময়ে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় পর্যটন শিল্প প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প কখনোই অগ্রাধিকারভিত্তিক শিল্প নয়। এটি এখনো শখ-আহ্লাদের মাধ্যম হিসেবেই বেশি পরিচিত। অথচ এখানে পর্যটন বোর্ড, পর্যটন মন্ত্রণালয়, পর্যটন বিষয়ক অ্যাসোসিয়েশন, ফোরাম ইত্যাদি রয়েছে। শুধু বেসরকারি পর্যায়ে পর্যটন শিল্পের যে কত সংস্থা রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। দেশে পর্যটন শিল্প নিয়ে অনলবর্ষী বক্তারও কোনো অভাব নেই। পর্যটন শিল্প নিয়ে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তার সংখ্যাও কম নয়। এত কিছুর পরও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এখনো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই পর্যটন শিল্প দিগি¦দিকহারা পথিক যেন। যে যখন ক্ষমতায় তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী পর্যটন শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করছেন-সেটা সরকারি হোক বা বেসরকারি পর্যায়েই হোক। অথচ পর্যটন শিল্প হচ্ছে সকল কলার সংমিশ্রণে স্নাত একটি শিল্প। এটি খুবই টেকনিক্যাল একটি বিষয় অর্থাৎ ‘সায়েন্স’। এটি মানবিক বোধসম্পন্ন একটি ক্রিয়েটিভ মাধ্যম অর্থাৎ ‘আর্টস’ এবং এটি অবশ্যই একটি বাণিজ্য অর্থাৎ ‘কমার্স’। এত সম্ভাবনাপূর্ণ একটি শিল্প মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এটি বহুকাল ধরেই অবহেলিত। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো শুধু পর্যটন শিল্পকে যথাযথ প্রায়োরিটি দিয়ে অবস্থান করছে ঈর্ষণীয় স্থানে।
এতকিছুর পরও দেশের বেশকিছু তরুণ উদ্যোক্তা এই শিল্পে এগিয়ে এসে প্রচুর বিনিয়োগ করেছেন। ইদানীং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে এসব তরুণের দেখা মেলে। পর্যটন শিল্প নিয়ে তাদের স্বপ্নের কথাও শুনেছি। কিন্তু সব কিছুই স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায়। পর্যটনশিল্প মানেই দেশের এ’প্রান্ত থেকে ও’প্রান্তে নির্বিঘেœ-নিরাপদে ছুটে বেড়ানো, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ের মানুষজনের আন্তরিক আতিথেয়তা। অথচ হরতাল-অবরোধ ইত্যাদির যাঁতাকলে বর্তমানে কেউই বেড়াতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। এতে ধ্বংসের প্রায় দোড়গোড়ায় দেশের বিকাশমান পর্যটন শিল্প। অথচ দেখার কেউই নেই- না সরকারি পর্যায়ে, না বেসরকারি পর্যায়ে।

স্বাধীনতার এত বছর পরও সরকারি পর্যায়ে আমাদের এখানে একটি ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার’ চালু করা গেল না- যেখানে বেসরকারি পর্যটন স্টেকহোল্ডাররা তাদের চাহিদানুযায়ী পর্যটন সেবা, অভিযোগ বা সমাধানের উপায় পাবেন। এ তো গেল সরকারি পর্যায়ের কথা। বিরোধীদলগুলোও যেহেতু পর্যটন প্রায়োরিটি শিল্প নয়- তাই তাদের কর্মসূচি প্রদানকালে পর্যটকদের কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেন না। অথচ নেপালে চরম মাওবাদী গোষ্ঠী বিরোধীদলে থাকলেও পর্যটক বিশেষ করে বিদেশী পর্যটকদের ব্যাপারে তারা ছিল অত্যন্ত সচেতন। সবুজ নম্বর প্লেটের গাড়ি দেখলেই অন্য সবাইকে আটকে রেখে তাদের যেতে দিতÑকারণ সবুজ নম্বর প্লেট হচ্ছে পর্যটকদের বাহন।

আমাদের এখানে হরতাল-অবরোধে পর্যটক বহনকারী গাড়িগুলো এ কর্মসূচির বাইরে থাকে না। অথচ পর্যটন শিল্প যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কর্মসংস্থান শিল্প, সারা পৃথিবীর শিল্পগুলোর মধ্যে পর্যটন যে জিডিপিতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ অবদান রাখছে কিংবা এটির মাধ্যমে যে একটি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা সম্ভব-তা সরকারি-বিরোধীদল সবারই জানা। অথচ এত বছর পরে এসেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের পর্যটনে বেসরকারি স্টেকহোল্ডাররা ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

আর ইনবাউন্ড পর্যটনের কথা নাইবা বললাম। সরকারি সংস্থাগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে যতটা না আগ্রহী, ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখি বিদেশী পর্যটকদের দেশে আনার ব্যাপারে। এ ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও নেই সরকারের। সম্প্রতি বিদেশী পর্যটন মেলাগুলোতেও সরকারি পর্যটন সংস্থাগুলো অংশগ্রহণ বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থাৎ পর্যটনের বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই অনুপস্থিত বলা যায়। অথচ বিদেশী পর্যটক না এলে  বৈদেশিক মুদ্রা আসবে কোথা থেকে? আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত না বাড়ালে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত উন্নত দেশ কি করে হবে? আমরা আমজনতা এগুলো বুঝলেও সংশ্লিষ্ট কর্তা-ব্যক্তিরা এগুলো কি বোঝেন না।

নাকি আমরা আসলেই চাই না, পর্যটনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ঘটুক। কিংবা পর্যটনে সমৃদ্ধ হয়ে অন্যান্য শিল্পকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাক পর্যটন শিল্প। সরকার ও বিরোধীদল কারোরই সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে ওই বিষয়গুলোর প্রতিফলন দেখতে পাই না। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নতুন বছরে নতুন সরকার, সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিকাশমান পর্যটন শিল্পকে তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান দেবেন, পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটবে এবং একঝাঁক তারুণ্য-যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে পর্যটনের এই অভিযাত্রায় নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন-সেই সব স্বপ্নবাজ তারুণ্যের স্বপ্নের ইতিবাচক বাস্তবায়ন ঘটাক নতুন নির্বাচিত সরকারÑবিজয়ের মাসে এটাই প্রত্যাশা করি।

লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, সেন্টার ফর ট্যুরিজম স্টাডিজ (সিটিএস)
[email protected]

×